default-image

কলকাতায় একদিন সকালে হোটেলের রেস্তোরাঁয় নাশতা করতে গিয়ে দেখি এক বাঙালি দম্পতি রাগতভাবে আলাপ করছেন। এটুকু শুধু বুঝতে পারলাম, তাঁরা উড়িয়াদের মুণ্ডপাত করছেন। ভদ্রমহিলা বলছিলেন, মানুষ হিসেবে উড়িয়ারা নিকৃষ্ট। পরে ওই দিনের আনন্দবাজার পত্রিকায় দেখি সিকি পাতাজুড়ে এক প্রতিবেদন। ওডিশার এক স্কুল পাঠ্যবইয়ে ভারতের বিভিন্ন জাতির পরিচিতিমূলক নিবন্ধে বাঙালিদের সম্পর্কে লিখেছে, বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য পাঁচ ‘ম’; যেমন মাদক, মৈথুন, মাৎসর্য, মারামারি প্রভৃতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। লেখক এবং বইটির সম্পাদনার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের শাস্তি দাবি করেছে।

উড়িয়া যে ভদ্রলোক বাঙালির পাঁচ ‘ম’ বৈশিষ্ট্য নিয়ে লিখেছেন, তিনি হয়তো খোঁজখবর নিয়েই তা করেছেন। অপবাদ-নিন্দা কারোরই ভালো লাগে না। বাঙালি হিসেবে আমাদেরও ভালো লাগবে না। কিন্তু কে অস্বীকার করবে বাঙালির মাদকে অরুচি নেই। সে কামকাতর। সে ঈর্ষাকাতর। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল যদি কেউ দেখে এবং পত্রপত্রিকা পাঠ করে, তাহলে তার কোনো সন্দেহ থাকবে না যে উপমহাদেশে বাঙালি যৌন নিপীড়নকারী হিসেবেও কম যায় না। তার কোনো বাছবিচার নেই। মেয়েশিশু হোক বা প্রৌঢ়া বা বৃদ্ধা।

বিজ্ঞাপন

টেলিভিশন খোলামাত্র স্ক্রলে ‘ধর্ষণ’ ও ‘ধর্ষক’ শব্দ দুটি চোখে পড়ায় এখন বাংলাদেশে এ দুটি সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ। ছোট ছোট বাচ্চা পর্যন্ত তার মা বা নানি-দাদির কাছে এ দুটি শব্দের মানে বা বিষয়বস্তু জানতে চায়। একই শব্দ প্রতিদিন উচ্চারিত হওয়ায় এবং একই শব্দ প্রতিদিন চোখে পড়ায় ১৭ কোটি মানুষের মাথার মধ্যে তা ঢুকে যায়। অসুন্দর ও অশ্লীল শব্দ অব্যাহত ব্যবহার করলেই তা ভদ্র সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জীবনের বহু ব্যাপারে যেমন, শব্দ ব্যবহারেও তেমনি বাঙালি সংযত ও সতর্ক নয়।

নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন শুধু বাংলাদেশে নয়, অনেক দেশেরই বর্তমানে এক নম্বর সমস্যা। এই অভিশাপ থেকে নারীসমাজকে বাঁচাতে অনেক দেশই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে অথবা শক্ত আইন করার কথা ভাবছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিপীড়কদের লিঙ্গ কর্তনের কথা বলেছেন। কয়েক বছর আগে মেয়েশিশুদের যৌন নির্যাতনকারীকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে নপুংসক করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইন্দোনেশিয়ার সরকার। সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ প্রোসেতিও এক বিবৃতিতে বলেন, শিশুদের ওপর নিষ্ঠুর যৌন নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এই শাস্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পার্লামেন্টে ভোটাভুটি ছাড়াই এটি আইনে পরিণত হবে। ওই আইনে শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্ত্রী হরমোন ঢুকিয়ে দিয়ে শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনকারীকে নপুংসক করা হবে।

অনেক দেশে রয়েছে মৃত্যুদণ্ডের বিধান। রাজপথে বিক্ষোভের পর বাংলাদেশেও মৃত্যুদণ্ডের বিধানসংবলিত অধ্যাদেশ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এই অধ্যাদেশ জারির দুই দিন পর জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার মিশেল ব্যাশলেট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘রেপ একটি মারাত্মক ধরনের অপরাধ। এটা প্রতিরোধে আইনের শাসন, দ্রুততম সময়ে অপরাধের তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে মৃত্যুদণ্ড কোনো সমাধান নয়। সরকারকে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে তাদের প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করতে হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া প্রভৃতি দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণ সংগতভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছে। তাঁরা এই বর্বরতার প্রতিকার ও বিচার দাবি করছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি।’ বর্তমানে বাংলাদেশের ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

নারীর ওপর নির্যাতনকারীদের শাস্তি দিতে বাংলাদেশে যে আইন রয়েছে, তা যথেষ্টই শক্ত আইন। কিন্তু বিচারপদ্ধতির দীর্ঘসূত্রতায় নির্যাতিতা ও তার পরিবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পায় না। ‘দেশে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় গত ১১ বছরে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যা ও মৃত্যু ঘটনার অপরাধে এই মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আরও ১৪৪ জন।’ [প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর]

নারী নির্যাতনের বিচারের জন্য প্রথম বিশেষ আইন হয়েছিল ১৯৮৩ সালে, অধ্যাদেশ হিসেবে। ১৯৯৫ সালে হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন। তারপর হয় ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। ২০০৩ সালে তা সংশোধন করা হয়েছে। এ আইনে একক ব্যক্তির করা ধর্ষণের পর নারী বা মেয়েশিশুর মৃত্যু ঘটলে এবং গ্যাং রেপের ফলে কেউ নিহত বা আহত হলে সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড।

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় দেশের বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বন্দীর সংখ্যা ৩৬৫। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে করা মামলাগুলোর বিচারের জন্য সারা দেশে ৯৫টি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। গৎবাঁধা বুলির মতো অব্যাহতভাবে বলা হচ্ছে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধী শাস্তি পায় না’। কথাটি সঠিক নয়।

বিচারহীনতা নয়, বিচার বিলম্বিত হওয়া বা আদৌ ভুক্তভোগীর বিচার না পাওয়ার জন্য দায়ী আরও অনেক বিষয়। সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নেই। সে উদ্যোগ নেওয়া শুধু একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের ঘাড়ে সব দায়িত্ব চাপিয়ে সমাজ যদি চোখ বন্ধ করে রাখে, যত কঠোর আইনই হোক, অপরাধ কমানো যাবে না। অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থাকলেই সব মানুষ ভালো হয়ে যাবে না। তা-ই যদি হতো, তাহলে কুখ্যাত এরশাদ শিকদারের ফাঁসির দুই দিন পর সেই এলাকায়ই আরেকজন খুন হতো না। সব মানুষই জানে, খুন করে ধরা পড়লে ফাঁসি হবে, তারপরও প্রতিদিন ৮-১০ জন খুন হচ্ছে।

সভা-সমাবেশে সব সমস্যার সমাধান হয় না। তবে আবেগ প্রকাশের জন্য সংক্ষুব্ধ আন্দোলনের প্রয়োজন রয়েছে। তা সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে। তবে তা সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে না। মানুষের ভেতরটায় পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজন উঁচু আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। সেটা কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে তদন্ত পদ্ধতি ও বিচারব্যবস্থাও সংস্কার করতে হবে। তা না হলে যখন-তখন একেকটা আইন প্রণয়ন করে সমাজকে লাম্পট্যমুক্ত করা সম্ভব হবে না।


সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক ও গবেষক

মন্তব্য পড়ুন 0