default-image

করোনার সংক্রমণ ও দ্বিতীয় ঢেউজনিত মৃত্যুসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সরকার জনজীবন ও গণস্বাস্থ্যের কথা ভেবে লকডাউন বা তালাবদ্ধতা দিয়েছে। তার যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলছি না। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তো বলেছেনই, আগে জীবন বাঁচাই, তারপর সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া যাবে।

কিন্তু মাত্র তিন দিনের নোটিশে আন্তর্জাতিক শত শত ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হলো—এটা কতটা যুক্তিযুক্ত? এটা তো নালিতাবাড়ী যাওয়ার বাসের টিকিট নয় যে এক দিন আগেও বাতিল করা যায়। এটা তো ধনবাড়ী যাত্রা নয় যে বাস বন্ধ থাকলেও ভ্যানে চেপে যাওয়া যাবে।

প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাঙালি আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিত্যজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুধু রেমিট্যান্স বা আমদানি-রপ্তানিতে এদের আর্থিক ভাগের অঙ্ক দেখলে ভুল হবে। এদের অবদান আছে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও উদ্ভাবনী বিষয়ে। তাই হঠাৎ করে দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া বিজ্ঞতার লক্ষণ নয়। ভাবাই হয়নি প্রবাসীদের আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তির কথা। বহির্গামী শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করে বিদেশমুখী ফ্লাইট আদায় করে নিয়েছেন। স্বদেশমুখী মানুষের সেভাবে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেই বলেই কি এই উপেক্ষা? এই পক্ষপাতিত্ব?

বিজ্ঞাপন

কেউ বলবেন, লকডাউনে ফ্লাইট বন্ধ থাকবে—এটা প্রত্যাশিত। তা ঠিক নয়। ১৪ এপ্রিলের আগেও লকডাউন ছিল কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ ছিল না। ফ্লাইট বন্ধের কোনো নীতিসংকেতও পাওয়া যায়নি। লকডাউনেরও কি নানা জাত আছে?

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের যাতায়াত ব্যয় দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়ে পড়েছে। সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য মানুষ দুই তিন মাস আগে থেকে টিকিট করার চেষ্টা করে। হঠাৎ করে ফ্লাইট বন্ধ করা এবং এই পাখা কর্তনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না দেওয়ার কারণে প্রচণ্ড অনিশ্চয়তার কবলে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী। কেনা টিকিট ফেরত দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। ক্ষতির শিকার হয়ে এয়ারলাইনসগুলো বাংলাদেশমুখী ফ্লাইট ভবিষ্যতে কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করার কথা ভাবছে। ফ্লাইট কমিয়ে দেওয়া মানেই প্রতি টিকিটে বেশি দামের গচ্চা দেওয়া।

এদিকে টিকিট ফেরত দেওয়ার পর আগের মতো আর যথাসময়ে টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। ঢিলেমি করে, টাকা কাটে। অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার টিকিট কাটার ক্ষমতা হারান। গতবার এ রকম অর্থদণ্ড ও ভোগান্তির পর শেষে চার গুণ মূল্য দিয়ে একমুখী ঢাকাগামী চার্টার বিমানে উঠতে হয়েছিল। তার আগে কাগজপত্র, ডাক্তার, রেজিস্ট্রেশন ও ধৈর্যের যে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল—মনে হয়েছে নাসার রকেট যানে চেপে চাঁদে যাচ্ছি।

প্রবাসীদের ‘কল্যাণ’ নিয়ে ভাবার জন্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। এটাই কি কল্যাণ ভাবনার নমুনা? এই মঙ্গলচিন্তার সঙ্গে এক নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। তার নাম হোটেলে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক খাঁচায়ন বা কোয়ারেন্টিন। তা আবার নিজের গাঁটের পয়সা দিয়ে। এটা অবাস্তব ও একশ্রেণির অত্যাচার। কজনের পকেটে এত টাকা থাকে যে চৌদ্দ রজনী হোটেলে কাটাবে! বিশেষ করে ঢাকায় নামার পর সে অবস্থা কি সবার থাকে?

বিদেশ থেকে যাঁরা আসছেন তাঁদের অধিকাংশই ‘টিকায়িত’। তদুপরি তাঁরা ‘করোনামুক্ত’ এমন সনদ নিয়েই দেশে প্রবেশ করেন। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে তাঁদের সচেতনতা কোনো দেশীয় স্বজনদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং বেশি। এই প্রবাসী সম্প্রদায়কে জোর করে ১৪ দিনের হোটেলবাস দেওয়া মানে হোটেল থেকে নতুন করে রোগবালাই ও ছারপোকা নিয়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত করে ঘরে ফেরানো।

গত বছর মে-জুন মাসে চার্টার ফ্লাইটে দেশে ফিরেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসীদের এই অযৌক্তিক নির্বাসনের কবলে পড়তে হয়নি। কাগজ হাতে সোজা গ্রামে চলে গিয়ে ‘আত্মখাঁচায়নে’ থেকে বর্ষার রূপ দেখেছি। স্থানীয় প্রশাসনও জানত। পাড়ার লোকেও দেখত ঠিকমতো নিয়ম মেনে চলছি কি না।

এটাই বাস্তবানুগ নীতি। ঢাকা তো আর সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক নয় যে দুকদম হাঁটলেই একটা করে হোটেল পাওয়া যাবে। ফ্লাইট বন্ধ রাখা আত্মঘাতী। কি অর্থনীতি কি মানবিক দিক—সব বিচারেই।

বিজ্ঞাপন

সামনে ঈদ। হাজার হাজার প্রবাসীর বাসনা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবে। একই সঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল। ফ্লাইট খুললে শত কড়াকড়ির মধ্যেও যে হাজার হাজার প্রবাসী দেশে ঢুকবে তাদের ২৯ কেন ২৯০টা হোটেলে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁদের সামর্থ্যের কথা ভাবাই হয়নি। তাই গ্রামেগঞ্জে স্বগৃহে আত্মখাঁচায়ই উত্তম পন্থা। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন খোঁজখবর রাখবে। দরকারে ১৪ দিন পর থানায় রিপোর্ট করতে হবে।

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে কয়েকবার ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে ঢুকেছি। ওরা ঢাকা থেকে প্রাপ্ত করোনাহীনতার সনদ দেখেছে, তাৎক্ষণিক তাপমাত্রা নিয়েছে, উপদেশের কাগজ ধরিয়ে ছেড়ে দিয়েছে—সাত দিন আত্মখাঁচায়নে থাকতে বলেছে। এই যা। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে হোটেলে তোলেনি। বরং হোটেলগুলো ছোঁয়াচে রোগের আখড়া। এ ব্যাপারে সবাই সতর্ক।

এ জন্য করোনা শুরুর পর থেকে হোটেল ব্যবসায় ধস নামে। লোকে পারলে এয়ারপোর্টে রাত কাটায় (মশা নেই)। কিন্তু হোটেলে ঢোকে না। এদিকে ঢাকার চিত্র উল্টো। ওখানে হোটেল ব্যবসার যেন মরা গাঙে বান ডাকার উপক্রম। সেটিও উদ্ভট নীতির কারণে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ স্বদেশে লেগেছে, যা উদ্বেগজনক। মৃত্যু বৃদ্ধি দুঃখজনক। কিন্তু ফ্লাইট থেকে এগুলো স্বদেশে ঢুকেছে—এ ধারণা এখনো অপ্রতিষ্ঠিত। আসলে করোনা সঠিক গবেষণার ফল পেতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ছোঁয়াচে রোগের বিশেষজ্ঞ মনিকা গান্ধী আজ সকালে জাতীয় গণবেতারে বলছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগ নানা শাখা-প্রশাখা বা প্রজাতি সৃষ্টি করে কোন দিকে যাচ্ছে বলা কঠিন। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও টিকাবিপ্লবের বদৌলতে মনে হয় এর চোটপাট কমে আসছে। তিনি ফ্লাইট বন্ধ রাখতে বলেননি।

দ্বার রুদ্ধ করে থাকা কিংবা দূরে থাকার কারণেই এ মহামারি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে—এ ধারণাও অপ্রতিষ্ঠিত। চীনের বহুদূরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও ব্রাজিলে মৃত্যুর মিছিল কি বড়ই না হলো। অথচ পাশে থেকে ভিয়েতনাম বেশ সামাল দিল, দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে উত্তর কোরিয়া রক্ষা পায়নি। আবার উত্তর কোরিয়ার মতো থাকলে বাংলাদেশ বাঁচতে পারবে না। প্রবাসীদের অর্থনীতি না থাকলে আজকের বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি ক্ষমতা বা ব্যালান্স অব পেমেন্ট বলে কিছু থাকত না।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে কমলা হ্যারিস বলেছিলেন যে ট্রাম্প প্রশাসন করোনা যে ‘বায়ুবাহিত’ এটা স্বীকার করেনি, বরং উল্টো প্রচার দিয়ে মৃত্যু বাড়িয়েছে। বায়ুবাহিত হলে ফ্লাইট বন্ধ রাখলেও এটি যাবে। কিংবা ফ্লাইট থেকে নামিয়ে সম্পূর্ণ নীরোগ ও টিকায়িত প্রবাসীদের বারো জাতের মানুষের মেলামেশার হোটেলে পুরে দিলে করোনার দ্বিতীয় জোয়ারে ভাটা নামবে—এই দাবি কি প্রতিষ্ঠিত? প্রমাণিত? কোনো বিশেষজ্ঞ এর দাবি করলে পৃথিবীর আরও সভ্য দেশগুলোর ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’ দেখতে বলব।

ঝুঁকি তো কিছু থাকেই। কিন্তু ঝুঁকির ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করলে তার ক্ষতিটা অনেক বেশি হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র আমিশ নামে একটা সম্প্রদায় আছে। বড়ই প্রকৃতিবাদী। টিভি দেখে না। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। বাইরের কারও সঙ্গে মেশে না। অন্য সম্প্রদায়ে বিয়েও করে না।

শুরুতে ওরা অহংকার করেছিল ওদের করোনা হবে না। দ্বার রুদ্ধ! আমাদের দেশেও এ রকম ধর্মান্ধ কিছু ‘মহাবাণী’ কানে এসেছিল। ইউএসএ টুডে পত্রিকা তাদের এই অবাস্তব অহংকার নিয়ে কটাক্ষ করেছে। মহামারি তাদের কোনো অংশে কম হয়নি। ওদের নেতারা দ্বিতীয় দফা বাণী ছেড়েছে, টিকা না নেওয়ার জন্য। জানের ভয় সবারই আছে। রেডিওতে শুনলাম চালাক আমিশেরা লুকিয়ে লুকিয়ে টিকা নিচ্ছে।

করোনাযুগের কবে অবসান হবে, কেউ বলতে পারে না। এর মধ্যেই সতর্কতার সঙ্গে জীবন চলবে। ফ্লাইটও চলবে। কারণ, বাংলাদেশে আগের চেয়ে আজ অনেক বেশি বিশ্বায়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আকাশপথে দেশে নেমে আমরা যেন তথাকথিত নিরাপত্তার নামে হোটেলবাসের অর্ধমাসিক অত্যাচারে না পড়ি। যাব বাপের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ি। গ্রামে যেতে চাই!

বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অর্থনীতির অধ্যাপক।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন