আইন পেশা

শিক্ষা, পরীক্ষা ও বার - পুনর্মূল্যায়ন

বিজ্ঞাপন
default-image

মাননীয় প্রধান বিচারপতি ১৬ মে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে আইনের শাসন এবং বার-বেঞ্চের সম্পর্কসংক্রান্ত এক আলোচনায় যথার্থই মন্তব্য করেন যে শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় আইনজীবীদের অদক্ষতা ও গাফিলতির জন্য মক্কেল সুবিচার থেকে বঞ্চিত হন।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি কমবেশি ২৫ বছর ওকালতি করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছেন ১৯৯৯ সালে। অর্থাৎ, ১৫ বছর আগে। সব মিলিয়ে ৪০ বছরের বিশাল অভিজ্ঞতা। আইনজীবী মহলের বাইরে অনেকেই হয়তো জানেন না যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সবিতা রঞ্জন পালের জুনিয়র ছিলেন। প্রচারবিমুখ প্রয়াত সবিতা রঞ্জন পাল (এস আর পাল) আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যে অন্যতম। যত দূর শুনেছি, ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর যখন হাজার হাজার হিন্দু পরিবার পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে গিয়েছিল বা যেতে বাধ্য হয়েছিল, তখন এস আর পালও কলকাতা চলে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ অনুরোধে উনি ঢাকায় ফিরে আসেন; নতুন দেশের নতুন সরকারকে বিভিন্ন আইনি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন।
মাননীয় প্রধান বিচারপতি উল্লেখ করেছেন যে আজকাল নবীন আইনজীবীরা অভিজ্ঞ কোনো আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টাও করেন না। সনদ পেয়েই বিচারক/বিচারপতির সামনে দাঁড়িয়ে যান।
সমস্যার মূলে এখনো আমাদের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং এসব দুর্বলতার কারণেই অদক্ষতা। কোনো তরুণ আইনজীবী বা আইন শিক্ষার্থীর পক্ষে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে ভালো আইনজীবী হওয়া প্রায় অসাধ্য। এটা মাথায় রেখেই এই লেখার সম্পূর্ণ শিরোনাম: ‘আইন শিক্ষা, আইনজীবী সনদ পরীক্ষা এবং বার কাউন্সিলের ভূমিকা—পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’।
এখন আইন শিক্ষা দেয় গোটা বিশেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ইদানীং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন বিভাগ খোলার হিড়িক পড়ে গেছে। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি আইনের ছাত্রছাত্রীই আছেন হাজার তিন-চার। প্রতি সেমিস্টারে ছাত্রছাত্রীপ্রতি ১০ হাজার টাকা ফি নিলে বছরে হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। আর ঢাকা, চট্টগ্রাম প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম পরীক্ষাটা দিয়ে ফেললেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের মাস্টার হওয়া নাকি খুব সহজ। প্রত্যেক লেকচারারকে পড়াতে হয় চার, পাঁচ এমনকি ছয়টা বিষয়।
দুনিয়ার সত্যিকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষককে দুটির বেশি ‘সাবজেক্ট’ পড়াতে হয় না। অনেকেই কোনো কোনো বছর কেবল একটা সাবজেক্ট পড়ান। দুনিয়ার প্রায় সব দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু শিক্ষকের ক্লাস ওয়ান বা টু বা থ্রিতে চার-পাঁচটা বিষয় পড়াতে হয়। আমাদের সমস্যা হলো যাঁরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক, তাঁরা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে যে পার্থক্য বা ফারাক, সেটা সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেন না। ফলে সম্ভবত তাঁদের ধারণা, বেতন দিচ্ছি, পড়াবেন না কেন?
যত কম শিক্ষক দিয়ে যত বেশি বিষয় পড়ানো যায়, লাভ তত বেশি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে চাপ আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব জমি, ইমারত লাগবে। ঢাকা শহরে পাঁচ বিঘা জমি আর ইমারত তো ৫০ কোটি টাকার কম নয়।
বছর দশেক আগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ পড়ার হিড়িক ছিল; ছিল হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। এখন ‘কম্পিউটার সায়েন্স’ বিভাগগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ‘আইন বিভাগ’ তার জায়গা দখল করেছে।
মঙ্গোলিয়া বা মাদাগাস্কার অথবা ফ্রান্স কিংবা জার্মানি—যেখানেই আইন পড়েন না কেন, সে দেশের আইন বাংলাদেশের আদালতে অচল। বাংলাদেশের আদালতে চলে বাংলাদেশের আইন। বিলেত-আমেরিকা, চীন-জাপানের বহু আইন আপনি জানতে পারেন, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের তো পড়াতে হবে বাংলাদেশের আইন। অনেক জায়গায় নাকি বিদেশি আইন জানা গন্ডায় গন্ডায় শিক্ষক আছেন। তাঁরা দেশি আইনের ধার ধারেন না।
তারপর আছে ‘বার–অ্যাট–ল ডিগ্রি লাভের’ বিজ্ঞাপন। ‘বার–অ্যাট–ল’টা ডিগ্রি না। কিন্তু সেটা ‘ডিগ্রি লাভ হয়েছে’ বলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। প্রতারণাটা শুরু হয় প্রথম দিন থেকেই।
আইনের ডিগ্রি লাভের পর বার কাউন্সিলের ‘সনদ’-এর পরীক্ষা। মাস খানেক আগে এবারের প্রাথমিক পর্যায়ের এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েস কোয়েশ্চেন) পরীক্ষা হয়। প্রায় ২০ হাজার আইন ডিগ্রিধারী এই পরীক্ষা দেন। পাস করেছেন হাজার পাঁচেক। এখন এঁরা ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দেবেন।
খুব অল্প সিলেবাসের তিন ঘণ্টার ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হওয়া যায়। অবশ্য এরপর একটা নামমাত্র মৌখিক পরীক্ষা। জানামতে, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’—যেখানে ১০০ নম্বরের একটা পরীক্ষা দিয়ে আইনজীবী হওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর আইনজীবীদের পরীক্ষা হয় আগস্ট মাসের ৩০ আর ৩১ তারিখে। প্রতিদিনই সকাল আটটা থেকে দুপুর ১২টা, তারপর আবার বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। দুই দিনে মোট ১৬ ঘণ্টার পরীক্ষা।
সহজলভ্য এলএলবি ডিগ্রি নিয়ে নামকাওয়াস্তে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা দিয়ে যদি অ্যাডভোকেট হওয়া যায়, তাহলে তো দক্ষতার সংকট থাকতেই পারে।
যাঁরা সহকারী বিচারক হওয়ার জন্য বার কাউন্সিলের পরিবর্তে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরিবর্তে) পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁদের আইনের মোট ৬০০ আর আইনের বাইরে বাংলা, ইংরেজিসহ ‘সাধারণ’ বিষয়ে আরও ৪০০, অর্থাৎ প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হয়। সর্বশেষ গত মাসে ২৪টা সহকারী বিচারকের খালি পদের জন্য এই লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন পাঁচ শতাধিক ছাত্রছাত্রী। তার আগে এমসিকিউতে বাদ পড়েছেন হাজারেরও বেশি।
এ বছর মার্চ মাসে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে সনদ পেয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ নবীন আইনজীবী। এই নতুন ১ হাজার ৩০০ নবীন আইনজীবীকে কে শেখাবেন। তাঁদের সঙ্গে গতবারের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের আরও হাজার তিনেক নতুন আইনজীবীকে যোগ করলে চার সহস্রাধিক আইনজীবীর অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন। নতুন চার হাজার আইনজীবীকে অভিজ্ঞতা প্রদানের ব্যবস্থা আমাদের নেই। যেমন নেই দক্ষ শিক্ষক।
এক অর্থে আইনের ছাত্রছাত্রীরা প্রতারিত হচ্ছেন। আর বার কাউন্সিল নামকাওয়াস্তে পরীক্ষায় পাসের ব্যবস্থা করে আইনজীবী হিসেবে সনদ দিয়ে বিচারপ্রার্থীদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। নিয়োগ-বাণিজ্য হয়। হয় অকাতরে তদবির-বাণিজ্য। তদবিরকে আমরা পারতপক্ষে অন্যায় মনে করি না।

২.
সবচেয়ে বড় কথা হলো, আদালতগুলোয় নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা বাড়ছে না। তার পরও প্রায় ৩০ লাখ মামলা ঝুলে আছে শুনলে কোনো বিচারপ্রার্থীই আদালত পানে সহজে যাবেন না।
গত পাঁচ বছরে হাইকোর্টে দায়ের হওয়া নতুন মামলার সংখ্যা বাড়েনি বললেই চলে। অথচ নতুন উকিল বেড়েছে অন্তত হাজার তিনেক।
বিশ্বের অন্যান্য দেশে উকিলের চাহিদা, মামলার সংখ্যা, দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ—সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে দেশগুলোর বার কাউন্সিল তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করে।
আমাদের বার কাউন্সিল ওসবের ধার ধারে না বললেই চলে। ২৭ মে অনুষ্ঠেয় বার কাউন্সিলের নির্বাচনের জন্য নেতারা দেশের এ-মাথা থেকে ও-মাথার প্রায় সব জেলা বারে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিচ্ছেন। প্রায় সব নেতাই অন্তত ৪০টা জেলায় গেছেন। দেশের চলমান রাজনীতির কোনো বিষয় নির্ঘাত তাঁদের বক্তব্য থেকে বাদ পড়েনি।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আইন শিক্ষার মান? আইন শিক্ষার মান নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হলো বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। নতুন-নবীন আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ? গত ৪০ বছরের গড় হিসাব করলে বছরে চার দিনও বোধ হয় কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেনি।
আমাদের বারের, অর্থাৎ আইনজীবীদের নেতারা—তাঁদের নেত্রীর মামলা নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বা অন্য দল সরকারের গুণগানে—তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, প্রভাব, কোনো কিছুরই বিন্দুমাত্র অভাব বা কমতি নেই। কমতি একটাই—নবীন ও নতুন আইনজীবীদের এবং তারও আগে যখন তাঁরা আইনের ছাত্রছাত্রী থাকেন, সে সময় তাঁদের শিক্ষার মান, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে নজর দেওয়ার ব্যবস্থা করা। সারা দুনিয়ায় আইনজীবীদের উৎকর্ষের মান নিয়ন্ত্রণ করা হলো বার কাউন্সিলের প্রধান কাজ। এ কাজে নজর নেই বললেই চলে। মাননীয় প্রধান বিচারপতির কথা আমলে নিতে আইনজীবীদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও শিক্ষা বাড়াতে হবে।
একটা নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়ে শেষ করব। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক একসঙ্গে তিনটির বেশি বিষয় পড়াতে পারবেন
না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমতুল্য নয়।
অন্তত আইন পড়ানোর ব্যাপারে এই নির্দেশ জারির ক্ষমতা বার কাউন্সিলের আছে। আর ১০০ নম্বরের পরিবর্তে প্রথমে ৫০০ এবং দুই বছরের মধ্যে ১০০০ নম্বরের পরীক্ষায় পাস করতে হবে আইনজীবী হতে হলে।
ন্যায়বিচার নির্ভর করে প্রথম আইনজীবীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট; অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন