কোভিডের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির করুণ দশা। বাড়ছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব। আমার অতিচেনা লন্ডনকে আজকে অচেনা লাগে। বন্ধ হয়ে গেছে একের পর এক দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, সুপারমার্কেট। তিন পুরুষের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠেছিল, কিন্তু কোভিডের ধকল কাটাতে পারেনি—এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা একাধিক। ইউরোপজুড়ে। চারদিকে দোকান, অফিস ‘খালি আছে, ভাড়া দেওয়া হবে’—এ রকম বিজ্ঞাপন। কয়েক মাস আগেও নামকরা ব্রিটিশ বিমান সংস্থার পাইলটকে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে গোডাউনে কাজ করতে হয়েছে। বার্লিন, প্যারিস, মাদ্রিদ বা বার্সেলোনা—সব জায়গায় একই চিত্র।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম ট্রাস্টের মতে, কোভিডের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নতুন করে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যাও প্রায় ২৬ কোটি। এসব মানুষের উপার্জনের ওপর অন্তত ১০০ কোটি মানুষের জীবন নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী ১৬০ কোটিরও বেশি শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ছিল।

কোভিড বিশ্বের প্রতিটা দেশকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, স্বাস্থ্য আর বিজ্ঞান গবেষণা বিশেষ করে চিকিৎসা, ওষুধ আর জীববিজ্ঞানে বিনিয়োগ করা কতটুকু জরুরি। ভেন্টিলেটরের অভাবে মারা গেছে অসংখ্য মানুষ। প্রযুক্তিগতভাবে ভেন্টিলেটর অতি সাধারণ একটি যন্ত্র। কিন্তু বিশ্বব্যাপী প্রয়োজনের তুলনায় মজুত ছিল অপ্রতুল। কোভিডের প্রতিরোধক এবং প্রতিষেধক হাতে ছিল না। তৈরি করতে হয়েছে। তৈরি হয়েছে রেকর্ড গতিতে। বিজ্ঞান, অদম্য মেধাবী কিছু মানুষ আর লাখো বছর ধরে এই গ্রহে টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ সহযোগিতার কারণে।

নতুন ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার করতে দরকার হয় বছরের পর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন বিজ্ঞান গবেষণার। সময় লাগে ১০ থেকে ১৫ বছর। প্রফেসর জং ইয়ং জেন, প্রফেসর এডওয়ার্ড হোমস, প্রফেসর সারা পেলিন, ডক্টর ক্যাটালিন কারিকো, প্রফেসর ডিউ ওয়াইজমান, ডক্টর উরুগ শাহীন—আরও কত বিজ্ঞানী। কোভিড টিকার কারিগর তাঁরা। কারও বাড়ি চীনে, কারও–বা অস্ট্রেলিয়ায়। কারও জন্ম হাঙ্গেরিতে, কিন্তু বসবাস যুক্তরাষ্ট্রে। জন্ম হয়েছে তুরস্কে, কিন্তু বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। কেউবা আমেরিকান। এই মানুষগুলোর কল্যাণে মাত্র এক বছরে কোভিড টিকা তৈরি সম্ভব হয়েছে।

ইউক্রেন আগ্রাসনের পর রাশিয়াকেন্দ্রিক জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে ইউরোপের দেশগুলোতে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি আনতে হবে, অপেক্ষাকৃত বেশি দামে। মোকাবিলা করতে হবে কোভিড–পরবর্তী রুগ্‌ণ অর্থনীতি আর বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য আর শিক্ষা খাত। পরিবর্তিত হতে পারে বিজ্ঞান গবেষণার বরাদ্দ খাত। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বিজ্ঞান গবেষণার অনেকটাই শরীর বা ওষুধবিজ্ঞান থেকে সরিয়ে সামরিক খাতে বিনিয়োগ করবে।

কোভিড–পূর্ববর্তী গত ২০ বছরে বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ কমেছে। সরকারি এবং বেসরকারিভাবে। ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে গেছেন—করোনাজনিত মহামারির। টিকার জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোর বরাদ্দ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। ধনী দেশগুলো কেউই গবেষণায় বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেয়নি। সবাই ভেবেছে, আমি গবেষণা না করলেও অন্য কেউ করছে।

২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় আর্থিক মন্দা। কমতে থাকে সরকারি, দাতব্য বা বেসরকারি অর্থায়ন। ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ সব দেশে। ছোট একটা উদাহরণ দিই—২০১৪ সালে ব্রিটেনে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার জন্য বরাদ্দ করা হয় ৮৫০ কোটি পাউন্ড—যা কিনা ২০০৯-এর চেয়ে ৭৮ কোটি পাউন্ড কম। ২০০৮ থেকে ২০১০। ব্রিটেনের সরকারি সংস্থায় কর্মরত সব বিজ্ঞানীকে বলা হলো বছরে বেতন এক টাকাও বাড়বে না।

যুক্তরাষ্ট্রেও ১৯৯০ সাল থেকে প্রতিবছর বরাদ্দের পরিমাণ কমেছে। ২০১৮ সালে বিজ্ঞান গবেষণায় বরাদ্দ ছিল জিডিপির শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। আজ থেকে ৬০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণার বরাদ্দ তাদের সামগ্রিক অর্থনীতির নিরিখে ২০১৮ থেকে বেশি ছিল। কোভিড–পরবর্তী বিশ্বে ভাবা হয়েছিল বিজ্ঞান গবেষণা, চিকিৎসা আর শিক্ষা খাতে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বিনিয়োগ বাড়াবে। মোকাবিলা করা যাবে আগামীর মহামারি। শুরুটা ভালোই ছিল। জার্মানি ১৮ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত গবেষণা বরাদ্দের ঘোষণা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা প্রস্তাব করেছিলেন আগামী পাঁচ বছর বিজ্ঞান গবেষণার বরাদ্দ আট বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলার করার। আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যয় বছরে প্রায় ৮২১ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটিশ সরকার গবেষণায় বরাদ্দ বছরে ১১ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ২০২৪ সাল নাগাদ ২৭ বিলিয়ন ডলার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলে রাখি, ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার।

ইউক্রেন আগ্রাসনের পর রাশিয়াকেন্দ্রিক জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে ইউরোপের দেশগুলোতে অন্য দেশ থেকে জ্বালানি আনতে হবে, অপেক্ষাকৃত বেশি দামে। মোকাবিলা করতে হবে কোভিড–পরবর্তী রুগ্‌ণ অর্থনীতি আর বিপর্যস্ত স্বাস্থ্য আর শিক্ষা খাত। পরিবর্তিত হতে পারে বিজ্ঞান গবেষণার বরাদ্দ খাত। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বিজ্ঞান গবেষণার অনেকটাই শরীর বা ওষুধবিজ্ঞান থেকে সরিয়ে সামরিক খাতে বিনিয়োগ করবে। বলে রাখি, নতুন ওষুধ আবিষ্কারের পেছনে যে গবেষণার দরকার, তার অধিকাংশই আসে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে।

এখন নতুন করে শীতলযুদ্ধ পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, হয়তো অন্য কোনো নামে। পশ্চিমের দেশগুলোতে এতে করে বরাদ্দ কমবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। অতীত ইতিহাস অন্তত তাই বলছে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে শক্তি প্রয়োগের পর ন্যাটোর দেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয় তাদের বার্ষিক জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করবে। ২০১৫ সালের ন্যাটোর বার্ষিক সামরিক খরচ ছিল ৮৯৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০ বিলিয়ন ডলারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ব্যবহার করা যায় এমন প্রযুক্তির গবেষণায় বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। আসতে থাকে একের পর এক পেটেন্ট। গড়ে ওঠে যুদ্ধপ্রযুক্তি–সম্পর্কিত শিল্প। ১৯৭০ সাল নাগাদ এই খাতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান হয়, যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
রাশিয়া-ইউক্রেনের সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে এর বহুমাত্রিক পরিণতি ভোগ করতে হবে কয়েক প্রজন্মকে। পিছিয়ে পড়বে কল্যাণমূলক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণা। থমকে যাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি। যত দ্রুত বিশ্বনেতাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে, ততই মঙ্গল।

  • সুব্রত বোস প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট
    [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন