default-image

পাকিস্তানি স্বৈরশাসনকালে, বিশেষত ষাটের দশকে মত প্রকাশ ও লেখালেখির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নানা হয়রানি করা হয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি থেকে আইয়ুব-মোনেম খানের এনএসএফের আক্রমণ—সবই হয়েছে। এর কারণেই বদরুদ্দীন উমর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে বিপ্লবী রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন শিক্ষক শামসুজ্জোহা। এই ষাটের দশকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আবু মাহমুদ এনএসএফ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে প্রতিরোধের ধারা স্তব্ধ হয়নি। ১৯৭১-এ তাই বুদ্ধিজীবী হত্যা ছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও আলবদরদের অন্যতম মিশন।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; সে সময় খেলার মাঠে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের সঙ্গে পাশের সেনানিবাসের সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পরে তার সূত্র ধরে সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রকে ভয়ংকরভাবে আহত করেছিলেন। সামরিক শাসনের মধ্যেও এর প্রতিবাদে তৎকালীন শিক্ষক সমিতি অনির্দিষ্টকাল ধর্মঘট শুরু করেছিল এবং সম্মিলিত পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান সামরিক প্রশাসক দুঃখ প্রকাশ করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করায় পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল। আশির দশকের প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ছিলেন ফজলুল হালিম চৌধুরী। সামরিক শাসনের বিরোধিতা করায় ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এর প্রতিবাদে উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। শিক্ষক সমিতি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আত্মমর্যাদা ও মেরুদণ্ড শক্ত—এসব ভূমিকাই তো স্বাভাবিক। শিক্ষকদের তো এই ভূমিকাই নেওয়ার কথা।

গত কয়েক বছরে সারা দেশে কত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যে সরকারি ছাত্রসংগঠনের হাতে নাজেহাল হয়েছে, তার হিসাব নেই। সর্বশেষ হাতুড়ি দিয়ে শিক্ষার্থীর পা ভেঙেও তাদের উত্তেজনা থামেনি। আশির দশকে শুনতাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ক্লাসেও পাঠ্য বিষয় নিয়ে বাধা দিচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। বর্তমানে ছাত্রলীগ শুধু এনএসএফ নয়, এই শিবিরেরও উত্তরসূরির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সরকার ছাড়াও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে তথাকথিত কতিপয় শিক্ষক, আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্রলীগ হাত-পা ভাঙছে, পুলিশ আক্রমণকারীর বদলে ক্ষতবিক্ষত শিক্ষার্থীকে আটক করছে, আদালত তাঁদেরই রিমান্ডে পাঠাচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিপীড়িত শিক্ষার্থীদের পাশে না দাঁড়িয়ে প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সন্ত্রাসীদের ওপর ভর করে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক (নামের কলঙ্ক) নিজেদের নানাবিধ লোভ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন, তাঁদের প্রতি ধিক্কার এখন চারদিকে।

২৪ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা হাটহাজারী থানায় ‘তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়’ প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থানা সক্রিয় হয়ে তা গ্রহণ করেছে। এই নেতা এর আগেও শহরে গৃহকর আন্দোলনে থাকা এক শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি দিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এই নেতা নিজ দলের আরেক নেতা হত্যা ও টেন্ডার–সন্ত্রাসে জোড়া খুনের মামলার অন্যতম আসামি বলে পত্রিকায় খবর বের হয়েছে। এই ব্যক্তিই ১৭ জুলাই শিক্ষক মাইদুল ইসলাম ও আর রাজীকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তাঁদের চাকরিচ্যুত করার দাবি জানিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। নিজের নিরাপত্তা চেয়ে শিক্ষক মাইদুল প্রক্টরের কাছে আবেদন করলেও নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না করায় তিনি ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ২৬ জুলাই শিক্ষক আর রাজীকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘বিশ্ববিদ্যালয় লন্ডভন্ড করবার উসকানি দেওয়ার’ অভিযোগে অভিযুক্ত করে কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও এসবই সত্যি!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আকমল হোসেন অবসর গ্রহণ করেছেন কয়েক বছর আগে। শিক্ষক হিসেবে তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও শ্রম সম্পর্কে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা অকুণ্ঠ। ১৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের এক সমাবেশে তাঁর দেওয়া বক্তব্য বিকৃত করে যে অপপ্রচার চলছে, দুর্ভাগ্যবশত তার নেতৃত্ব দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। অধ্যাপক আকমল হোসেন এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আকমল হোসেন বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘... আমার বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার কোনো অভিপ্রায় ছিল না। বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাঙালি জাতির স্বাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন সংগ্রাম করেছিলেন। ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধিকারের প্রশ্নটি বেগবান করার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ...তিনি সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি কিন্তু তাঁর নামেই সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ...অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তাঁর রাজনীতিক জীবনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকবে না জাতীয় যে বক্তব্য ছাত্রলীগের কর্মীদের কারও কারও মুখে প্রকাশ পেয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করতে আমি আমার বক্তব্যের এ অংশে গুরুত্বারোপ করেছিলাম। ...’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি অধ্যাপক আকমল হোসেনের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ না করে ৩৭ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি কী পড়িয়েছেন, তা অনুসন্ধানের হুমকি দিয়েছে। একে হুমকি না বলে একটি ভালো প্রস্তাব হিসেবে আমি বিবেচনা করতে চাই। পাবলিক বা সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়, সেহেতু শিক্ষকদের বিষয়ে জানার অধিকার জনগণের আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক চিত্রই জনগণের সামনে উপস্থিত করা দরকার—নিয়োগ কীভাবে হচ্ছে, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা কী কী কোর্স পড়াচ্ছেন, ক্লাসের সংখ্যা এবং তার গুণগত মান, দেশ-বিদেশে সেমিনার ও সম্মেলনে ভূমিকা, গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশনা, শিক্ষকতা-সম্পর্কিত দায়িত্ব পালন, যে সমাজ তাঁর জীবিকা নির্বাহ করছে, তার প্রতি তাঁর দায়িত্ব পালন ইত্যাদি সবকিছুরই তথ্য প্রকাশ দরকার। উপাচার্য, প্রক্টরসহ যাঁরা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের ভূমিকারও খতিয়ান দরকার।

ভিসি প্রধানত শিক্ষক, তিনি ষাটের দশকের মতো ‘ওপরের’ আদেশ পালনে বাধ্য ডিসি বা ওসি নন, এ অবস্থা নিশ্চিত করতেই মুক্তিযুদ্ধের শক্তিতে ’৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় আইন করা হয়েছিল। এতে শিক্ষকদের স্বাধীন ভূমিকা নিশ্চিত করারও কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অথচ বর্তমানে এসবের বিপরীতেই ক্ষমতার আস্ফালন দেখছি আমরা। শিক্ষকতা মানে নতুন চিন্তা, নতুন জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্র তৈরি, সেখানে সমালোচনা-প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞান বা মানবিক বিষয়গুলোতে যে বহুমত ধারণ না করলে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না, এমনকি ল্যাবরেটরি বিজ্ঞানের বিষয়ও যে প্রশ্ন তোলা ছাড়া সংশয় এবং নতুন অনুসন্ধানের তাড়না ছাড়া বিকাশ লাভ করে না, তার উপলব্ধি যদি কারও না থাকে, তাঁদের শিক্ষকতায় আসা উচিত নয়।

স্বাধীন অবস্থানের কারণেই সমাজের অন্যায়, সরকারের ভুল বা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত, নীতি বা কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার মানুষদের সামনের সারিতে থাকার কথা শিক্ষকদের। আর সরকার গণতান্ত্রিক হলে সমালোচনা আর প্রশ্নকেই তাদের গুরুত্ব দেওয়ার কথা। কারণ, তেলবাজ বা তোষামোদকারীদের ওপর ভর করে নিজেদের ভুল সংশোধন করা যায় না, নিজেদের বিকাশ ঘটানো যায় না। পরিণতমনস্ক কোনো ব্যক্তি এই পথে যায় না।

সরকারের কাছে শিক্ষকদের কোনো দায় নেই। সরকার শিক্ষকদের বেতন দেয় সুতরাং তার কথা শুনতে হবে, এর চেয়ে বড় ভুল কমই আছে। শিক্ষকদের বেতন আসে জনগণের কাছ থেকে, সে জন্য শিক্ষকদের দায় জনগণের প্রতি, দায় জ্ঞানের প্রতি, সত্যের প্রতি। যে শিক্ষকেরা নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, তাঁদের পক্ষে তাই সামাজিক দায়িত্ব বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকা কঠিন। শিক্ষার্থীসহ সমাজের আক্রান্ত বঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব। সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

আনু মুহাম্মদ অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

anu@juniv.edu

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0