default-image

সাংবাদিক, গবেষক, কলাম লেখক ও সমাজকর্মী সৈয়দ আবুল মকসুদ ৭৪ বছর বয়সে পরলোকে যাত্রা করলেন। সব জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মকসুদ ভাইও তা করলেন। আর ৭৪ বছরে মৃত্যুকে অকালপ্রয়াণ বলারও সুযোগ নেই। বরং পরিণত বয়সেই তিনি মারা গেলেন। তবে একেবারেই আকস্মিক। যেদিন সন্ধ্যায় মারা গেলেন, সেদিনও দিনের বেলায় যোগ দিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে। সারাটা জীবনই তো ব্যয় করলেন সমাজের জন্য। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। সফলও হয়েছেন এ ক্ষেত্রে। সরকারি মালিকানায় পরিচালিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কাজ করতেন। পাশাপাশি নিয়োজিত ছিলেন নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার কাজে। কলাম লিখতেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বিশেষত প্রথম আলোতে। পরিবেশ থেকে বন্দর, যেকোনো বিষয়ে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলনে হতেন সক্রিয়। মাথা নত করেননি বিরূপ প্রতিকূলতায়। এর জন্য হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু করেননি পরোয়া। ২০০৪ সালে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পরপর প্রথম আলোতে একটি কলাম লিখলেন। একে আখ্যায়িত করলেন ফ্যাসিবাদের নগ্নরূপ হিসেবে। বাধা এল বাসস থেকে। এমনকি সরকার থেকেও। বলা হলো কলাম লেখা যাবে না। থামলেন না তিনি। পদত্যাগ করে চলে এলেন অনিশ্চিত জীবিকানির্ভর জীবনে। চলতে থাকলেন নিজের পথ ধরেই। এ সময়টায় কলাম লেখার পাশাপাশি গবেষণাধর্মী কাজে মনোনিবেশ করেন অধিক। তাঁর সেসব গবেষণা আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে গবেষকদের কাছে। এর মধ্যে সুবিখ্যাত রচনা মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে। লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাস। নওয়াব সলিমুল্লাহর জীবন ও কর্ম। এমনকি গান্ধীজির নোয়াখালী মিশন নিয়েও। গবেষণাধর্মী প্রচুর ছোট-বড় প্রকাশনা আছে তাঁর।

সৈয়দ আবুল মকসুদের গবেষণাধর্মী বইয়ে সে সময়ের সমাজচিত্রের পাশাপাশি ঘটনার নির্মোহ বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি অনেক গভীরে যেতেন যেকোনো বিষয়ে। মাওলানা ভাসানীর পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থে তাঁর সংগ্রাম, সাফল্য ও মানবিক দুর্বলতা—বাদ যায়নি কিছুই। বিশাল ক্যানভাসে রচিত বইটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত গবেষণা গ্রন্থটি অনেক অজানা তথ্যের সমৃদ্ধ ভান্ডার। তেমনি গান্ধীজির নোয়াখালী মিশন বইটিতে মহান নেতার সহজ-সরল জীবনাচার, কঠোর পরিশ্রম ও ন্যায়নিষ্ঠ বিবরণ রয়েছে বিস্তারিতভাবে। পাশাপাশি তাঁর ব্রহ্মচর্য পালনের অনুশীলনে ঘটিত দু-একটি সামাজিক বিভ্রাটকেও উল্লেখ করতে ভুল করেননি। তিনি সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকেননি। গোপন করেননি জ্ঞাত সত্য।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলোতে সৈয়দ আবুল মকসুদ কলাম লিখতেন নিয়মিত। এ ধরনের কলামগুলো পড়ে পড়েই আমি ক্রমান্বয়ে কলাম লেখার দিকে ঝুঁকে পড়ি। কলাম লেখা আর সুজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থার গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকে কেন্দ্র করে আমার একটি নৈকট্য তৈরি তাঁর সঙ্গে। আর তা ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ে নিবিড়। সকাল সকালেই তিনি পত্রিকা পড়তেন। আমিও তাই। আমার কোনো লেখা তাঁর পছন্দ হলে টেলিফোন আসতই। প্রশংসা করতেন উদারভাবে। আরও ভালো লেখার জন্য উপদেশ দিতেন। আমি তাঁর লেখা পড়ে ফোনে প্রতিক্রিয়া জানাতাম। অনেক সময়ে নতুন লেখার বিষয় নিয়ে আলাপও করতাম দুজন। তবে মকসুদ ভাই যে সাহসের সঙ্গে কলাম লিখতেন, তার তুলনা বাংলাদেশের বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে বিরল। শব্দ চয়ন, উপস্থাপনা, বিষয়বস্তু—সবকিছু মিলিয়ে এটা হয়ে উঠত একক ও অন্যান্য। আজকের এ বিভাজনের যুগে মোটামুটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য লোক খুব কম। মকসুদ ভাইকে কেউ কেউ সমালোচনা করতে পারেন। পারেন তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করতে। তবে পারবেন না তাঁকে কপট বলতে। তিনি বুদ্ধিবৃত্তির দাসত্ব করেননি। তাঁর লেখায় তাই প্রাপ্তির জন্য তোষণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা কোনোটাই থাকত না। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোতে তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত কলামটির কথা উল্লেখ করতে হয়। একজনের বীর উত্তম খেতাব প্রত্যাহার প্রসঙ্গে দেশে পক্ষে-বিপক্ষে জোর বিতর্ক চলছে। যাঁরা বলছেন বা লিখছেন, প্রায় সবারই অবস্থান নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নয়। বিচক্ষণতার পরিচয় যাঁরা দিতে পারেন, তাঁরাও অপ্রাপ্তির আশঙ্কা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে অনেকটাই নীরব। এ সময় সৈয়দ আবুল মকসুদের এ-বিষয়ক কলামের শিরোনাম, ‘জিয়ার পদক বাতিল: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অবিবেচক দৃষ্টান্ত নয়’ লেখাটিতে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ইতিহাসের ঝাঁপি এভাবে খোলা হলে ওলট-পালট হয়ে যাবে অনেক কিছু। এমনটা বলা বা লেখার মকসুদ ভাইয়ের মাপের লোক আর দেখি না ধারেকাছে। প্রকৃতির রাজ্যে শূন্যতা নেই বলে একটা কথা আছে। তবে শূন্যতা কী দিয়ে পূর্ণ হবে, এ আশঙ্কা করলেও দোষ দেওয়া যাবে না। মিঠাপানির শূন্য স্তর কোথাও কোথাও পূর্ণ হয় লোনাপানিতে।

বন্ধুবৎসল মকসুদ ভাইয়ের সাহচর্য লাভ করেছি প্রায় বছর দশেক। তবে তাঁর বিচরণের জগৎ যত বিশাল ছিল, আমার আনাগোনা ছিল এর অতি ক্ষুদ্র অংশে। এ বিশাল জগৎকে তিনি সামলাতেন পরম নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতা দিয়ে। দলকানা বলে যাদের পরিচয়, তাঁর অবস্থান এর ধারেকাছেও ছিল না। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজির ভূমিকার প্রতি তাঁর অবিচল সম্মানবোধ আড়াল করেনি পূর্ব বাংলার মুসলমানসহ দরিদ্র কৃষিজীবী মানুষের জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহ কিংবা মাওলানা ভাসানীর অবদানকে। এ সম্মেলন ঘটানোর বিশাল মনোজগতে ছিল তাঁর অবস্থান।

মকসুদ ভাই নিরাভরণ জীবন যাপন করতেন, এটা সবারই দেখা। সাদা দুটো বস্ত্রখণ্ডে আবৃত তাঁকে দেখে বিস্মিত হতেন কেউ। অথচ এ পোশাকেই তিনি কাটিয়ে দিয়েছিলেন জীবনের শেষ ১৮টি বছর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণের প্রতিবাদে তিনি এ পোশাক ধরেছিলেন। এটা তেমন কেউ অনুকরণ না করলেও তাঁর দৃঢ়তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগায়। সভা-সমিতিতে তাঁর বক্তব্য থাকত ক্ষুরধার যুক্তিসম্পন্ন। আবেগ তেমন এটা স্থান পেত না এসব বক্তব্যে। তার জন্য তিনি কাঠখোট্টা লোক ছিলেন, এমনও বলা যাবে না। হাসি, তামাশা, রসিকতা—সবই করতেন। প্রথম আলোতে লেখা তাঁর কলামগুলোর বেশ কিছুতে হাস্যরসের মধ্যে মেশানো থাকত প্রতিবাদের ধ্বনি। মকসুদ ভাই গেলেন না-ফেরার দেশে। প্রকৃতির আপন নিয়মে সব চলছে এবং চলবে। তবে তাঁর স্থান পুরো করার কাজটি আদৌ সহজ নয়। যেসব ন্যায্য কথা তিনি অকুতোভয় লিখতে ও বলতে পারতেন, তেমনটি করার মতো লোক এ দুর্ভাগা দেশ থেকে বিলীন হতে চলেছে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন