মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল নামক দলিলে শুদ্ধাচারের একটা অর্থ হচ্ছে, সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদণ্ড, নীতি ও প্রথার প্রতি অনুগত থাকা। এখানে সমস্যা হচ্ছে ওই ‘কালোত্তীর্ণ’ শব্দটা নিয়ে। একজন সাধারণ মানুষ যেসব মূল্যবোধ নিয়ে বড় হন, তিনি ধরেই নেন যে তার সবই কালোত্তীর্ণ। ফলে তিনি শুদ্ধাচারী হতে চাইলে সেই সব মূল্যবোধকে অন্ধের মতো অনুসরণ করতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্ধভাবে অনুসৃত কোনো মূল্যবোধ যদি সত্যিকার অর্থে কালোত্তীর্ণ না হয় তো, তার অবস্থা ভারতীয় পুরাণের সেই আরণ্যক মুনির মতো হতে পারে। সেই মুনি একটি তিন রাস্তার মোড়ে বসে তপস্যা করছিলেন। একদিন হঠাৎ ভীত–সন্ত্রস্ত এক ব্যক্তি সেই মুনির কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘বাবা, ডাকাতেরা আমায় তাড়া করছে। ধরতে পারলেই আমার অর্থ-কড়ি কেড়ে নিয়ে আমাকে হত্যা করবে। দয়া করে আমার প্রাণ রক্ষা করুন। আমি বাঁ দিকের পথে পালাচ্ছি। ওরা যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি দয়া করে ডান দিকের পথটা দেখিয়ে দেবেন।’ একটু পরে হইহই করতে করতে ডাকাতের দল এসে যখন মুনিকে জিজ্ঞেস করল, মুনি তখন সেখানকার বিদ্যমান পরিস্থিতি ও নিজের মানবিক আবেগ উপেক্ষা করে তাঁর ‘সদা সত্য কথা বলার’ যে মূল্যবোধ, সেটা চর্চা না করে পারলেন না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো।

শুদ্ধাচারী হতে হলে মূল্যবোধের সঙ্গে আরও অন্তত দুটো বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হয়—বাস্তবতা ও আবেগ। আপনি যদি আপনার মূল্যবোধ, বাস্তবতা ও আবেগকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন এবং আপনার মনের ভেতর এই তিনটি বিষয়ের ভেতর একটি ঐকতান তৈরি হয়, কেবল তাহলেই আপনার পক্ষে শুদ্ধাচারী হওয়া সম্ভব; কেবল তাহলেই যা করা উচিত বলে আপনার মনে হয়, আপনি তা–ই করতে পারবেন।

এ কারণেই শুদ্ধাচারের বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুদ্ধাচারী হতে হলে মূল্যবোধের সঙ্গে আরও অন্তত দুটো বিষয়কে বিবেচনায় নিতে হয়—বাস্তবতা ও আবেগ। আপনি যদি আপনার মূল্যবোধ, বাস্তবতা ও আবেগকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন এবং আপনার মনের ভেতর এই তিনটি বিষয়ের ভেতর একটি ঐকতান তৈরি হয়, কেবল তাহলেই আপনার পক্ষে শুদ্ধাচারী হওয়া সম্ভব; কেবল তাহলেই যা করা উচিত বলে আপনার মনে হয়, আপনি তা–ই করতে পারবেন। তবে মনে রাখতে হবে, তিনটি বিষয়ের মধ্যে এই ঐকতান এমনি এমনি তৈরি হবে না। যদি আপনার মূল্যবোধটি কালোত্তীর্ণ না হয়, তাহলে তাঁকে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে একটু পরিবর্তন করতে হবে; আর যদি তা সত্যিই কালোত্তীর্ণ হয়, তাহলে তার সঙ্গে মেলাবার জন্য আপনার বাস্তবতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটাকে পাল্টাতে হবে।

এবার দেখা যাক, আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা কোন কোন ক্ষেত্রে অশুদ্ধাচারী বলে গণ্য হন। নিন্দুকদের কথা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষকেরা অশুদ্ধাচারী হওয়ার যতটুকু সুযোগ পান, তার প্রায় সবটাই তারা গ্রহণ করেন। এই নিন্দুকদের চ্যালেঞ্জ করলে যে কয়টি প্রমাণ তারা হাজির করার চেষ্টা করেন, সেগুলো হচ্ছে—প্র্যাকটিক্যাল, ইনকোর্স ও ভাইভা পরীক্ষার মূল্যায়ন। একজন শিক্ষকের যতটুকু নম্বর দেওয়ার ক্ষমতা আছে, বাছবিচার না করে তিনি তার সবটুকুই দিয়ে দেন। যেমন প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় পঁচিশে পঁচিশ পাচ্ছে না, এমন পরীক্ষার্থী এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। শিক্ষকেরা কেন এই মূল্যায়নকে এবং একই সঙ্গে নিজেদের এমন হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে আনছেন? তাঁদের ক্ষমতাহীন জীবনে সামান্য একটু ক্ষমতা পেয়েই তার অপব্যবহার করে তাঁরা হয়তো ক্ষণিকের তৃপ্তি লাভ করেন; কিন্তু যে বুকভরা আক্ষেপ নিয়ে তাঁরা এই পেশার ভার বহন করে চলেছেন, সেই আক্ষেপ তো দূর হয়ই না, বরং তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

অবশ্য শিক্ষকদের এই আক্ষেপ প্রায় চিরন্তন ও বিশ্বজনীন। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা, এবং মর্যাদা নেই। তবে যেসব দেশের শিক্ষকদের এই আক্ষেপ নেই, যেমন ফিনল্যান্ডের, সেসব দেশের শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে তাঁদের শুদ্ধাচারের একটা সম্পর্ক আছে। শুদ্ধাচারী বলেই তাঁরা তাঁদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যে মূল্যায়ন করেন, তা–ই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়, এবং তাতেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। শিক্ষকদের এই ক্ষমতা তাঁর অন্য অনেক ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, ও মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব বড় ভূমিকা পালন করে।
মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের একজন শিক্ষকের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন শিক্ষকের কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু এখানে একজন শিক্ষক যে বাস্তবতা বিবেচনা করে কিংবা যে আবেগ অনুভব করে শিক্ষার্থীদের অস্বাভাবিক নম্বর দিয়ে দেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এ ক্ষেত্রে যেহেতু মূল্যবোধ পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই, সেটাকে বাস্তবতার সঙ্গে মেলাতে হলে তাঁর বাস্তবতাকে দেখার দৃষ্টি আরও গভীর করতে হবে। তিনি যে সামান্য লাভের কথা চিন্তা করে অশুদ্ধাচারী হন, সেটা ছাড়াও যে আরও বড় বাস্তবতা আছে তা তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়। তাঁকে বুঝতে হবে তিনি যদি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেন, তাহলে সেটা সরাসরি তাঁর ক্ষমতা ও মর্যাদা বাড়াতে সাহায্য করবে আর তা যদি বাড়ে, তাহলে অবধারিতভাবে তার লেজ ধরে আসবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা। তাঁকে এটাও বুঝতে হবে, এটা কেবল তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ নয়। তাঁর মর্যাদার হ্রাস-বৃদ্ধির সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মানের হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে এবং শিক্ষার গুণগত মানের হ্রাস-বৃদ্ধি সরাসরি দেশের উন্নয়নের হ্রাস-বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। তিনি যদি তা বোঝেন, তাহলে দেখবেন, এই বাস্তবতার সঙ্গে কিংবা তাঁর ব্যক্তি ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে তাঁর আজন্মলালিত মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই।

তিনি যে মর্যাদা, ক্ষমতা, কিংবা সুযোগ-সুবিধা কামনা করেন, সেটা তাঁর প্রাপ্য। অন্য কোনো পেশাজীবীর চেয়ে তিনি কোনো অংশে কম পরিশ্রম করেন না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশিই করেন; অন্যরা সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করলে তিনি ছয় দিন কাজ করেন। এসব প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা আদায় করার জন্য তাঁদের নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষকদের মতো তাঁরাও এমন অবস্থা তৈরি করতে পারেন, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজ স্বপ্রণোদিত হয়ে তাঁদেরকে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রদান করে। যেমন ওপরে যে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নের কথা বলা হলো, সেগুলো যদি তিনি সঠিকভাবে করেন, ২০২৩ সাল থেকে নতুন কারিকুলামে তাঁকে যে আরও অনেক বেশি ধারাবাহিক মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেই মূল্যায়নের কাজটি করার সময় তিনি যদি তাঁর শুদ্ধাচার বজায় রাখতে পারেন, তাহলে সেদিন খুব বেশি দূরে নয় যখন তাঁর দেওয়া নম্বরের ওপর ভিত্তি করেই তাঁর ক্লাসের শিক্ষার্থীদের গ্রেডিং নির্ধারিত হবে। এভাবে বোর্ডের মূল্যায়নের চেয়ে যদি ধারাবাহিক মূল্যায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, একজন অচেনা–অজানা পরীক্ষকের পরীক্ষার খাতায় দেওয়া নম্বরের চেয়ে যদি শ্রেণিশিক্ষকের দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া নম্বরের ওজন বেড়ে যায়, তাহলে শিক্ষকের ক্ষমতা, মর্যাদা, ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আর দ্বিধাগ্রস্ত হবে না; রাষ্ট্রের জন্য ওটা যুগপৎ সহজ ও লাভজনক হবে।

নীতিনির্ধারকেরা তখন স্পষ্ট বুঝবেন, শুদ্ধাচারী শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর অর্থ হচ্ছে তাঁদের আরও শুদ্ধাচারী হতে সাহায্য করা। আর তাঁরা যত শুদ্ধাচারী হবেন, শিক্ষার গুণগত মান ততটাই নিশ্চিত হবে। একইভাবে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত হলে ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়নের অন্যান্য লক্ষ্যও অর্জিত হবে। আর তা যদি না হয়, সুকুমার রায়ের নৌকাযাত্রী সেই বাবুমশায়ের মতো তাঁদের অন্য সব অর্জনের ষোলো আনাই শেষ পর্যন্ত মিছে বলে প্রমাণিত হবে।

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক মাউশির সাবেক মহাপরিচালক, অধ্যাপক ও ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন