default-image

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশটির চলমান নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে দ্য হেগের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) গত ২৩ জানুয়ারি একটি জরুরি ‘সাময়িক পদক্ষেপ’ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। একজন সাধারণ মানুষের কাছে আইসিজের এই ঘোষণাকে তাৎপর্যহীন ম্যাড়মেড়ে আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে মনে হতে পারে। কিন্তু যে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছেই এটি একটি অভাবনীয় সুখবর। 

জাতিসংঘের ‘বিশ্ব আদালত’ এই রায়ের মধ্য দিয়ে কার্যকর পন্থায় অং সান সু চির সরকারকে ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনের শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর হামলা বন্ধ করতে বলেছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক পর্ষদ এই প্রথম ‘ব্যস, অনেক হয়েছে!’ বলে এমন একটি সরকারকে সতর্ক করেছে, যারা যুগ যুগ ধরে আমাদের উৎপীড়ন করেই যাচ্ছে। 

২০১৭ সালে আমার এই জনগণের দুর্দশার কথা বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়ে উঠেছিল। তখন দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমানের আবাসস্থল রাখাইন রাজ্যে তাতমাদো (মিয়ানমারের সেনাবাহিনী) ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ নামে এক চরম নিষ্ঠুর অভিযান চালায়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা হাজার হাজার নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা করে, হাজার হাজার নারীকে গণধর্ষণ করে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং সাত লাখের বেশি মানুষ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। 

বিশ্ব মানবতাকে হতবাক করে দেওয়া এই হত্যাযজ্ঞ ছিল আসলে বিশাল হিমশৈলর দৃশ্যমান ক্ষুদ্র চূড়ার মতো। দশকের পর দশক মিয়ানমারের সরকারগুলো রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে একটি দৃশ্যত খোলা কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেখান থেকে কেউ বের হতে পারে না, সেখানে কেউ ঢুকতেও পারে না। ১৯৮২ সাল থেকে সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে এবং আমাদের রাষ্ট্রবিহীন মানুষে পরিণত করেছে। আমাদের নিজেদের গ্রামের বাইরে যেতে হলেও কর্মকর্তাদের অনুমতি নিতে হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া সেই অনুমতি মেলে না। বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। একেবারে ঠান্ডা মাথায় আমাদের এমন অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে আমরা কোনো দিনই এই দুর্দশাপূর্ণ জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে না পারি। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে পেরেছে, তাদের হাতে কোনো সহায়–সম্পদই নেই। এদের মধ্যে অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেতে সক্ষম হয়েছে। আমি সেই ‘সৌভাগ্যবান’ লোকদের একজন। ১৯৯০–এর দশকে শুধু রোহিঙ্গা বলে আমাকে মিয়ানমার সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে দেয়নি এবং সে কারণে আমি দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলাম। আমি তখন থেকেই আমার জনগণের ওপর মিয়ানমার সরকারের নৃশংস নির্যাতন দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে আসছি। 

আইসিজের এই রায় আমাদের কাছে গভীর তাৎপর্য বহন করে। দ্য হেগের আদালত যখন রায়টি দেন তখন আমি আদালতে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় আমি অশ্রুপাত না করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম। আমি যখন দেখলাম, একটি দাপ্তরিক পর্ষদ প্রকাশ্যে মিয়ানমার সরকারের নৃশংস নির্যাতনের ফিরিস্তি দিচ্ছে, তখন আমি রাখাইনে থাকা আমার পরিবার–পরিজন ও বন্ধুবান্ধবের কথা ভাবছিলাম। যে মানুষগুলো আমাকে তাঁদের স্বজন হারানোর বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেই দৃশ্য আমার কল্পনায় ভাসছিল। আদালত যখন রায় দিলেন, তখন আমার মনে হচ্ছিল, এতগুলো দশক ধরে রোহিঙ্গাদের মুক্তির জন্য যে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি, তা অবশেষে কিছুটা হলেও অর্জন করতে পেরেছে। 

আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা গাম্বিয়া নিজেকে ‘মানবাধিকারের বড় স্বরবিশিষ্ট ছোট দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মূল মামলা শেষ হতে অনেক বছর লেগে যাবে। কিন্তু এই সাময়িক পদক্ষেপ আরোপের মধ্য দিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ জয় অর্জিত হয়েছে। 

আইসিজের এই আদেশ মিয়ানমারকে একটি আইনি বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করে ফেলেছে। এই সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার আদেশে আদালত বলেছেন, মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার মতো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা চালাতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে, ইতিমধ্যে চালানো গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট না করা নিশ্চিত করতে হবে এবং এসব আদেশ ঠিকমতো পালন করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। 

মিয়ানমার আইসিজের এই আদেশ মানবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এ নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। কেননা, এই আদেশের প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, এই রায়ে ‘(রাখাইন) পরিস্থিতির বিকৃত ছবি’ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। 

দুঃখের বিষয়, মিয়ানমারের ভাবগতি দেখে মনে হচ্ছে, দেশটির সরকার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার, তদন্তে ধীরগতি, মিথ্যা আশ্বাস এবং ‘আরও সময় লাগবে’ বলে অনন্তকাল কাটিয়ে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আগে যা যা করে এসেছে, এখনো তা–ই করার ফন্দিফিকির করবে। অং সান সু চিকে স্বয়ং সরকারের জনসংযোগ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। আরও পরিহাসের বিষয় এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা একসময় রোহিঙ্গাদের সমর্থন করেছিলেন কিন্তু এখন তাঁরাই সেনাবাহিনীর জন্য কান্না করছেন। তবে এরপরও আশাবাদের সুযোগ আছে। 

পরিস্থিতি উন্নয়নে মিয়ানমার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা নিয়মিত ভিত্তিতে তাকে এখন আইসিজের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। এতে তারা ব্যর্থ হলে সেটি নিরাপত্তা পরিষদে তোলা হবে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন মিয়ানমারকে যতই সমর্থন দিক না কেন আইসিজের এই আদেশ রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হতে সাহায্য করবে। 

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আন্তর্জাতিক বিচারের চাকা ইতিমধ্যেই ঘুরতে শুরু করেছে। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ঘোষণা করেছে, রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে তারা তদন্তে নামবে। ওই একই মাসে আমার নিজের সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় একটি ‘ইউনিভার্সেল জুরিসডিকশন’ মামলা করেছে। 

এসব কারণে মিয়ানমারের নেতাদের ওপর চাপ পড়তে শুরু করেছে। গত ২০ জানুয়ারি তাদের নিজেদের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রথমবারের মতো সরকার স্বীকার করেছে, রাখাইনে ‘যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ঘটেছে। এই স্বীকারোক্তি দেখে বোঝা যায় এখন মিয়ানমার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সরাসরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিতে পারবে না। 

 ২০১৭ সালে যখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের কারণে রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসছিল, তখন আমি এক মাস বাংলাদেশে অবস্থান করেছিলাম। ওই সময় আমি অগণিত মানুষের বুকফাটা আর্তচিৎকার নিজ কানে শুনেছি। তাদের ব্যথা–বেদনা উপলব্ধি করেছি। তারা আমাকে বলেছে, কীভাবে সেনাবাহিনীর গুলি থেকে কোনোরকমে বেঁচে তারা সীমান্ত পার হয়েছে। কীভাবে চোখের সামনে তারা স্বজনদের খুন হতে দেখেছে, কীভাবে নিজেদের ঘরবাড়ি জ্বলতে দেখেছে, সব তারা বলেছে। তারা সে সময় আমাকে বলেছে, তারা এই অন্যায়ের বিচার চায়। 

আইসিজে যখন রায় দিচ্ছিলেন, তখন আমি সেই হতভাগ্য মানুষগুলোর কথা ভাবছিলাম। এই রায় তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু জোরালো করবে, আমি তা নিয়েই তখন ভাবছিলাম। 

এখন আমি এই আশা করার দুঃসাহস দেখাতে পারছি যে একদিন আমরা নির্ভয়ে আমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারব এবং সেখানকার অন্য সম্প্রদায়ের মতো অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারব। 

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
তুন খিন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন