default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি হচ্ছে আগামী ১ জুলাই। ২১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন হওয়া একটি ওয়েবিনারের মাধ্যমে শতবর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের যেকোনো সদস্যর জন্য শতবর্ষ একটি বিরাট মাইলফলক। এটি উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে শতবর্ষের কিছু লোগো ঢাবির অ্যালামনাইরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছেন।

তবে একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শোচনীয় ছবিও ভেসে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসের বারান্দা, ছাদ বা মিলনায়তন ও লাইব্রেরির। গণরুম নামে পরিচিত নোংরা ও অরক্ষিত এসব স্থানে গাদাগাদি করে মাটিতে শুয়ে-বসে আছে কিছু ছিন্নমূল ধরনের মানুষ। এই মানুষেরা আমাদের ছাত্র। বস্তি, ফুটপাত, শরণার্থীশিবির নয়; ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের সাধারণ চিত্র এগুলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের রূপকল্প বক্তব্য ও গৃহীত কার্যক্রমে এসব মলিন মুখের ছাত্রদের নিয়ে কোনো কথা নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় বিনির্মাণের কথা আছে; শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা উন্নয়নের লক্ষ্য আছে, আছে তথ্যচিত্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের খবর, আছে এমনকি লন্ডনে একটি ব্যয়বহুল আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের তথ্যও। নেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয় যাদের জন্য, সেই ছাত্রদের তীব্র ও মানবেতর আবাসন–সংকট নিয়ে কোনো রূপকল্প বা পরিকল্পনার কথা।

বিজ্ঞাপন

২.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। কিন্তু এর আবাসিক চরিত্র ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়নি। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ পর দিনে দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি ছাত্রসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ হারে। তুলনায় আবাসন সুবিধা কিছুটা বাড়লেও এর পরিপূর্ণ সুফল পায়নি সাধারণ ছাত্ররা। বরং হল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেআইনিভাবে নিজেরা দখল করে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো আবাসন সুবিধা একচ্ছত্রভাবে ভোগ করেছে, কখনো ছাত্রত্ব শেষ হওয়া নেতা বা বহিরাগত ক্যাডারদের হলে থাকার সুযোগ দিয়েছে। সাধারণ অনেক ছাত্রের জায়গা হয়েছে গণরুমে, এমনকি কখনো কখনো ভিন্নমত দমনে সহিংস অংশগ্রহণ করার দাসখত দিয়ে।

ছাত্রাবাসের কক্ষগুলোতে থাকা ছাত্রদের অবস্থাও ভালো নয়। প্রায় ৩৬ হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে কমপক্ষে ২৪ হাজার আসে ঢাকার বাইরে থেকে। অথচ আবাসিক সুবিধা দেওয়া যায় খুব বেশি হলে ৬ হাজার জনকে। যারা বৈধভাবে আবাসন সুবিধা পায়, তাদেরও নিজ কক্ষে থাকতে হয় অন্য আরও তিন–চারজনের সঙ্গে। অভিযোগমতে, এই অতিরিক্ত তিন–চারজনকে হলে ওঠায় ছাত্রলীগ (আগে ওঠাত ছাত্রদল)। এদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আসা বাধ্যতামূলক। এমন কর্মসূচিতে বৈধভাবে আসন পাওয়া কেউ না এলে কোনো অজুহাতে (বিশেষ করে জামায়াত-শিবির অপবাদ দিয়ে) তাকে মেরে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে মাঝেমধ্যে। শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করে এভাবেই হাজার হাজার ছাত্রকে অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ছাত্রাবাসের কক্ষে বা গণরুমে।

কক্ষে তবু থাকার পরিবেশ আছে কিছুটা, গণরুমে তা–ও নেই। তীব্র শীত বা গরমে, মশা আর ছারপোকার কামড় খেয়ে, খাঁচার ভেতরের গাদাগাদি মুরগির মতো একে অন্যের ওপর লেপ্টে থেকে এই ছাত্ররা কীভাবে নির্মাণ করবে নিজেকে? আমার আইন বিভাগের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে পরীক্ষায় ফেল করা, পরীক্ষা ড্রপ দেওয়া, নানা অজুহাতে পুনর্ভর্তি হওয়া, মানসিক সমস্যায় ভোগা এমনকি বিপথগামী হওয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণরুমে নির্ঘুম, শেয়ারে ঘুম, বিঘ্নিত ঘুম ঘুমিয়ে, দিনের বেলায় ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলক হাজিরা দেওয়ার ক্লান্তি কাটিয়ে কতজনের মানসিকতা থাকে ঠিকমতো ক্লাস, পড়াশোনা আর লাইব্রেরির কাজ করার?

৩.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং, পড়াশোনার মান আর গবেষণা নিয়ে এখন প্রচুর লেখালেখি হয় পত্রিকায়। এর কিছু বিষয় অতিরঞ্জিত, কিছু বিষয় সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান ভালো না হলে কীভাবে এর ছাত্ররা জাতীয় এমনকি বহু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও ভালো করছে? এখানে গবেষণা হয় না এটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। অনলাইন আপলোড ও সাইটেশন বাড়ানো হলে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বিভিন্ন নেটওয়ার্কিং হলে, বিদেশি শিক্ষক ও ছাত্রদের আনার চেষ্টা করা হলে এর র‌্যাঙ্কিংও সহজে বাড়ানো সম্ভব। এসব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন আন্তরিক হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ও পড়াশোনায় নিবিষ্ট হওয়ার পরিবেশ। সেটি নিয়ে কখনো খুব আন্তরিক হতে দেখা যায় না।

আবাসন সমস্যা বহুলাংশে লাঘব করা যায় কিছু ব্যবস্থা নিলে। যেমন বিদেশের মতো হলে আসন বণ্টন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া যায় প্রথম বর্ষের ছাত্রদের। সিনিয়র ছাত্রদের মতো তারা নতুন শহরকে চিনতে বা কোনোভাবে কিছু উপার্জন করতে শেখে না, পরিচিত মহলও তাদের অনেক ছোট থাকে। তাই আবাসন–সংকট না কমা পর্যন্ত অন্যদের বাদ দিয়ে নতুন ভর্তি ছাত্রদের শতভাগ আসন ছাত্রাবাসে নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করে তা ক্রমান্বয়ে কার্যকর করা যায়। তা ছাড়া প্রতিটি রুমের আসনসংখ্যা বৈধভাবে দ্বিগুণ করা যায়। যেমন দুজনের রুমকে চারজনের (যেখানে ইতিমধ্যে থাকছে অন্তত ছয়জন)। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেটের আরও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নতুন নতুন হল নির্মাণ করার পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

৪.

এসব নিয়ে আগে আমি লিখেছি, অন্যরাও লিখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে মনে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তিতে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে নানা অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। আমরা কি অন্তত একটি মতবিনিময় আয়োজন করতে পারি ছাত্রদের আবাসন সমস্যা নিয়ে? একবার করতে পারি এ নিয়ে সরেজমিনে কোনো ব্যাপক গবেষণা?

নাকি গণরুমের মলিন মুখ ওয়েবিনারের জৌলুশে ঢেকেই আমরা পালন করব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষপূর্তি?

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন