বিজ্ঞাপন

ইসরায়েলর স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই সেখানকার অধিবাসী লাখ লাখ আরবের ওপর নেমে আসে অনিঃশেষ বিপর্যয় (আল-নাকবা)। ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সেনারা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য হত্যা-ধর্ষণ-লুট-অগ্নিসংযোগ শুরু করে। প্রাণভয়ে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি বাড়িঘর, সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে পালাতে থাকে। তারা দলে দলে জর্ডান, লেবানন ও সিরিয়ায় গিয়ে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেয়। হলোকাস্টের নির্মম তাজা স্মৃতিকে পুঁজি করে ইউরোপীয় আশেকনাজি ইহুদিদের ষড়যন্ত্র ও কূটচাল সফল হয়। ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে জোরপূর্বক দখলদারি নিয়ে যাত্রা শুরু করে ইসরায়েল-হিব্রু বাইবেলের পুরোকথার দোহাই পেড়ে ‘ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতে ফিরে আসা’র মধ্য দিয়ে। সেই থেকে এক অনিঃশেষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয় ফিলিস্তিনিরা, যা আজও চলছে। আর তাই প্রতিবছর ১৫ মে ফিলিস্তিনিরা নাকবা দিবস হিসেবে পালন করে।

এবারের নাকবা দিবসও এসেছে জায়নাবাদী তথা উগ্র ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের ৭৩তম জন্মবার্ষিকীর পাশ ঘেঁষে। এসেছে গাজায় ইসরায়েলের বিমান-বোমা হামলা-নিধনযজ্ঞ আর জেরুজালেমে হারাম-আল-শরিফ প্রাঙ্গণে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন-দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই চলেছে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন, চলছে তাদের সহায়-সম্পত্তি চুরি, ডাকাতি ও লুটপাট।

ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা রুখতে ১৯৪৮ সালের মে মাসের মাঝামাঝি মিসর, লেবানন, সিরিয়া, জর্ডান ও ইরাকের সম্মিলিত বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ও রুশ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইহুদি বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠা তাদের কর্ম ছিল না। এ কারণে কিছুদিনের মধ্যেই আরব বাহিনীগুলো পিছু হটে যায়। আর ১৯৪৯ সালের প্রথমভাগের দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়।
নির্বিচারে লুটপাট

কিন্তু এই সময়ের মধ্যে থেকে থেকে চলা সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনি আরবদের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পত্তি নির্বিচারে লুটপাটের শিকার হয়। ইসরায়েলি সেনা ও সাধারণ ইহুদিরা যে যেভাবে পেরেছে, লুটপাট করেছে। তা শুরু করেছে ১৯৪৮ সালের ১৪ মের আগ থেকেই আর চলেছে কয়েক মাস ধরে। কী লুট করা হয়নি এই সময়ে? ফিলিস্তিনিদের ফেলে যাওয়া হাজার হাজার ঘরবাড়ি, দোকানপাট, গুদাম ও কারখানা। সেখান থেকে যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য, গবাদিপশু, কাপড়চোপড়, অলংকার, আসবাবপত্র, পিয়ানো, ইলেকট্রিক সামগ্রী, গাড়ি—যা পাওয়া গেছে, সবই লুটে নিয়েছে ইহুদিরা।

ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ অ্যাডাম রাজ তাঁর গবেষণালব্ধ এক বইয়ে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। এ জন্য তিনি ইসরায়েলের ৩০টি আর্কাইভে গিয়ে দলিলপত্র ঘেঁটেছেন এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য লিখিত কাগজপত্র দেখেছেন। সেগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে তিনি হিব্রুতে রচনা করেছেন বইটি, যার নাম ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আরবদের সহায়-সম্পত্তি লুটপাট’। ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎসে এ নিয়ে নিয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে গত বছর অক্টোবর মাসে।

শুধু ডেভিড বেন গুরিয়ন নন, তাঁর একসময়ের সতীর্থ ও ইসরায়েলের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি আইজাক বেন-জাভির বর্ণনাতেও উঠে এসেছে লুটপাটের স্বীকৃতি। ১৯৪৮ সালের ২ জুন বেন গুরিয়নকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, জেরুজালেমে যা হচ্ছিল, তা ছিল ইহুদি জনগণ ও লড়াকু সৈনিকদের মর্যাদার জন্য ‘ভয়ংকর রকম’ ক্ষতিকর ব্যাপার। তিনি আরও বলেছিলেন, লুটতরাজে জড়িত ইহুদিরা সবাই ছিল ‘ভদ্র ইহুদি’, যারা এ ধরনের ডাকাতিকে স্বাভাবিক ও অনুমোদিত বলে মনে করত।

default-image

ইহুদি সশস্ত্র বাহিনী হাগানাহর স্ট্রাইক ফোর্স ছিল পালমাখ। এর নেগেভে ব্রিগেডের একজন সৈনিক হাইম ক্রেমারের লিখিত সাক্ষ্য সংরক্ষিত আছে ইসরায়েলের এক অভিলেখগারে। এতে তিনি জানাচ্ছেন, ‘পঙ্গপালের মতো তিবেরিয়াসের (ইহুদি) অধিবাসীরা (আরবদের ফেলে যাওয়া) বাড়িগুলোয় ঝাঁপিয়ে পড়ে...আমাদের রীতিমতো লাথি-ঘুষি দিতে ও লাঠি চালাতে হয় তাদের পিটিয়ে সরিয়ে দেওয়ার ও লুট করা জিনিসপত্র ফেলে রেখে যাওয়ার জন্য।’ নেগেভে ব্রিগেডকে তিবেরিয়াসসহ কয়েকটি স্থানে পাঠানো হয়েছিল এ ধরনের লুটপাট ঠেকাতে। এমনকি অনেক সৈন্যও এ ধরনের লুটপাটে যোগ দিয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন খোদ হাগানার একজন কমান্ডার নাহুম আভে। তবে ক্রেমার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘হাগানার বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা লেগে গিয়েছিল...তারা গাড়ি ও নৌযানে চেপে এসেছিল আর ফিরে গিয়েছিল রেফ্রিজারেটর, বিছানাপত্র ও আরও অনেক কিছু বোঝাই করে নিয়ে।’

পালমাখের এক নারী সৈনিক নেটিভা বেন-ইহুদা যোগ দিয়েছিলেন তিবেরিয়াস দখলের লড়াইয়ে। তাঁর লিখিত ভাষ্য থেকেও বইটিতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন অ্যাডাম রাজ। বেন-ইহুদা বলছেন, ‘এ ধরনের ঘটনার ছবি আমাদের জানা। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সব সময় আমাদের সঙ্গে করা হয়েছে। হলোকাস্টের সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হয়েছে বিভিন্ন সময়ে সুসংগঠিতভাবে ইহুদিদের হত্যা ও তাদের সম্পদ লুটপাট (পোগ্রম)। আর এখানে আমরা কিনা অন্যদের সঙ্গে এই জঘন্য কাজ করছি। আমরা সবকিছু ভ্যানে তুলে নিয়েছি। এ সময় আমাদের হাত কাঁপছিল। না, জিনিসপত্রের ওজনে নয়; বরং এখনো আমার হাত কাঁপছে, যখন আমি ঘটনার বিবরণ লিখছি।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিশ নাগরিকেরাও প্রতিবেশী ইহুদিদের সহায়–সম্পত্তি লুট করেছে। এ রকম সমালোচনার জবাবে অ্যাডাম রাজ বলেছেন, ‘যুদ্ধকালে লুটপাট হাজার বছর ধরে হয়ে এলেও ইহুদিরা যেভাবে ফিলিস্তিনি আরবদের জিনিসপত্র ও সম্পত্তি লুট করেছে, তা এই ধারায় ফেলা যায় না। কেননা, এখানে বেসামরিক ইহুদিরা, যারা অনেকেই আরবদের প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করেছে, লুটপাটে অংশ নিয়েছে। এই ইহুদিরা কোনো অপরিচিত শত্রুর ঘরবাড়ি লুট করেনি। (ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক বছর আগে থেকেই ইউরোপ ও রাশিয়া থেকে দলে দলে ইহুদি এসে ফিলিস্তিনে আবাস গড়েছিল। এ ছাড়া শত বছরের বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় আরবদের সঙ্গে বাস করা কিছু ইহুদি পরিবারও ছিল।) তা ছাড়া, এই লুটেরারা জানত যে তারা অনৈতিক কাজ করছে, তবু তারা নিবৃত্ত হয়নি। আবার বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়ায়নি।’

বইটিতে এসব লুটপাটের জন্য কিছু ইহুদির শাস্তি হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। লুটকারীদের বিরুদ্ধে কয়েক শত মামলা করা হয়। তবে শাস্তি ছিল খুবই লঘু। সামান্য জরিমানা থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জেল।

ইহুদি নেতাদের সমর্থন
রাজ মনে করেন, এই লুটতরাজে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক ইহুদি নেতৃবৃন্দের সমর্থন ছিল। যার ফলে এটা ইসরায়েলি সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে। লুটপাটে সমর্থন দেওয়ার উদ্দেশ ছিল যেন আরব অধিবাসীদের তাড়িয়ে দেওয়ার, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার নীতি বাস্তবায়নের অংশ। লুটেরারা অপরাধী হয়ে ওঠে। তারা আর আরবদের নিজভূমে ফিরে আসতে না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন নীতি ও বিধি তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।

তাহলে আরবদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র, খেতখামার নিয়ে কী করা উচিত ছিল, তা জানতে চাইলে রাজ বলেন, ‘ঘটনার ৭০ বছর পর করণীয় সুপারিশ করার কোনো মানে নেই। বড় কথা হলো, অনেকেই এটা ধরে নিয়েছিল যে বেন গুরিয়ন এই লুটপাট সমর্থন করছেন। কাজেই এটা চালাতে কোনো অসুবিধা নেই।’ তিনি আরও জানান, কোনো কোনো নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রী লুটপাটের সমালোচনা করেছিলেন এবং একটি সরকারি কর্তৃপক্ষ গঠন করে তার মাধ্যমে আরবদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তিকে দখলে এনে তারপর সেগুলোর বিহিত-বণ্টন করার কথা বলেছিলেন।

তবে বেন গুরিয়নের ক্ষোভজনিত উক্তির বিষয়ে ইসরায়েলি লেখক ও সমাজকর্মী ওদেহ বিশরাত ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎসে যে মন্তব্য করেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, ‘যখন ওই ব্যক্তি (বেন গুরিয়ন) নিজে আট লাখ আরবকে বিতাড়িত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তখন তিনি কী করে আশা করেন যে তাঁর অধস্তনেরা সুবোধ হয়ে থাকবে? তারা বিতাড়িতদের রেখে যাওয়া আসবাবপত্র, খামারবাড়িতে থাকা গম, খোঁয়াড়ে থাকা ছাগল আর সিন্দুকের সোনা পাহারা দিয়ে রাখবে, যতক্ষণ না বিতাড়িত মানুষগুলো ফিরে আসে? আসলে এসব কথা হলো জাতির পিতার কুম্ভীরাশ্রু আর তাঁর দ্বিচারিতা কুমিরকেও লজ্জা দেবে। প্রাচীন এক আরব কবি তো বলেই গেছেন, ‘যদি বাড়ির কর্তা ঢোল বাজাতে শুরু করে, তবে বাড়ির ছেলেদের নাচানাচি করার জন্য দোষ দিয়ো না।’

বিশরাত আরও লিখেছেন, ‘বেন গুরিয়নের উদার সহযোগিতায় (ইসরায়েলের) প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্ম পরিণত হয়েছিল লুটেরা প্রজন্মে। আর আমরা তো আরব ভূমি ‍লুটে নেওয়ার বিষয়ে কথার অপচয় করব না, যা হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে! হাজার হোক, এই জমির দখল নেওয়া তো ছিল এক মহিমান্বিত দেশপ্রেমিক নির্দেশনা!’

আসজাদুল কিবরিয়া লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন