শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বারতা

পরাজয় আসন্ন জেনে দেশের মেধাবী সৃজনশীল মানুষদের বেছে বেছে যে হত্যা করা হলো, তা দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন। তবে বাছাই করে তালিকা করতে এবং ধরে আনতে হলে মানুষগুলোকে তাঁদের আস্তানাসহ চেনার প্রয়োজন হয়। সে কাজ করেছে মূলত আলবদর বাহিনী। তত দিনে হানাদারদের কাছে প্রশিক্ষণ পেয়ে এবং পাকিস্তান রক্ষায় তাদের সঙ্গে কাজ করে এরা ঠান্ডা মাথায় পরিচিতজনদেরও খুন করার প্রবৃত্তিতে শাণ দিতে পেরেছে। অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবীর লাশ পাওয়া যায়নি, গুম করার এমন গোপন স্থানও বহিরাগত খুনিদের জানার কথা নয়।

আলবদরের মতোই আরও দুটি বাহিনী অস্ত্র হাতে দখলদার পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিতে গোয়েন্দার কাজ করেছে, সুযোগ পেলে ধরে হত্যা করেছে, কখনো হানাদারদের পক্ষে যুদ্ধেও লিপ্ত হয়েছে। এদের পেছনে সমর্থন জুগিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী ও শান্তি কমিটির লোকজন। তারা নির্বিচার মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘুদের হত্যা, তাঁদের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ লুণ্ঠন এবং সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সদস্য সমর্থকদের ধরিয়ে দেওয়ার কাজ করে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সন্দেহেও অনেককে ধরেছে, হত্যা করেছে, বাড়িঘর লুটপাট করেছে। এমনকি বাঙালি নারীদের পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে তুলে দিতে তাদের বিবেক কাঁপেনি।

মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা স্বাধীনতার পরও থামেনি, মাঝেমধ্যেই বিচ্ছিন্নভাবে এ রকম অধ্যাপক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক এদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে আবার আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গিবাদের প্রেরণায় খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে। ভিন্নধর্মাবলম্বী ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের বিরুদ্ধে জিহাদের স্পৃহা থেকে কেউ কেউ জঙ্গিবাদে যুক্ত হয়েছে। তারা সবাই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা না করলেও তাদের পক্ষে সামাজিক-রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে দেশের অনেক মাদ্রাসাশিক্ষক ও সে পরিবেশে লালিত মানুষ। বর্তমান সরকার তাদের প্রকাশ্য তৎপরতা বন্ধ করে আনলেও তারা যে গোপনে সক্রিয় আছে তার প্রমাণ মাঝেমধ্যেই পাওয়া যায়। নির্মীয়মাণ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙাও এমন একটি আলামত। ফলে দেশে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও মুক্তচিন্তার মানুষেরা যে এখন নিরাপদ, এমন কথা বলা যাবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাষ্ট্র কায়েম করার কথা ছিল, তার শত্রু তখনো যেমন ছিল, আজও তেমনি রয়েছে। তারা যে সংখ্যায় নগণ্য এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তাদের ভোট পাওয়ার জন্য গত কয়েক দশকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ অনেক পিছু হটেছে, আপস করেছে, কিন্তু তাদের ভোট আদায় নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক দোসর বিএনপি। তাই সংগঠন ও কর্মীবিহীন নেতাসর্বস্ব এই দলের ভোট প্রায় আওয়ামী লীগের কাছাকাছিই। তাদের হাতেই লালিত হয়েছে জামায়াত এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল, যারা বাংলাদেশের সংবিধান, এর মূলনীতি, জাতীয় সংগীত, জাতীয় নেতৃত্ব অন্তর থেকে কখনো মানেনি। ফলে অনেকেই যে বলেন, ১৯৭১ সালে বিজয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের দখল থেকে দেশ মুক্ত করা সম্ভব হলেও মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের স্বপ্নপূরণ আরদ্ধ রয়েছে—এ কথার সারবত্তা পাওয়া যায়।

বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করতে এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হবে দেশ ও সংস্কৃতিবিরোধী চেতনায় কেউ হিংসাবিদ্বেষের বশবর্তী হওয়ার মতো শিক্ষা যেন না পায়। একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের জীবনের বিনিময়ে এই বারতাই দিয়ে গেছেন যেন সেই আদর্শ ও চেতনার জন্য আর কাউকে প্রাণ দিতে না হয়

আমরা একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখব, যুগের পরিবর্তন ও অবদানকে এরা বুঝতে পারে না। এই মহল থেকে বিভিন্ন সময় বিজ্ঞানের অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ফতোয়া দিয়ে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। ফটোগ্রাফির বিরুদ্ধে এমন ফতোয়ার কারণে পঞ্চাশ-ষাটের দশকেও অনেকে ছবি তুলত না, তুলতে বাধা দিত। আজ পবিত্র হজ পালনেও ফটোর প্রয়োজন হয়। এ দেশে মুদ্রণযন্ত্র এলে হিন্দু-মুসলিম মৌলবাদীরা এর বিরুদ্ধতা করেছিল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। মানুষের মহাশূন্য অভিযান ও চন্দ্রাবতরণকে তারা মিথ্যা বলে প্রচার করেছিল; যদিও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং এর সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ যে গণিতশাস্ত্র, তার চর্চায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের অসামান্য অবদানের ইতিহাস একটু পড়াশোনা করলেই জানা যায়।

এ রকম বিজ্ঞানবিমুখ মনোভাবের কারণে আজ জীবনের পদে পদে মুসলিম সমাজকে অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের নানান আবিষ্কারের ওপর নির্ভরশীল থেকে অনেক পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। নানাভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের শোষণ-বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। আজকের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষভাবে উচ্চতর জ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের যে অপার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মুসলিম সমাজের অবস্থান যেন অবধারিতভাবে অধমর্ণের। এর পেছনে বহুকালের চিন্তার জড়তা ও সীমাবদ্ধতা দায়ী। আলেম-ওলেমারা এই পিছিয়ে পড়ার কারণগুলো অনুসন্ধান করলে মুসলিম সমাজের উপকার হতে পারে।

বহুকাল ধরে ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের ইসলামের মর্মবাণী বিশ্লেষণের চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও উত্তেজনা ছড়াতে বেশি আগ্রহী দেখা যায়। তাঁদের সমালোচনায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ রসিকতায় আক্রান্ত হয় ভিন্নধর্মী মানুষ ও তার প্রভাবিত আধুনিক জীবনযাত্রা, নারীশিক্ষা ও নারীর অধিকার এবং গণতন্ত্র ও বিভিন্ন আধুনিক দর্শন। যদি যুগোপযোগী জ্ঞানের সঙ্গে বিরোধ জিইয়ে রাখা হয় তাহলে জ্ঞানচর্চায় পিছিয়ে পড়তে হয়। এই সংকট আমাদের মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও যে নেই, তা নয়।

পরস্পর সহযোগিতা বা আদান–প্রদানের মাধ্যমেই আমরা আজ জীবনধারণ করি। তাই বিভেদের পথে যাওয়ার সুযোগ নেই, আমাদের চলতে হবে ধর্মের মূল শিক্ষা—বিশ্বাস, নৈতিকতা ও দর্শন এবং জ্ঞানচর্চার পথেই শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্বেষণে। এই মৌলিক শিক্ষা সব ধর্মেই রয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কারের জন্য অনেকগুলো কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সেসব কমিশনের সদস্য হিসেবে সেকালের অগ্রণী মুসলিম চিন্তাবিদেরা, যেমন সৈয়দ আমির আলী, ড. মাহমুদ হাসান প্রমুখ এতে যুগোপযোগী পরিবর্তন এনে বিজ্ঞানসহ আধুনিক সেক্যুলার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালের মওলা বক্স কমিশনের অন্যতম সদস্য মাওলানা মোজাম্মেল হক আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ২১ বছর ধরে মাদ্রাসাশিক্ষা সংস্কারের অবিরাম চেষ্টা সত্ত্বেও ফলপ্রসূ কিছুই করা যায়নি।

তারপর আরও ৯০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। বিশ্বে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চলছে। বিশ্বায়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বহুত্ব আজ সবার জীবনেরই বাস্তবতা। একজন মাওলানাকেও ছবি তুলতে হয়, ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র ও পশ্চিমে আবিষ্কৃত চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সেবা নিতে হয়, তাদের তৈরি বিমানে চড়ে হজে যেতে হয়। নিত্যব্যবহার্য কাপড় থেকে সামান্য সুচ, ফ্রিজ, টিভি থেকে রেলগাড়ি, পাওয়ার টিলার থেকে কীটনাশক প্রভৃতির আবিষ্কারক, প্রস্তুতকারক, পরিবহনকর্মী, বিক্রেতা হিসেবে কোন জাতের কোন ধর্মের মানুষ কাজ করেছে, তা জানার উপায় নেই। শুধু বুঝি পরস্পর সহযোগিতা বা আদান–প্রদানের মাধ্যমেই আমরা আজ জীবনধারণ করি। তাই বিভেদের পথে যাওয়ার সুযোগ নেই, আমাদের চলতে হবে ধর্মের মূল শিক্ষা—বিশ্বাস, নৈতিকতা ও দর্শন এবং জ্ঞানচর্চার পথেই শান্তি ও সমৃদ্ধির অন্বেষণে। এই মৌলিক শিক্ষা সব ধর্মেই রয়েছে।

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসের পাতা ওলটালে উমাইয়া, আব্বাসীয় খলিফা এবং স্পেনের মুসলিম শাসকদের আমলে স্থাপত্য শিল্পচর্চা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানসহ দর্শনের বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব অর্জনের কথা জানা যেত। পারস্য, অটোমান তুরস্ক ও মোগল ভারতেও শান্তি ও সহাবস্থানের কালে সমৃদ্ধির ইতিহাস জানা যায়। এসব জানা থাকলে অকারণ হীনম্মন্যতা দূর হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে তাদের কথাবার্তা শুনে বোঝা যায় এসব সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার সম্পর্কে তারা উদাসীন। এমনকি ইসলামের আদিপর্বে যে ঔদার্য ও মানবতার সাক্ষ্য মেলে, তার প্রতিও শ্রদ্ধার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ধর্মীয় শিক্ষা আর সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের স্বাক্ষরবাহী যাপিত জীবনের মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে সমাজে মূল্যবোধের সংকট বাড়বে, মানুষের কথা ও কাজে মিল থাকবে না। কপটতা ও অনাচার বাড়বে এবং যুক্তির পথ ছেড়ে জবরদস্তির পথে চলতে গিয়ে সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়তে থাকবে। সমাজে ধর্মীয় চেতনারও দুটি মূল ধারা চলমান দেখা যাচ্ছে—কট্টরপন্থী ও উদারপন্থী। উদারপন্থীরা আক্রমণাত্মক ভূমিকা না নিলেও কট্টরপন্থীদের দিক থেকে সেই ভয় থেকেই যায়, যদিও তাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনও বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের অবদান ছাড়া চলে না।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ কাটে না। আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এমন এক সমাজ গড়ে তোলাই কাম্য, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে, সেই সঙ্গে যেন নারী ও শিশুরা নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করতে এবং তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে খেয়াল রাখতে হবে দেশ ও সংস্কৃতিবিরোধী চেতনায় কেউ হিংসাবিদ্বেষের বশবর্তী হওয়ার মতো শিক্ষা যেন না পায়। একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের জীবনের বিনিময়ে এই বারতাই দিয়ে গেছেন যেন সেই আদর্শ ও চেতনার জন্য আর কাউকে প্রাণ দিতে না হয়।

আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক