default-image

রোহিঙ্গাদের জন্য ৬০০ মিলিয়ন ডলার বা ৬০ কোটি ডলারের মানবিক সাহায্য আসছে। দাতাদের ইচ্ছা, অন্তত ১০ বছরের জন্য রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা দরকার। দাতাদের মাথায় ১০ বছরের সহায়তা পদ্ধতিবিষয়ক চিন্তা ঘুরপাক খাওয়ার অর্থ কী কী হতে পারে? এক, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থাকুক, আমরা (দাতাগোষ্ঠী) খোরপোষের ব্যবস্থা করব। দুই, রোহিঙ্গারা অন্তত ১০ বছরের জন্য অন্য কোথাও যে যাচ্ছে না, তা আমরা (দাতাগোষ্ঠী) নিশ্চিত। তিন, রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে কি যাবে না, কী করবে না করবে, সেসব দেখার দায়িত্ব আমাদের (দাতাগোষ্ঠীর) নয়। চার, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থাকলেই আমাদের (দাতা দেশের) লাভ। পাঁচ, আমরা (দাতা দেশগুলো) রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দিতে আগ্রহী নই।

দাতার দলে আছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আবেদন ও মধ্যস্থতায় নেতৃত্ব দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা। ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর সিদ্ধান্তটি হয়। একটি অনলাইন-নির্ভর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বসে আলোচনারত চারটি পক্ষ এই সিদ্ধান্তটি নেয়।

এই অবস্থাটি বাংলাদেশের জন্য বিভীষিকাময়। সম্মেলনটির আগে-পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর উপর্যুপরি বলেই চলেছে, রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান রোহিঙ্গাদের স্বদেশে-স্বভূমিতে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। সম্মেলনের আগে-পরে বাংলাদেশ দাতাদের কাছে এই অবস্থানটি যতটা সম্ভব তুলেও ধরেছে বলে জানা যায়। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা কামনাও করেছে। কিন্তু দাতারা এই আবেদন-নিবেদনে সাড়া দেওয়ার বিশেষ কোনো প্রয়োজনও যে বোধ করছেন না, ৬০ কোটি ডলারের সাহায্য বা ১০ বছরের সহায়তা-পরিকল্পনার আলোচনা থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ন্যায্য আরজি দাতাদের এড়িয়ে যাওয়ার কিছু কারণ তো অবশ্যই আছে। প্রথম কারণ, বাংলাদেশের স্বর অতটা সরব বা দাপুটে নয়। দাতারা হয়তো অবস্থাটিকে ভিন্নভাবে পাঠ করছে। হয়তো ভাবছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ সর্বান্তকরণে এককাট্টা নয়। অনেক এনজিওর প্রতিবেদনে, এমনকি কিছু গবেষণা প্রতিবেদনেও এ রকম ইঙ্গিত দেওয়া আছে। বলা হচ্ছে যে বিদেশি সাহায্য এবং এনজিও ও দাতাসংস্থাগুলোর মুখর পদচারণে কক্সবাজার-টেকনাফ ছাড়িয়ে চট্টগ্রামের বাইরে পর্যন্ত স্থানীয় অর্থনীতি দারুণভাবে মোটাতাজা হয়ে উঠেছে। প্রজাতন্ত্রের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশ মনে করে, রোহিঙ্গারা এক অর্থে শাপেবর হয়েছে। ঘটনাচক্রে তারা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের ক্রীড়নক হয়ে উঠেছে। দাতারা কিছু করতে বসার আগে সব রকম সূত্র ঘেঁটে এসব তথ্যও জেনে নেয়। তাদের পক্ষে তাই এ রকম ধারণা করা অসম্ভব নয় যে অর্থসাহায্য পাওয়ার বেলায় বাংলাদেশের সরব না হোক নীরব সমর্থন থাকলেও থাকতে পারে।

তবে দাতাদের এই মনোভাব থাকুক বা না থাকুক, অন্য একটি ভূকৌশলগত কারণ নিঃসন্দেহেই আছে। বাংলাদেশের স্বর অদাপুটে বা মিনমিনে হওয়ার কারণ, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) পক্ষে সমর্থন বা অসমর্থন কোনোটিই দিতে পারছে না। অবস্থানটি ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরনের। একসময়ের ‘জোটনিরপেক্ষ অবস্থান বা ‘কারোরই বশংবদ না হয়ে গা এড়িয়ে চলা যায় কি না, দেখি’ ধরনের। আইপিএসের মূল উদ্দেশ্য এই যে চীন পশ্চিমের একমাত্র অর্থনৈতিক শত্রু, এবং ভারতীয়-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য যেকোনো উপায়ে ঠেকাতেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র ধরেই নিয়েছে চীনের ঘোরতর শত্রু ভারতকে সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে। ভারতও সে রকম সহায়ক আচরণই করছে। রাষ্ট্রশাসন পর্যায়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মহাগভীর হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ও উন্নয়ন-সম্পর্কও কম গভীর নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিক পর্যায়ে ভারতপ্রীতি নয়, ভারতবিরোধিতাই প্রকট। তাই বাংলাদেশ সরকারের জন্য আইপিএস একটি অস্বস্তির নাম।

রাখাইন প্রদেশটি চীনের জন্য সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো। ভারত মহাসাগর-তীরবর্তী অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করার জন্য তার একটি কৌশলগত ভৌগোলিক এলাকা দরকার। আরাকানে চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক এলাকা (স্পেশাল ইকোনমিক) প্রতিষ্ঠার সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়ে রয়েছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণের সম্পর্কও সহজ শর্তের নয় যে চাইলেই গাঁটছড়া ছিন্ন করা যাবে। বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারির বড় অংশই চীনের দখলে। বস্তুতপক্ষে চীন, ভারত, জাপান সবার কাছেই বাংলাদেশ ঋণী। ঋণী মানে অর্থনৈতিকভাবে দেনাদার। ঋণগ্রহীতার সীমাবদ্ধতা থাকে। বাংলাদেশেরও সীমাবদ্ধতা আছে। চাইলেই বড় গলায় কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই বাংলাদেশ। চীন মিয়ানমারের এককাট্টা সমর্থক। চীনের শক্তিতে বলীয়ান মিয়ানমার তাই বাংলাদেশ অথবা রোহিঙ্গা বিষয়কে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না সম্ভবত। ভারতের কালাদান প্রকল্পের সুবাদে মিয়ানমার-ভারত সম্পর্কও তুঙ্গে। মিয়ানমারের বিপক্ষে গেলে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াবে না। মিয়ানমারে ভারত, জাপান ও রাশিয়ার সরাসরি বিনিয়োগ আছে। সব দেশই মিয়ানমারকে উচ্চফলনশীল বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।

রাখাইন প্রদেশটি চীনের জন্য সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো। ভারত মহাসাগর-তীরবর্তী অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করার জন্য তার একটি কৌশলগত ভৌগোলিক এলাকা দরকার। আরাকানে চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক এলাকা (স্পেশাল ইকোনমিক) প্রতিষ্ঠার সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়ে রয়েছে। কর্মযজ্ঞও থেমে নেই। ইতিমধ্যে রেল ও গ্যাসলাইন আরাকান পর্যন্ত টানা হয়ে গেছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযুক্তির কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অনেকেরই অনুমান যে চীনের সমর্থন, অনুমোদন ও মদদ না থাকলে মিয়ানমার নির্দ্বিধায় রোহিঙ্গা গণহত্যায় নামত না। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে যে দ্বিপক্ষীয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিটি করেছিল, তার পেছনেও চীনের চাপ ছিল বলেই বিজ্ঞজনের ধারণা।

অর্থাৎ, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ বেকায়দা অবস্থানে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিকল্প নেই। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে মিয়ানমার নানা ছুতোয়, নানা অছিলায় আলোচনায় বসতে কালক্ষেপণ করতে থাকবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আলোচনায় মিয়ানমার বসবে, এমন সম্ভাবনা আপাতত শূন্য। এদিকে কক্সবাজার-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ফুঁসছে। স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী মনে করছে রোহিঙ্গারা শুধু তাদের জীবন-জীবিকাতেই ভাগ বসাচ্ছে না, বরং স্থানীয় সমাজব্যবস্থায় গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে বসছে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে কক্সবাজার এলাকায়। এনজিওদের ব্যাপক বিচরণের সুবাদে ঘরদোর ভাড়া দিয়ে ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়িয়ে সামর্থ্যবানেরা তরতর করে উঠে যাচ্ছেন নব্য ধনীদের কাতারে। অন্যদিকে বেশির ভাগ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ মনে করছে, রোহিঙ্গারা সস্তায় শ্রম দিচ্ছে। ফলে তারা কাজ হারাচ্ছেন। তাঁদের রুটি-রুজিতে ও পেটে লাথি পড়ছে। ধনী-দরিদ্র ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে।

বিজ্ঞাপন

কড়া পাহারা ও নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গাদের লোকালয়ে কাজ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজন মনে করছেন কড়া নিয়ন-কানুনের ফাঁক-ফোকর গলে যে সামান্য অংশ বাইরে বেরিয়ে আসছে, তারাও কম আতঙ্ক-আশঙ্কা তৈরি করছে না। রিলিফের আশায় স্থানীয় দরিদ্র নারীদের রোহিঙ্গা পুরুষ বিয়ে করার খবর যেমন মিলছে, তেমনি স্থানীয় পুরুষদের অনেকের মধ্যে রোহিঙ্গা কার্ড পাওয়ার এবং জাল করার মতো অপরাধের খবরও আসছে। কিন্তু এসব ছোটখাটো ভয়ভীতি ছাড়িয়ে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে অন্য প্রেক্ষাপটে। কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার ফাঁকফোকর গলেই রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ঢুকে পড়েছে ইয়াবা-মাদক-অস্ত্র কালোবাজারি, খুন-রাহাজানি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধকর্মে। এরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ক্যাম্পগুলোয়।

এই সশস্ত্র ক্ষুদ্র অংশের হাতেই জিম্মি হয়ে পড়তে পারে ৯ লাখ নিরীহ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনসাধারণ। উখিয়ার উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ ২০১৮ সালেই প্রধানমন্ত্রী বরাবর ২১ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপির মাধ্যমে এই আশঙ্কাগুলোর কথা জানিয়েছিল। এখন স্থানীয় জনসাধারণের ভয়, যুবসমাজের একাংশ তাদের সঙ্গে ভিড়বে। নারীদের নিরাপত্তা-শঙ্কার কারণ ঘটবে। এমনকি অপরাধীদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে রোহিঙ্গারা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করে বসতে পারে। এ অবস্থায় স্থানীয় লোকজনের অনেকেই মনে করছেন, দাতাদের ঘোষণাটি মানবিক সাহায্য না হয়ে ৬০ কোটি ডলার মূল্যমানের আঞ্চলিক বিপদে রূপ নিতে পারে।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন: অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। সদস্য, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য পড়ুন 0