শিক্ষকদের জন্য ভালোবাসা

বিজ্ঞাপন
default-image

স্কুল হলো আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি, শিক্ষকেরা হলেন আমাদের দ্বিতীয় মা-বাবা।

রংপুর জিলা স্কুলে একজন স্যার ছিলেন। আজহার স্যার। স্যারের জোড় হাতের চড় ছিল খুবই বিখ্যাত। দুই হাত দিয়ে একসঙ্গে ছাত্রের দুই গালে চড় বসিয়ে দিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রংপুর জিলা স্কুলে আমার ঘোরতর বন্ধু ছিল স্বপন। সে আর আমি পাশাপাশি বসতাম ফার্স্ট বেঞ্চে। একদিন ওর সঙ্গে কী নিয়ে দুষ্টুমি করছি, আজহার স্যার দেখতে পেয়ে দুই হাত আমার দুই গালে একসঙ্গে দ্রুতগতিতে চালিয়ে দিলেন। জোড়া চড়। বললেন, ‘চিরকাল মনে রাখবা, অতিরিক্ত কথা এবং কাজ বিপদ ডাকিয়া আনে।’

আপনার সেই উপদেশ আমি ভুলিনি, জনাব। আমি মেনে চলার চেষ্টা করি অতিরিক্ত কথা না বলতে, অতিরিক্ত কাজ না করতে। 

তবে শারীরিক শাস্তি মোটেও কাম্য নয়। কোনো অবস্থাতেই কোনো শিক্ষক ছাত্রের গায়ে হাত তুলতে পারেন না। এটা আমাদের আজকের শিক্ষা। 

রংপুর জিলা স্কুলে অনেক শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা আমার খুবই প্রিয়। একদিন শিশু একাডেমির জাতীয় পুরস্কার প্রতিযোগিতায় থানা পর্যায়ে তিনটিতে প্রথম হয়ে স্কুলে এসেছি। আবুল হোসেন স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কমপিটিশনের ফল কী?’ জানালাম। তখন সেভেনে কি এইটে পড়ি। আমাকে কোলে তুলে নিলেন। কোলে করেই নিয়ে গেলেন হেড স্যারের রুমে। ‘স্যার, আনিসুল তো তিনটায় ফার্স্ট হয়েছে।’ 

সিরাজুল ইসলাম স্যার এলেন। নতুন। তিনিও বাংলাই পড়াতেন। তিনি আমাদের বটগাছের নিচে একটা অপরূপ অনুষ্ঠান করেছিলেন। ১৯৭৭ সালের দিকে, রংপুরের একজন স্কুলশিক্ষক, এমন একটা অনুষ্ঠানের নকশা করেছিলেন, আমি আজও বিস্ময়ে অভিভূত বোধ করি। একটা ছেলের বুকে লেখা ‘লাপ’। এখন চারটা ছেলের বুকে লেখা, ‘আ’, ‘সং’, ‘প্র’, ‘বি’। ‘আ’ এসে ‘লাপ’-এর সামনে দাঁড়াল, হয়ে গেল ‘আলাপ’, তারা আলাপ করতে লাগল। ‘বি’ এসে ‘বিলাপ’ বানাল, তারা বিলাপ করতে লাগল। ‘সং’ এল, হলো ‘সংলাপ’। 

তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক ছিলেন আবদুল আলীম। বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন। একদিন দেয়ালপত্রিকায় আমি স্টেশন বানান মূর্ধন্য ষ দিয়ে লিখেছিলাম। তিনি বললেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেনশন অনুসারে ইংরেজি এস-এর বাংলা হবে দন্ত্য স। বিদেশি শব্দে ষ বসবে না। 

জিলা স্কুলে ফজলার স্যার, মোস্তাফিজ স্যার, কাইয়ুম স্যার, মোনায়েম স্যার, জয়েনউদ্দীন স্যার, সুবোধ স্যার, মোজাম্মেল স্যার, ওয়ালিউল স্যার—স্যারদের কথা কি আর বলে শেষ করা যাবে! 

কারমাইকেল কলেজেও স্যারদের পেয়েছিলাম, যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ যত্ন নিতেন আমাদের। ইসহাক স্যার, নূরননবী খান স্যার, রফিকুল হক স্যার, ইসা স্যার। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও স্যারদের বিশেষ রকমের ভালোবাসা পেয়েছি। ড. ইনামুল হক স্যারের ক্লাস পাইনি, কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের এলাকায় তিনিই ছিলেন আমাদের প্রধান প্রেরণা। সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়েছি জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার আর আইনুন নিশাত স্যারের কাছ থেকে। এখনো পাই। আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং না করে সংবাদপত্রে যোগ দিই, তখন জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার আমাকে ফোন করে উৎসাহ দিতেন, বলতেন, ‘থাকো, আমাদের একজন ইঞ্জিনিয়ার সাহিত্য-সাংবাদিকতায় থাকুক, আমাদের দরকার আছে।’ বইমেলায় গিয়ে স্যার আমার বই কিনেছেন। আইনুন নিশাত স্যার দেখা হলেই আমার আগের সপ্তাহের লেখায় কী আছে, তা নিয়ে একটা বিবরণ দেন। বলেন, ‘পড়েছি, বুঝেছ তো!’ 

জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার একদিন বাসায় এসে হাজির। মেয়ের বিয়ের কার্ড দিতে নিজে এসেছেন। মনে হয়, সেই দিনই লিফট বন্ধ ছিল, সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠলেন। 

সর্বশেষ জামিল স্যার ফোন করলেন, ‘আনিস, তুমি সাক্ষাৎকারে বলেছ, নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেলে তুমি ইংরেজি শিখবে। শোনো, ইংরেজি শেখার জন্য নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে কেন? এখনই শুরু করো।’ 

যাঁরা আমার সরাসরি শিক্ষক নন, তাঁদের কাছেও তো কত শিখি। সৈয়দ শামসুল হক ১৯৮৪ সালে রংপুর গিয়ে আমাকে বলেছিলেন, ‘নতুন লেখকদের উদ্দেশে আমার তিনটা উপদেশ আছে—পড়ো, পড়ো এবং পড়ো।’ 

আমি তাঁর উপদেশ মনে করার চেষ্টা করি। আমি তখন বুয়েটে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরুর জন্য অপেক্ষা করছি। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ আছে।’ সৈয়দ শামসুল হক বললেন, ‘অশ্লীলতার প্রশ্নটি সামাজিক প্রশ্ন। সাহিত্যিক প্রশ্ন নয়।’ আমি মেনে নিলাম। পরে বন্ধুরা বলল, ‘কেন মেনে নিলে? বলতে, সাহিত্য কি সামাজিকতার বাইরের কিছু?’ 

হায়, এই প্রশ্নের আজও সমাধান হলো না। সাহিত্য, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী একটা পোয়েটিক লাইসেন্স চায়, তাদের দরকার অনন্ত স্বাধীনতা। সামাজিকেরা বলবেন, কী লেখা উচিত, কী নয়। কিন্তু সেটা মাথায় করে বসে থাকলে কোনো লেখকই লিখতে পারবেন না। আমাদের দেশে লেখকের স্বাধীনতার বলয় ছোট হয়ে আসছে, শ্বাসরোধী একটা অবস্থা! 

তেমনিভাবে শিক্ষক না হয়েও যাঁর কাছে বিপদে এবং সম্পদে যাই, তিনি হলেন আনিসুজ্জামান। কত সিনিয়র একজন মানুষ, ফোন করলে ফোন ধরেন। তিনি কী অবস্থায় আছেন, খাচ্ছেন, ঘুমোচ্ছেন, নাকি অনুষ্ঠানের মঞ্চে, বিচার না করেই বলি, ‘স্যার, যারা ভোর এনেছিল নামের একটা উপন্যাস লিখব। বঙ্গবন্ধু, মাওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন, এঁরা হবেন চরিত্র, ভয়ে লিখব নাকি নির্ভয়ে লিখব?’ স্যারের স্পষ্ট উত্তর, নির্ভয়ে লিখবে। 

কত স্যারদের কথাই তো বলা যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে কবির স্যারের ঘরে গিয়ে দেখেছিলাম সঞ্চয়িতা ও সঞ্চিতা, যিনি আমাকে পড়ে শোনাতেন ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’। একদিন বগুড়ার সোনাতলা পিটিআইতে কবির স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলেন ‘খুকী’। আমি বই দেখে বললাম, স্যার, খুকি বানান হ্রস্ব ই–কার হবে। পরে দেখি, পুরো স্কুলে হইহই রব, স্যার সবাইকে বলে বেড়িয়েছেন, আনিস আমার বানান ঠিক করে দিয়েছে। নিজের ভুল রাষ্ট্র করে বেড়িয়ে যিনি ছাত্রের গৌরব প্রচার করেন, তিনিই তো শিক্ষক। 

কথায় বলে, একজন শিক্ষক কেবল নিজের ছাত্রের কাছেই পরাজিত হলে গৌরব বোধ করেন। ক্লাস টুয়ে আমি আমার কবির স্যারের কাছে সেই শিক্ষা পেয়েছিলাম। 

এবার আরেক শিক্ষকের কথা বলব। তিনি বুয়েটে পড়াতেন। কিন্তু আমার সরাসরি শিক্ষক নন। আমি তাঁকে স্যার বলেই ডাকি। গোলাম কবির। আমেরিকার নিউ জার্সিতে থাকেন। স্যারকে বললাম, স্যার, নিউইয়র্কে আছি। নিউ জার্সিতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যান। প্রথিতযশা বিজ্ঞানী এম জাহিদ হাসানের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিন। স্যার বললেন, আচ্ছা অমুক দিন। সেদিন স্যার দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এলেন। আমি তঁার গাড়িতে উঠলাম। প্রিন্সটনে জাহিদ হাসানের সঙ্গে দেখা করলাম। পৃথিবী, মহাকাশ, সাহিত্য–দর্শন নানা বিষয়ে এই গবেষকের কথা শুনলাম। টনি মরিসন (নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন লেখক, সম্প্রতি প্রয়াত) কোথায় বসেন, আইনস্টাইন কোন ল্যাবে কাজ করতেন, দূর থেকে দেখলাম।

সন্ধ্যায় গোলাম কবির স্যার তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অতিথিও এসেছেন কয়েকজন। স্যার বললেন, আনিস, সারা দিন তোমাকে কথাটা বলা হয়নি। কাল বেশ রাতে, মানে আজ ভোরে ঢাকা থেকে খবর এসেছে, আমার মা মারা গেছেন। তোমাকে দেওয়া কথা আমি রক্ষা করতে চেয়েছি। আর সারা দিনে তোমার মনটা আমি খারাপ করে দিতে চাইনি।

মা হারানোর বেদনা আমি বুঝি। গত বছর নভেম্বরে আমি মা হারিয়েছি। আবার গোলাম কবির স্যারের বাস্তবতাও আমি বুঝি।

কোনো কোনো সময় উপস্থিত ছাত্র একজন শিক্ষকের জন্য অনেক বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। স্যার, আপনাকে কী বলে ভালোবাসা জানাব, জানি না। স্যার, আপনার মাধ্যমে আমি সব শিক্ষককেই ভালোবাসা জানাই।

প্রথম আলো আমাদের শিক্ষকদের সম্মান জানানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছে। আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা। ইন্টারনেটে https://www.prothomalo.com/priyoshikkhok ওয়েবসাইটে শিক্ষক নির্বাচনের মনোনয়ন দেওয়া যাবে। 

আমি তো আমার সব শিক্ষককেই মনোনয়ন দিতে চাই। কর্তৃপক্ষ কি তা মেনে নেবে?

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন