বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পরবর্তীকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ক্রমাগত জোর করে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে থাকে। সেসব বাড়িঘরে ইহুদি পরিবারগুলোকে বসানো যায়। এ উচ্ছেদ অভিযান ইসরায়েলি বাহিনীর সহযোগিতায় চলে। এটা ছিল আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জেনেভা কনভেনশন তৈরি হয়েছিল, এ ধরনের জাতিগত নিধন অভিযান বন্ধের উদ্দেশ্য থেকে।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহর একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র মসজিদ আল-আকসার সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, আল-আকসায় শুধু মুসলমানরাই প্রার্থনা করতে পারবে, তবে অন্য ধর্মের মানুষেরা সেখানে যেতে পারবেন। কিন্তু এখন ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় সেই চুক্তির লঙ্ঘন নিয়মিতই চলছে এবং ইহুদি উগ্রপন্থীরা সেখানে প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছে। এটা উঁচু মাত্রার প্ররোচনামূলক কাজ, যেটা রাজনৈতিক সংঘাতকে ধর্মযুদ্ধের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

শেখ জারার উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে ইসরায়েল কংক্রিটের ৮ মিটার উঁচু দেয়াল নির্মাণ করেছে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সেখানকার লোকেরা যাতে যোগাযোগ করতে না পারে, সে জন্যই এ দেয়াল। ইসরায়েল সেখানে ইহুদিদের চলাচলের জন্য আলাদা সড়ক নির্মাণ করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মৌলিক প্রয়োজনগুলোও পূরণ তারা করছে না। বিশেষ করে দেয়ালের অপর পাশে ইসরায়েলনিয়ন্ত্রিত অংশে যারা বাস করে, তাদের কোনো অধিকার নেই বললেই চলে। জেরুজালেমে এমন কিছু এলাকা আছে (যেখানে প্রায় ১ লাখ ফিলিস্তিনি বাস করে), যেখানে ইসরায়েলের কোনো সেবা কিংবা নিরাপত্তা পৌঁছায় না। আবার ফিলিস্তিনি পুলিশেরও সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই। এ এলাকাগুলোয় সহিংসতা, মাদক ও অপরাধ ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

ইসরায়েলের বৈষম্যমূলক নীতি আন্তর্জাতিক আইনের শুধু লঙ্ঘনই নয়, তারা পাশবিক বলপ্রয়োগও করছে। এর ফলে জেরুজালেমে উত্তেজনা লেগেই থাকে। দখল করা এ ভূমি একটা সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারী গুন্ডারা নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করে। পক্ষান্তরে পাথর ছুড়ে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের আত্মরক্ষা করে।

ইসরায়েলের বৈষম্যমূলক নীতি আন্তর্জাতিক আইনের শুধু লঙ্ঘনই নয়, তারা পাশবিক বলপ্রয়োগও করছে। এর ফলে জেরুজালেমে উত্তেজনা লেগেই থাকে। দখল করা এ ভূমি একটা সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারী গুন্ডারা নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করে। পক্ষান্তরে পাথর ছুড়ে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের আত্মরক্ষা করে।

ফিলিস্তিনিদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও ভন্ডুল করে দেয় ইসরায়েল। এমনকি পুতুলনাচের মতো নিরীহ কর্মসূচিও তারা করতে দেয় না। এসব কর্মসূচির পেছনে রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনের আধা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা অর্থায়ন রয়েছে বলে মনে করে তারা। গত এপ্রিল মাসে ফিলিস্তিন নেতারা তাঁদের সাধারণ নির্বাচন বাতিল করতে বাধ্য হন। কেননা পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের পোস্টাল ভোট দিতে বাধা দেয় ইসরায়েল। এটা অসলো চুক্তির প্রতি ইসরায়েলের বুড়ো আঙুল প্রদর্শন।

জেরুজালেমের ক্রমাবনতিশীল অবস্থা এবং অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যকার নিত্যদিনের সংঘাতে ফিলিস্তিন সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে না। কারণ, দখলদারদের তুলনায় তাদের সামর্থ্য খুবই সীমিত। ভবিষ্যতের কোনো আশা ছাড়াই ফিলিস্তিনিরা তাদের মতো করে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে।

শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব পথই বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল সরকার। ১৯৬৭ সালে খার্তুমে আরব লিগের সম্মেলনে আরব বিশ্বের নেতারা ইসরায়েলকে নিন্দা জানিয়ে ‘তিনটি না’-এর (শান্তি নয়, আপস নয়, স্বীকৃতি নয়) ঘোষণা দিয়েছিল। ইসরায়েল ও তার মিত্ররা সেটার প্রতিক্রিয়া এখনো দেখিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট সেখানকার অতি উগ্রপন্থী ইহুদিদের প্রতিনিধি। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবেন না বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও তিনি কথা বলতে রাজি নন, দুই রাষ্ট্রের সমাধানের ব্যাপারে তাঁর কট্টর বিরোধিতাও অব্যাহত রেখেছেন।

জেরুজালেম সব সময়ের জন্য তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারীদের পবিত্র শহর। ভবিষ্যতেও এটা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের বসতভূমি থেকে যাবে। কিন্তু এ পবিত্র শহর বিশ্বে শান্তির বাতিঘরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছে না। এর বদলে সেটা সংঘাতের উৎসস্থল হয়ে রয়েছে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • দাউদ কাত্তাব মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রামাল্লাহতে অবস্থিত আল কুদস ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব মডার্ন মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন