শাসনব্যবস্থার সংস্কার দরকার

শেষ সপ্তাহে যা হলো তা চমকজাগানিয়া চলচ্চিত্রের চেয়ে কম কিছু নয়, যেটা আমাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু মানুষ সন্ত্রস্ত ছিল। কারণ, শেষ মুহূর্তে সবকিছু প্রত্যাশামতো না-ও ঘটতে পারে—এই সম্ভাবনা তো প্রবাদের পর্যায়ে চলে গেছে। পাকিস্তানকে কীভাবে স্বাভাবিক দেশ বলব, যেখানে প্রতিবার একজন মানুষের অবসর নিয়ে রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়ে যায়, যেটা রাষ্ট্রের ভিতকে পর্যন্ত নাড়িয়ে দেয়, যে লোকটি ২২ গ্রেডের চাকুরে হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যাঁর মেয়াদ নির্দিষ্ট করাই আছে। বিষয়টা হলো, বাস্তবতা ও আইনের মধ্যকার ফারাকটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এসবের মানে কিন্তু এই নয় যে এই হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে বেসামরিক প্রশাসনের দায় নেই। বাস্তব কারণে পাকিস্তান এক সেনানিবাসের কর্তৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্র। ফলে সেখানে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিতে হলে এ সমস্যায় দৃষ্টিপাত করতে হবে।

এ ছাড়া নতুন সেনা নেতৃত্ব যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেসব নিয়েও অনেক আলোচনা হচ্ছে। এখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর স্বার্থ কেবল সরকারি নীতি ও দৈনন্দিন শাসনব্যবস্থার মধ্যে সীমিত নেই। সম্ভবত, সেনাশাসকদের মধ্যে স্রেফ নেতৃত্বের স্টাইলজনিত পার্থক্য রয়েছে, মূলগত নয়, যেটা অপরিবর্তিত থাকে। এটা বোঝানোর জন্য পারভেজ মোশাররফ, আশফাক পারভেজ কায়ানি ও রাহিল শরিফের কথা বলা যায়। দেখা যাবে, এঁদের আমলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য ছোটখাটো পরিবর্তন ছাড়া সামরিক বাহিনী প্রণীত জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসেনি। তাঁরা তিনজনই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার পণ করেছিলেন। তাঁরা কেউই ‘মন্দ সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি, আবার ‘ভালো সন্ত্রাসীদের’ গায়ে টোকা দেননি। এমনকি জার্ব-ই-আজব অভিযানের পরও নীতিতে বড় পরিবর্তন আসেনি। তাঁরা তিনজনই এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করতেন যে সন্ত্রাসবাদ বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, তাঁরা সবাই ভারতকেন্দ্রিক কাজ করেছেন। সে কারণেই পাকিস্তান রাষ্ট্র এই তথাকথিত জিহাদি গোষ্ঠী ও নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনগুলোর কোমর ভেঙে দিতে পারেনি। তাঁদের সবার জমানায় দেখা গেছে, পাকিস্তান ক্রমাগত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আর রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা তাঁরা যেভাবেই এই নীতির যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করুন না কেন।

অনেক সমালোচক ও বিশ্লেষক জেনারেল কায়ানির সমালোচনা করেছেন, কারণ তিনি উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ও অবকাঠামোতে সামরিক অভিযান চালাতে পারেননি। সত্যের এর চেয়ে বড় অপলাপ আর হতে পারে না। সেখানে সামরিক অভিযান চালানো হবে কি হবে না, তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ক্ষমতাকাঠামোর, যার সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যূহের আফগান নীতির ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। সর্বোপরি, হাক্কানি নেটওয়ার্কের সদর দপ্তর ছিল মিরান শাহ ও মির আলী এলাকায়। সেখানে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন বাহিনীর উপস্থিতি কমার আগে হামলা চালানো হলে আফগান তালেবানরা কতল হতো। এই অভিযান তখনই চালানো গেছে, যখন আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো বাহিনীর বড় অংশকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন তালেবানসহ তাদের সব মিত্রকে আফগানিস্তানে ঢুকিয়ে নতুন ও নির্ধারক যুদ্ধ শুরু করার সময় ঘনিয়ে আসে। এভাবেই আফগানিস্তানে তালেবানদের যুদ্ধ তীব্র হয়েছে। ফলে কায়ানির সমালোচনা করার অর্থ হচ্ছে, রাহিল শরিফের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা। এটা আদৌ ন্যায্য ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা নয়। কথা হচ্ছে, এসব নীতির মূল এত গভীরে যে তা সহজে পরিবর্তিত হওয়ার নয়। যদিও সবাই এ ব্যাপারে একমত যে এই তিন প্রধানের কাজের স্টাইল একেবারেই ভিন্ন, কিন্তু আমরা কখনো কখনো স্টাইলকে নীতি হিসেবে ধরে নিই। সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ দপ্তর, আইএসপিআর বড় ধরনের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তারাও এসব ধারণা গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।

জেনারেলরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা নিতে পারেন না। এর কারণ হচ্ছে, ব্যাপারটা আগের মতো এত সহজ-সরল নয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্র ও সমাজ বিকশিত হয়েছে। ১৮তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৬ নম্বর ধারাকে শক্তিশালী করা হয়েছে। এখন আর সংবিধান স্থগিত করা সম্ভব নয়, জেনারেল জিয়া ও পারভেজ মোশাররফ যেটা করেছিলেন। সংশোধিত ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বিচার বিভাগ সংবিধানের রদকরণ বা বাতিল গ্রহণ করতে পারবেন না। একইভাবে, সংসদ আরও প্রত্যয়ী হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সংসদ মোশাররফের দ্বিতীয় অভ্যুত্থান (তথাকথিত জরুরি অবস্থা) অনুমোদন করেনি, বিচার বিভাগও সেই অভ্যুত্থান অনুসমর্থন করেননি। কিন্তু পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী ক্ষমতায় ভাগ বসাতে দারুণ সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করে নানা কারিগরি করেছে। পারভেজ মোশাররফের স্বীকারোক্তি অনুসারে, এক রাজনৈতিক নেতা ২০০২ সালের নির্বাচনে তাঁর কাছে ১০০ আসন দাবি করেছিলেন, যদিও তিনি তাঁকে মাত্র ১০টি আসন দিতে চেয়েছিলেন। নির্বাচনে কীভাবে জালিয়াতি হয়, এটা তারই দৃষ্টান্ত। বেশ বড় রকমের প্রমাণ।

পাকিস্তানের সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্রের নতুন সনদ নিয়ে হাজির হতে হবে। এটা শুরু হতে হবে রাজনৈতিক দল ও শাসনব্যবস্থা দিয়ে, যাতে রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্রটির রাশ টেনে ধরার জন্য যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করা যায়। কিন্তু বিরাজমান কাঠামো অক্ষত থাকলে পাকিস্তান যেমন আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে যাবে, তেমনি ভেতরে-ভেতরে ধসে পড়বে।

পাকিস্তানের দৈনিক দ্য নেশন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।

আফ্রাসিয়াব খট্টক: আঞ্চলিক রাজনীতি বিশ্লেষক।