শিক্ষকদের নৈতিকতার এপাশ-ওপাশ

বিজ্ঞাপন

১৩ মার্চ হয়েছে ডাকসু নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে এখনো কমবেশি আলোচনা আছে বাংলাদেশে। কারণ, এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা হলেও বাংলাদেশে নির্বাচনী সংস্কৃতির সাম্প্রতিক ঝোঁক ডাকসু নিয়ে মানুষের উচ্ছ্বাসকে খুব বেশি এগোতে দেয়নি। তবে ডাকসু নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি বেশ কিছুটা নাজুক হয়ে পড়েছে। এই নাজুকতা সম্পর্কের এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী। অন্যান্য নির্বাচনের মতো ডাকসু হলেও এই নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে কিছুটা আস্থার জায়গা ছিল। কারণ, এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নির্বাচনের প্রার্থী, ভোটার এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী সবাই একই আঙিনার বাসিন্দা। তাই যখন এই নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বেশ কিছু অনিয়ম হাতেনাতে প্রমাণিত হয় এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়, তখন তা শুধু ডাকসু নির্বাচন নয়, স্বয়ং শিক্ষকদের নৈতিক অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। এই প্রশ্ন ওঠা শুধু যে ডাকসুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে তা নয়, শিক্ষার্থীদের মনে এগুলো স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়, তাঁরা শিক্ষকের মধ্যে খুঁজে পান রাজনৈতিক দলের কর্মীকে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা সেই নীতিহীন শিক্ষক–শিক্ষিকাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে সেটি নিয়ে বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ, আমরা শিক্ষকেরাই এর জন্য দায়ী। কারণ, আমরা শিক্ষকতাকে স্রেফ একটি পেশায় নিয়ে গেছি, রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাটাতন হিসেবে দেখছি, শুধু দেখছি না যে এটি দায়িত্ব এবং দায়ের ভার।

ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যে কটি ঘটনা আমাকে বিচলিত করেছে, তার একটি হলো শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার জায়গাটি। তাঁরা বারবার শিক্ষকদের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমরা শিক্ষকদের বিশ্বাস করি না।’ যদিও ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্কের অবনতির মহড়া বেশ আগে থেকেই চলছিল। নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ শুরুর আগেই কুয়েত মৈত্রী হলের সিল মারা ব্যালট পেপার পাওয়ার পর মেয়েদের হলগুলোয় শিক্ষার্থীরা সব ব্যালট বাক্স পরীক্ষা করেছেন। শিক্ষার্থীরা বারবার বলছেন, ‘আমরা সারা রাত ব্যালট বাক্স পাহারা দিয়েছি।’ কেন শিক্ষার্থীদের সারা রাত জেগে বাক্স পাহারা দিতে হলো? এমন তো হওয়ার কথা নয়। ব্যালট বাক্স ও ব্যালট পেপারের দায়িত্বে ছিলেন তাঁদেরই শিক্ষকেরা। এটি তাঁদের করতে হয়েছে, কারণ তাঁরা শিক্ষকদের বিশ্বাস করেন না এবং বিশ্বাস না করার ঘটনা শিক্ষকেরা ঘটিয়েছেন।

শিক্ষকদের এই নৈতিক এপাশ-ওপাশ কী ধরনের স্থায়ী ক্ষতি করছে, তা বিবেচনায় আনা খুবই জরুরি। নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। উদাহরণ দিয়ে বলছে, ডাকসুর আগের নির্বাচনগুলোয় বেশি অনিয়ম হয়েছে। সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনাও ঘটেছে। সেই তুলনায় এই নির্বাচনের অনিয়মগুলো ‘নরমাল’। কিন্তু অন্যদিকে এবারের ডাকসু নির্বাচনের নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন নিয়ে অভিযোগগুলোর কোনোটাই অস্বীকার করেননি, বরং বলছেন, ‘আমি বিব্রত।’ এই মন্তব্যকারী ব্যক্তিরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই নরমাল আর বিব্রতবোধের যে ফারাক রয়েছে, তার মধ্য দিয়েই অনেকখানি নির্ধারিত হয়ে পড়েছে ছাত্র–শিক্ষক সম্পর্কের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জায়গা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির মনোযোগও এখন ভিন্নমুখী। হতাশার বিষয়, বিগত বছরগুলোয় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা কখনোই কোনো সংগঠনের ছিল না। ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন ব্যস্ত ছিল হলগুলোয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও চলে কার্যত রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ফলে, শিক্ষার্থীদের সমস্যা এবং শিক্ষার উন্নয়নের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক দলের ইচ্ছাপূরণেই তৎপর হতে দেখা যায় ছাত্রসংগঠনগুলোকে। গত ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন বন্ধ থাকার সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোই নিয়ন্ত্রণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখল, চাঁদাবাজি কিংবা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মতো কার্যক্রমে জড়িত হওয়ার অভিযোগও অসংখ্য। তাই গত বছরের দুটো বড় ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রসংগঠনগুলোর বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা কিছুটা হলেও গুরুত্ব পেয়েছে ভোটের ময়দানে। এই নির্বাচন আমাদের স্পষ্টই জানিয়ে দিল যে ক্ষমতাচর্চিত এবং ক্যাডারনির্ভর ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো দলই আর সেভাবে মাথা তুলে একচ্ছত্রভাবে দাঁড়াতে পারবে না। মনে করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনোভাব এবং চাহিদা হয়তো ছাত্ররাজনীতিতে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি।

এর পাশাপাশি শিক্ষকরাজনীতির কথা বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে যে সেখানেও শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা গবেষণা নিয়ে তাঁরাও ততটা মাথা ঘামাননি, যতটা শ্রম দিয়েছেন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন পদ ও পদবি হাঁকানোয়। শিক্ষার্থীরা একজন শিক্ষককে শিক্ষক হিসেবেই দেখতে চান প্রথম। কিন্তু কখনোই একজন শিক্ষককে তাঁরা দলীয় ক্যাডার হিসেবে দেখতে চান না। আর যখন অবস্থা এ রকমই হয়ে ওঠে, তখনই গোটা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ১০ বছর আগেও শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা ছিল, এখন আর নেই। এখন এমনটাই হয়ে গেছে যে সরকারি দল–সমর্থিত শিক্ষক প্যানেলই জয়লাভ করে, আর বিরোধী দলের প্যানেল নিয়ম রক্ষার জন্যই অংশগ্রহণ করে। সবাই জানে, এখন যিনিই সরকার–সমর্থিত, অর্থাৎ নীল দলের নমিনেশন পাবেন, তিনিই পদবাহী হবেন। সবাই এখন সহজে নেতা হয়ে যান। আর তাই প্রার্থী নির্বাচন সভায়ও শিক্ষকদের মধ্যে হাতাহাতির শব্দ আর ফিসফিসানি পর্যায়ে নেই, সেটি মিডিয়াতেও কয়েক দফা হাজির হয়েছে।

অনেক শিক্ষার্থীই আমাদের অনেককে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের সঙ্গে আমাদের এই বিশ্বাসের সম্পর্ক এক দিনে তৈরি হয়নি। গত কয়েকটি আন্দোলনে এই সম্পর্ক অনেকখানি তেতো হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে যেমন দূরত্ব বেড়েছে, তেমন বেড়েছে বনিবনার ঘাটতি। একেকটি আন্দোলন একেকটি অভিজ্ঞতার জন্ম দেয় এবং তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই যখন শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা শিক্ষকদের বিশ্বাস করি না’, তখন শিক্ষকতা কেবল পরাজিতই হয় না, মাথা নিচুও হয়ে যায়।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন