ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন
ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনছবি প্রথম আলো

উন্নয়নের নামে বিদ্যমান শহর-নগরে যে বিপদ নেমে আসতে পারে, বিশ্বজুড়ে তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। ১৯৫০ সালের দিকে আমেরিকান নগরনেতা রবার্ট মোজেস নিউইয়র্ক শহরের প্রাণচঞ্চল জনবসতি গুঁড়িয়ে তার ভেতর লম্বা হাইওয়ে টেনে নিয়ে যান। পাড়াভিত্তিক বন্ধন ভেঙে যাওয়ায় যে দুর্ভোগ নেমে আসে, এখনো তার ভুক্তভোগী হারলেম ও ব্রঙ্কস এলাকা। নিউইয়র্কের আগে ফরাসি সম্রাটের অফিসার ব্যারন হাউজম্যান পুরোনো প্যারিসের বুনন ভেঙে সোজা সরল প্রমেনাড তৈরি করেন। যদিও তা এখন প্যারিসের শোভা, তবু আদি প্যারিসকে বিলুপ্ত করার জন্য হাউজম্যানকে এখনো গালমন্দ শুনতে হয়।

প্যারিস ও নিউইয়র্ক, দুই যুগে দুটো শহর। একটা শিল্পবিপ্লব আরেকটা মোটরবিপ্লবের তোড়ে তড়িঘড়ি করে সামগ্রিকতা চিন্তা না করে অনেক কিছু ঘটিয়েছে। পরবর্তী সময়ে দুটো শহরই আবার ধীরে ধীরে আগের বৈশিষ্ট্যগুলো ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে এবং এখনো করছে।

এসব কথা মনে পড়ছে ঢাকা শহরের দর্শনীয় ও নিদর্শনমূলক বাড়িঘর ভাঙার একতরফা তোড়জোড় দেখে। আমি ঢাকা শহর নিয়ে অনেক দিন ধরে লিখছি। ঢাকা শহরের প্রাণবৈচিত্র্য ও ঢাকা শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে। একটা জিনিস মনে হয়েছে—এ শহরের কোনো আইকনিক দৃশ্য নেই। মানে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, দিল্লি শহরের কুতুব মিনার, নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং বা সেন্ট্রাল পার্ক। ঢাকার এমন কোনো মনকাড়া বাড়ি বা জায়গা নেই, যা পৃথিবীকে একনজরে দেখিয়ে দেবে, হ্যাঁ, এটাই মনেপ্রাণে প্রকৃত ঢাকা। সংসদ ভবন ও এর-সংলগ্ন এলাকা হতে পারত বা এখনো হতে পারে ঢাকার প্রতিচ্ছবি, কিন্তু কোনো কারণে সেটাকে নিয়ে আমরা বেশি এগোইনি।

বিজ্ঞাপন

গুগল ইমেজে ‘ঢাকা’ সার্চ দিলে দেখা যায় শুধু গিজগিজ করা শ্রীহীন বাড়িঘর বা গিজগিজ করা স্থবির গাড়ির বহর। গর্ব বোধ করার মতো কিছু নেই। তবে একসময় তো ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়। পালতোলা নৌকা নিঃশব্দে ভেসে যেত, পাড়ে ঘুরে বেড়ানো যেত। এখনকার বুড়িগঙ্গার কথা ভাবলেই তো নাকে রুমাল চাপতে হয়। ছিল একসময়কার নিউমার্কেট, খোলা পরিবেশ, মাঝখানটায় বাগান। ইতিমধ্যে মসজিদ ও অন্যান্য বাড়ি প্রসারিত হতে হতে এখন ঠাসাঠাসি দালানের প্রতিযোগিতা।

ঢাকা শহরকে বলা হয় মসজিদের শহর। কত রূপ ও কত ধরনের মসজিদ। সেগুলোকে আদি আদলে রাখা গেলেও শহর একটা পরিচয় পেত। ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদগুলোকেও আমরা নির্বিচারে বিকৃত করেছি, উন্নতির নামে। ঢাকার পুরোনো মসজিদগুলোর ভেতর তারা মসজিদ অন্যতম। ছোটবেলায় মসজিদের পাশেই আমাদের বাড়ি ছিল। জুমা থেকে ঈদের নামাজ, বহুবার গিয়েছি। মনে পড়ে মসজিদের চিনিটিকরি দেয়ালের গা ঘেঁষে বসে ছোটবেলায় শিশুসুলভ চিন্তাভাবনায় মগ্ন থেকেছি। তখন কি ভেবেছিলাম এই মোগল স্থাপত্যের তিন গম্বুজ মসজিদ প্রসারণের নামে বিকৃত করে ফেলা হবে?

তিন গম্বুজের জায়গায় পাঁচ গম্বুজ হবে! তিন গম্বুজের মাঝেরটা ছিল উঁচু। সেটাই মোগল মসজিদের রীতি। পাঁচ গম্বুজের প্রসারণ করায় ছোট গম্বুজটা পড়ল মাঝে। কম্পোজিশনে এ রকম বেখাপ্পা কাজ কেউ বুঝে করে? তা-ও শুনেছি এ কাজ হয়েছে কোনো নামকরা স্থপতি বা প্রকৌশলীর হাতে। সংস্কারের নামে এমন বেমানান বিকৃতি দেখলেই আন্দাজ করা যায় যে তিন গম্বুজের বিশেষত্ব বা মোগল স্থাপত্য সম্পর্কে জ্ঞানের কতটা অভাব ছিল।

বিনত বিবির মসজিদ, ঢাকার সবচেয়ে আদি মসজিদ। ছোট হলেও কী নিখুঁত ও পরিপাটি দালানটির গঠন। সেটাও সম্প্রসারণের নামে একেবারে পরাস্ত। বিনত বিবির মসজিদ হোক বা তারা মসজিদ হোক, আমরা কেন যেন সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নের নামে কুৎসিত সব নমুনা তৈরি করছি। ১০০ বছর আগেও আমাদের পূর্বপুরুষদের যে স্থাপত্য বিচক্ষণতা ও সূক্ষ্মতা ছিল, সেগুলো হারিয়ে এখন একটা আজব রূপ ধারণ করেছে।

আমি মনে করি, ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে যেসব প্রাচীন স্থাপনা ও পুরাকীর্তির নমুনা আছে, সেগুলোর সম্প্রসারণ বা আশপাশে জায়গার উন্নয়নের ব্যাপারে কড়া আইন হওয়া উচিত। তা না হলে বিনত বিবির মসজিদ বা তারা মসজিদের মতো ঘটনা চলতে থাকবে আর আমরা যে নিজেদের কীর্তিমান জাতি হিসেবে দাবি করি, সেটা নিম্নমানের কীর্তিকলাপে পরিণত হবে।

আধুনিক সময়ের বাড়িঘর নিয়ে তো আরও হতাশা। আজিমপুর হাউজিং এস্টেটের বাড়িগুলো সাদামাটা হলেও খোলা জায়গা নিয়ে হাউজিংয়ের একটা নতুন নমুনা ছিল। কয়েকটা বাড়ি তো স্থাপত্যাচার্য মাযহারুল ইসলাম ডিজাইন করেছিলেন। তাঁর পঞ্চাশ দশকে ডিজাইন করা বাড়িতে দারুণ কতগুলো অভিনবত্ব ছিল। আমি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে দেখেছি, ১৯২০ সালে তৈরি করা আধুনিকতার নমুনাস্বরূপ হাউজিংগুলো ঠিকই সংরক্ষিত এবং সুন্দরভাবে ব্যবহৃত।

কিন্তু ঢাকাতে সেই ঢাকাইয়া রীতি—পুরোনো নিদর্শন নির্দ্বিধায় ভেঙে নতুন বহর। আজিমপুরেও তা-ই। নতুন উঁচু বাড়ি তৈরি করতে হবে, আরও মানুষের থাকার জায়গা করতে হবে—এই বলে প্রায় রাতারাতি আগের বাড়িগুলো ভেঙে কয়েকটা নতুন ২০ তলা দালান উঠল। পুরোনোর জায়গায় যদি অভিনব কিছু আসে, তা মানা যায়। আজিমপুরের নতুন বাড়িগুলো শুধু নিছক বহুতল ভবনমাত্র, স্থাপতিক চরিত্রে বহু মাত্রায় নিচের দিকে। উঁচু দালানগুলো শুধু বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। এক দালানের সঙ্গে আর এক দালানের যে গুণগত সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন, তার কোনো চিহ্ন নেই। পুরোনো বাড়িগুলোসহ নতুন বহুতল বাড়ির মিশ্রণে দারুণ একটা পরিবেশ হতে পারত।

আমি স্থপতি, আমি জানি আজিমপুরের ওপর রোলারকোস্টার চালিয়েছেন আমাদেরই কোনো সহসতীর্থ স্থপতি বা প্রকৌশলী। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো বলবেন, কী আর করব, আদেশ ছিল। হতে পারে আদেশ, তবে উঁচু বাড়িসহ কী কী ধরনের বিকল্প প্ল্যান হতে পারে, সেই নমুনা দেখার দায়িত্ব তাঁদের। পুরোনো বাড়ি দুম করে ভেঙে একটা নতুন দালান করা সহজতর কাজ। পুরোনোটা রেখে নতুন সংযোগ করার জন্য প্রয়োজন বিশেষ স্থাপতিক ধীশক্তি।

বিজ্ঞাপন
লন্ডন ঢাকার থেকে পুরোনো শহর। সেখানে কিন্তু নতুনের দাবিতে দমাদম পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে সুউচ্চ সদন তৈরি হচ্ছে না। জনসংখ্যা ও প্রয়োজন বৃদ্ধির নামে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে ফেলার কর্মকাণ্ড চলছে না।

ভাঙাগড়ার এতগুলো কথা বললাম, কারণ সম্প্রতি খবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবন ও কমলাপুর রেলস্টেশন ভেঙে ফেলার যে তোড়জোড় চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতে। বিশেষ করে টিএসসি ভাঙার প্রস্তাবের খবর শোনার পর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং সামাজিক মাধ্যমে বহুজনই তাঁদের উষ্মা প্রকাশ করেছেন। স্বাভাবিক। টিএসসি শুধু ষাটের দশকের আধুনিক স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট নমুনাই নয়, প্রসিদ্ধ গ্রিক স্থপতি কন্সট্যান্টিন ডক্সিয়াডিসের ডিজাইন করা টিএসসি সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত বহু ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, পরিদর্শকের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। মনে পড়ে গত বছর গিয়েছিলাম আবার দেখতে, বরাবরের মতোই চমৎকৃত হয়েছি। এত দিন পরও প্রধান বাড়িগুলো ও গোছানো খোলা জায়গা নিয়ে একটি পরিপাটি কম্পোজিশন ও ট্রপিক্যাল স্থাপত্যে আধুনিকতার অনুকরণীয় উদাহরণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বাড়ি, নতুন জায়গার প্রয়োজন হতেই পারে, তবে তা হতে পারে বহুভাবে। সে প্রয়োজন মেটানোর জন্য প্রথমেই আইকন ভাঙার কথা ভাবা উচিত না। যত্নসহকারে পরিকল্পনা করে ওই এলাকাতেই বিদ্যমান ভবনগুলো রেখে নতুনের জায়গা ঠিকই করা যায়। এর জন্য দরকার সংবেদনশীল ও সৃজনশীল স্থাপতিক দক্ষতা। আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নয়।

কমলাপুর রেলস্টেশনের বেলাতেও একই ব্যাপার, যেকোনো শহরে প্রধান স্টেশনটি হয়ে দাঁড়ায় এর যাত্রামন্দির। যেমনটি হয়েছে ষাটের দশকে নির্মিত আমেরিকান স্থপতি রবার্ট বাউগির ডিজাইন করা কমলাপুর রেলস্টেশন। কমলাপুরের সঙ্গে টিএসসির একটা ডিজাইন সাদৃশ্য রয়েছে। পঞ্চাশ-ষাট দশকের আঞ্চলিক আধুনিক স্থাপত্যধারায় একটা মেগাছাদের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যবহারের জায়গাগুলো স্থান পেয়েছে। দুটো বাড়িতেই শিক্ষণীয় অনেক ধরনের উদ্ভাবন আছে। আধুনিক হলেও বাড়িগুলো এখন ঐতিহ্য। সযত্নে ধরে রাখা দরকার।

এমআরটি লাইন যে কমলাপুর স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হবে, এটা তো সাধুবাদ পাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত। তার মানে এই নয় যে এলাইনমেন্টের নাম করে বিদেশি পরামর্শকদের কথাতেই জলজ্যান্ত নিদর্শনকে বিলুপ্ত বা বিকৃত করতে হবে। টোকিও রেলস্টেশন টোকিও শহরের আইকন। এখনো কত ট্রেনলাইন গেছে স্টেশনটার পাশ দিয়ে, নিচ দিয়ে। স্টেশন তো ভাঙা হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা এক বছরে একই আদলে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত অনেক সম্প্রসারণ ঘটেছে। এর ভেতর উঁচু বাড়িও আছে। তবে আদি স্টেশনটা তার সম্মানিত স্থানে ঠিকই আছে। বরং স্টেশনের ১০০ বছর পুরোনো মারুনোচি অংশটি ২০১২ সালে সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়।

এসবই ঘটেছে দুটো কারণে—প্রথমত, পুরোনো ও নতুনের সংমিশ্রণে যে আরও সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করা যায়, সেই ধারণা থেকে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ ও সংবেদনশীল স্থপতি ও আরবান ডিজাইনারদের অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা থেকে।

মূল কথা হলো সেই পুরোনো সংঘাত—পুরোনো আর নতুন, প্রাচীন আর নবীন—এগিয়ে যাব কীভাবে? এই বিরোধটা এখনো আমরা শহর সাজানো, নির্মাণ ধারা ও স্থাপত্য রচনায় বশে আনতে পারিনি। পুরোনোটাকে আমরা বর্জন করতে কুণ্ঠা বোধ করি না। লন্ডন ঢাকার থেকে পুরোনো শহর। সেখানে কিন্তু নতুনের দাবিতে দমাদম পুরোনো বাড়িঘর ভেঙে সুউচ্চ সদন তৈরি হচ্ছে না। জনসংখ্যা ও প্রয়োজন বৃদ্ধির নামে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলো গুঁড়িয়ে ফেলার কর্মকাণ্ড চলছে না।

আসল কথা মেনে নিতেই হয়। এসব শহর ভালো করে রপ্ত করেছে, যা এখনো আমাদের হয়নি—পুরোনোটাকেই নতুন করা, পুরোনোর সঙ্গে নতুন মিলে শহর সাজানো। শহর শুধু আশ্রয় ও আয়ের জায়গা নয়; শহরই স্মৃতির মিনার। শহরের বিশেষ বিশেষ স্থাপনা, খোলা জায়গাসহ বাড়ি, গাছপালায় ঘেরা জায়গা আমাদের সামষ্টিক স্মৃতি আগলে রাখে। একেকটা বাড়ি ভাঙছি, আরেকটা স্মৃতির মিনার ধসে পড়ছে। এর পরিণতি মাপার কোনো বিশেষ যন্ত্র নেই, বিশেষজ্ঞও নেই। স্মৃতিহীন শহর মানে চিত্তবিহীন সমাজ, ঠিকানাবিহীন গতি।

হাউজম্যানের কর্মকাণ্ডে প্যারিস যখন চরমভাবে বদলে যাচ্ছে, তখন কবি বোদলেয়ার লিখেছিলেন, ‘প্যারিস বদলাচ্ছে, কিন্তু আমার দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে কিছুই নাড়া দিচ্ছে না—নতুন বাড়িঘর, সেখানে পুরোনো পাড়াগুলো শুধু এলেগরি। স্মৃতিগুলো পাথরের থেকেও ভারী।’

কাজী খালিদ আশরাফ লেখক স্থপতি, নগরবিদ ও স্থাপতিক ইতিহাসবিদ।

মন্তব্য করুন