default-image

চীন সরকার সম্প্রতি এমন কিছু নীতি অবলম্বন করছে, যেগুলোকে বাস্তব অবস্থার সঙ্গে খুব একটা সংগতিপূর্ণ মনে হচ্ছে না। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো হংকংয়ের ওপর জাতীয় নিরাপত্তা আইন চাপিয়ে দেওয়া। ১৯৯৭ সালে ব্রিটিশ সরকার হংকংকে চীনের শাসনাধীনে ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে হংকং ‘এক দেশ দুই শাসন ব্যবস্থা’ শীর্ষক যে ব্যবস্থা অনুযায়ী চলছিল, জাতীয় নিরাপত্তা আইনটি তড়িঘড়ি করে গত ৩০ জুন চীনের রাবার স্ট্যাম্প ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে পাস করার পর তার চির অবসান হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, এ আইনের কারণে চীনের সঙ্গে পশ্চিমাদের বৈরিতা আরও অনেক গুণ বেড়ে গেল।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে হংকংয়ের ভবিষ্যৎ গভীর খাদে পড়ল। হংকংবাসী এখনো তাদের স্বাধীনতার অধিকারের পক্ষে যথাসম্ভব প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষোভ-বিক্ষোভ শহরটিকে আগের চেয়ে কম স্থিতিশীল করবে। চীনের এ সর্বশেষ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে তার ইউরোপিয়ান মিত্রদের চীনবিরোধী দলে ভেড়াতে উসকানি দেবে।

আইন অনুযায়ী, বেইজিং হংকংয়ের বিদ্যমান স্বাধীন আইনি ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য বা বাতিল করতে পারবে। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব মামলা বিচারকদের শুনানির জন্য বাছাই করা হবে, সেই ক্ষমতা থাকবে হংকংয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের। আর হংকংয়ের আদালতে যখন এ-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার বিচার চলবে তখন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করেছে—এমন ঘটনার মামলায় চীনের মূল ভূখণ্ডের নিরাপত্তা শাখাগুলোর কর্তৃত্ব খাটানোর এখতিয়ার থাকবে।

হংকংয়ে বেইজিংয়ের যে জাতীয় নিরাপত্তা অফিস থাকবে, সেটি স্থানীয় কর্মকর্তাদের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক নীতিনির্ধারণে নির্দেশনা দেবে ও তা তদারক করবে। সেই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সেগুলো বিশ্লেষণ করবে এ অফিস।

হংকংয়ের সরকার সেখানে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন গঠন করবে। এর প্রধান হবেন এই নগরের বর্তমান প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম। ওই কমিশনে বসার জন্য একজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দেবে বেইজিং। আধা স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলের স্থানীয় আইনগুলো যখন সংগতিপূর্ণ বলে বিবেচনা হবে না, তখন নতুন নিরাপত্তা আইনের ধারাগুলো প্রযোজ্য হবে।

নতুন আইনে বিচ্ছিন্নতাবাদ, কেন্দ্রীয় সরকার পতন, সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন করতে বিদেশি বাহিনীর সঙ্গে আঁতাতমূলক যেকোনো কাজ শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হংকংয়ের আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে যেকোনো নিরাপত্তাসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এ আইনে।

আইন কার্যকর হওয়ায় চীনের নিরাপত্তা বাহিনী হংকংয়ে প্রকাশ্যে কার্যালয় খুলতে পারবে, যা তারা আগে পারত না। এ কার্যালয় জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখবে। তারা হংকং নয়, বরং চীনা আইন অনুযায়ী কাজ করবে। আসলে এ আইন হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী।

এটি মনে করা যেতে পারে, চীন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্ষমতার চর্চা করছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের হাতে অনেক ক্ষমতা থাকার কারণেই সম্ভবত চীন এ ধরনের একটি বাজে সিদ্ধান্ত নিল। এটিকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পরোক্ষভাবে এই বার্তা দিয়েছে যে তারা বাকি বিশ্বকে জঙ্গল মনে করে। তারা মনে করে পেশিশক্তি দিয়েই ক্ষমতাকে সংহত করতে হয়।

চীনের সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিং বলতেন, ‘নিজের শক্তি গোপন রাখো, সর্বোচ্চ সময় পর্যন্ত টিকে থাকা নিশ্চিত করো।’ চীন হয়তো সেই নীতি থেকে এখন সরে এসেছে। এখন সে শক্তি প্রদর্শনের নীতি গ্রহণ করতে শুরু করেছে। ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্য হংকংকে যখন চীনের হাতে ছেড়ে দেয়, তখন যে চুক্তি হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, ১৯৯৭ সালের পর পরবর্তী ৫০ বছর হংকং স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে হংকংবাসীর পছন্দ অপছন্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে চীন সেই চুক্তির শর্ত থেকে সরে এসেছে এবং হংকংয়ের ওপর নিবর্তনমূলক আইন চাপিয়ে দিয়ে পশ্চিমাদের নিজের শক্তি দেখাচ্ছে।

দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিকীকরণ এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, এর মধ্যে হংকংকে নতুন করে শাসনের বেড়ি পরানোয় যুক্তরাজ্যসহ অন্য পশ্চিমা দেশগুলো চীনের প্রতি বিরাগভাজন হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

মিন জিন পেই ক্ল্যারেমোন্ট ম্যাককেনা কলেজের অধ্যাপক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0