default-image

গত ২২ অক্টোবর২০২০–এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এই সময়ের আলোচিত বিষয় রোহিঙ্গা সংকট এবং তাদের চলমান সহায়তাবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ভার্চ্যুয়াল এ সম্মেলনের আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কমনওয়েলথ, ইউএনএইচসিআরসহ আরও প্রভাবশালী বেশ কয়েকটি দেশ। সেখানে তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। রোহিঙ্গা সংকটের সাম্প্রতিক অবস্থা বিবেচনায় এই সম্মেলনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনে ৬০০ মিলিয়ন অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সাহায্য করেছে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে, এবং এটা একান্তই অস্থায়ী ব্যবস্থা। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথাযথ চাপ সৃষ্টি করা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন যে অন্যান্য দেশগুলোর মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে মিয়ানমারকে আরও দুর্বিনীত হতে সাহায্য করছে, সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতিফলন যেখানে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের অবস্থানও বেশ পরিষ্কার।

সম্মেলনে যে অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এল সেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যা বললেন তার সারমর্ম হলো, বাংলাদেশ এই সংকট মোকাবিলায় মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে, যা ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। তাঁরা আরও বলেন যে মিয়ানমারের উচিত হবে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে। আপতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সবাই তো ঠিকই বলেছে কিন্তু এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়।

প্রথমত, তাদের বলার ধরন অনেকটা তোতা পাখির বুলির মতো প্রাণহীন, যেখানে আন্তরিকতার অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান। রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের যে অমানবিক অবস্থান এবং তাদের ওপর চলমান সহিংসতা, সে বিষয়ে সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলোর বক্তব্যে খুব জোরালো কোনো প্রতিবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। মিয়ানমারকে বাধ্য করার মতো কোনো ধরনের প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ তাঁদের মধ্যে ছিল না।

দ্বিতীয়ত, যে মিলিয়ন ডলারের মানবিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল, তা যেন একধরনের অপরাধবোধ থেকে দায়মুক্তির প্রচেষ্টা। ফলে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে চলমান অন্যায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই সংকটের টেকসই সমাধানে এসব দাতাগোষ্ঠীর ভূমিকাও প্রশ্নমুক্ত নয়। মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো পশ্চিমা দেশ এবং মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের পর্যবেক্ষণ সমানভাবে প্রযোজ্য।

এই দুইয়ের সমন্বয়ে যা অবধারিত হয়ে উঠল সেটি হলো, আগামী কয়েক বছরের জন্য মানবিক সাহায্য নিশ্চিত করা হলো, যেখানে প্রত্যাবাসন এবং টেকসই সমাধানের কোনো জোরালো ইঙ্গিত এখানে দেখা গেল না। দাতাগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান হলো রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য দিয়ে অন্তত আরও কয়েক বছর বাংলাদেশে রাখা।

এটা কোনোভাবেই সম্মেলনে পেশ করা বাংলাদেশের অবস্থানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রসঙ্গত, ১০ অক্টোবর বাংলাদেশের এনজিও প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি করেছেন যাতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় এবং জাতীয় এনজিওদের সমান সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি তাদের সেই দাবির কতটা পূরণ করতে পারবে সেটার পর্যবেক্ষণও সময়ের হাতে হাতে তোলা থাকল।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং প্রতিবেশগত প্রেক্ষাপটে অন্যতম ভুক্তভোগী। এমন একটি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানকে ছাপিয়ে দাতা দেশ এবং সংস্থার ভূমিকা কীভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে—সে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার দাবিদার। বিষয়টি নিঃসন্দেহে অতন্ত জটিল; যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশকে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে গবেষণালব্ধ জ্ঞানভিত্তিক তথ্য এবং যুক্তির মাধ্যমে তার নিজস্ব সমস্যা এবং অভিপ্রায়কে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব বক্তব্যই আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যের ওপর নির্মিত। দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলোর কেন্দ্রীয় আগ্রহের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সমাধানের যে ভিন্নতা রয়েছে সে বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের গবেষণাগুলোর আগ্রহের জায়গা নয়। বাংলাদেশের বক্তব্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই সব গবেষণার (যেমন মানবিক সহায়তা, পয়োনিষ্কাশন, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য শিশুশিক্ষা ইত্যাদি) আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ, দ্য গার্ডিয়ান এবং নিউইয়র্ক টাইমসে যে মতামতগুলো প্রকাশিত হয় তাতে বেশির ভাগ সময়ই সুষ্ঠু সমাধানের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেয়ে তাদের শরণার্থী জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের বিষয় অধিক প্রাধান্য পায়। মিয়ানমারের নিপীড়ক ভূমিকা এবং মোড়ল দেশগুলোর নীরবতাও কখনো কখনো প্রকাশিত হয় বৈকি, কিন্তু সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে দূর থেকে দেখা পর্যবেক্ষণের মতো এবং সেগুলোতে তথ্যপ্রমাণনির্ভর সমস্যা সমাধানের উপায়ের চেয়ে রাজনৈতিক প্রবণতাই বেশি প্রাধান্য পায়। মনে রাখা প্রয়োজন, রোহিঙ্গা সমস্যা একটি বৃহত্তর ও জটিল সংকট, যা কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমেই সঠিকভাবে সমাধান করা সম্ভব।

উপরন্তু, বাংলাদেশি গবেষক এবং চিন্তাবিদদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পর্যবেক্ষণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতেই সীমাবদ্ধ। উল্লেখ্য, হাতে গোনা কিছু উদাহরণ ছাড়া বাংলাদেশি গবেষকদের লেখাগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটকে যেভাবে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারত তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

অন্য দিকে প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক গবেষণা জার্নালগুলোতে রোহিঙ্গা বিষয়ে গবেষণালবব্ধ লেখা প্রকাশ করে যাচ্ছেন বিদেশি গবেষকেরা, যেখানে তাঁদের জ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের (সরকার, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠন বা এনজিও) জন্য অনুধাবন করার জরুরি যে স্থানীয় মতামতের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দূর থেকে দেখা মতামতের বিপরীতে স্থানীয় গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং পর্যবেক্ষণ ভীষণভাবে প্রয়োজন। প্রচলিত এবং প্রবল যে জ্ঞান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত, বাংলাদেশের উচিত তার নিজস্ব স্বার্থে তার বিপরীতে প্রতি-জ্ঞান (counter knowledge) তৈরি করা।

যত দিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জেগে ঘুমাবে আর ফাঁকা বুলি আউড়ে যাবে, তত দিন পর্যন্ত এই সমস্যার খেসারত দিয়ে যাবে বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। অথচ এই দুই পক্ষের এই সমস্যা তৈরিতে কোনো ভূমিকাই নেই।

সম্ভবত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঘুম তখনই ভাঙবে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া রোহিঙ্গারা সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহুল সংখ্যায় মারা যাবে অথবা অন্য কোনো সহিংস উপায় বেছে নেবে। আর তা কিনা বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। আমরা নির্যাতিত রোহিঙ্গা এবং তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বর্বরতার বিষয়ে পরিপূর্ণভাবে সহানুভূতিশীল।

কিন্তু আমাদের গবেষণা থেকে আমরা আরও অবগত আছি যে কিছু রোহিঙ্গা স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় নারী পাচার, মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, যা আমাদের পূর্বাভাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমরা মনে করি বাংলাদেশকে দ্রুত তার অবস্থান দৃঢ়তার সাথে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। এর পাশাপাশি গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর প্রতি জ্ঞান তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশের এনজিও, গবেষক এবং সুশীল সমাজেরও প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের উচিত হবে প্রয়োজনীয় সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা।

পলাশ কামরুজ্জামান শিক্ষক সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

বুলবুল সিদ্দিকী শিক্ষক ও গবেষক, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য পড়ুন 0