default-image

শেরপুর জেলা ময়মনসিংহ বিভাগের একটি সীমান্তবর্তী জনপদ। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কোল ঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে এটি পাঁচটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এ অঞ্চলে মানুষ মিলেমিশে বসবাস করছে। রয়েছে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস: গারো, হাজং, কোচ, ডালু, হদি, বর্মণ, বানাই প্রভৃতি সম্প্রদায় মিলে এই নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার জনমানুষ বাস করেন এই জেলায়। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য শেরপুর জেলা একটি অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল।

মূলত পাকিস্তান আমল থেকে শেরপুর জেলার সাধারণ মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ প্রভৃতি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। শেরপুর একসময় অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবনাচার, প্রশাসন, আন্দোলন-বিদ্রোহে ময়মনসিংহের সঙ্গে সমান তালের জনপদ ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে অগ্রসর ছিল। মাত্র একশ বছরের কম সময়ের ব্যবধানে ময়মনসিংহ থেকে শেরপুরের সার্বিক পার্থক্য আকাশ-পাতাল হয়েছে এবং শেরপুর যেন গভীরতর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বসেছে। অথচ শিক্ষাদীক্ষা, শিল্পসাহিত্য, রাজনীতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরপুরের রয়েছে সোনালী অতীত। ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন বলতে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহকে ধরা হয়। ১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধের পর মির জাফর ক্ষমতাগ্রহণ করে খাজনা তোলার ভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে অর্পণ করলে প্রথমে ১৭৬০ সালের সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহ করেন এবং ১৭৭১ সালে বিদ্রোহ করেন ফকিররা। এই বিদ্রোহ দুটো হয়েছিল শেরপুর অঞ্চলেই।

বিজ্ঞাপন

শেরপুরের সংস্কৃতিবান্ধব জমিদার হরচন্দ্র রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৬৫ সালে গঠিত হয় ‘বিদ্যোন্নতি সভা’ নামের একটি সংগঠন। যে সংগঠন শুধু সাহিত্যই নয়, পাঠাগার বিস্তৃতি, সংস্কৃতিচর্চা ইত্যাদিতেও ভূমিকা রাখে। বিশিষ্ট পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কারের সম্পাদনায় ১৮৬৫ সালে ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। এটি ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রথম পত্রিকা। ১৮৮০ সালে হরচন্দ্র রায়চৌধুরী শেরপুরে ‘চারুযন্ত্র’ নামে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন রংপুর, ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া ছাড়া পূর্ববঙ্গে কোনো ছাপাখানা ছিল না। যশোরের ‘অমৃত প্রবাহিণী‘ নামের প্রেসযন্ত্রটি আবার ছিল কাঠের তৈরি। এ সময় বিলেত থেকে আনা অপেক্ষাকৃত আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র শেরপুরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

উনিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে ময়মনসিংহের প্রথম বিদ্যালয় স্থাপনের (১৮৫৩) সঙ্গে শেরপুরের জমিদার হরচন্দ্র মহোদয়ও একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেটিকে ১৮৮৭ সালে ‘ভিক্টোরিয়া একাডেমি’ নামকরণ করে সাধারণ হাইস্কুলে উন্নীত করা হয়—এটি এখন ‘শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমি’ নামে বালক-উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি। উনিশ শতকের মধ্যভাগে শেরপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘হেমাঙ্গ লাইব্রেরি’ বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় ছিল উল্লেখযোগ্য। পাঁচশ বছরের পুরোনো পুথি থেকে সাম্প্রতিক গ্রন্থ সবই ছিল সেখানে। তাছাড়া পাকিস্তান শাসনামল আরম্ভ হলে ১৯৪৯ সালের ‘নানকার বিদ্রোহে’ শরিক হয় শেরপুরের মানুষ এবং ১৯৫০ সালের ‘টঙ্ক প্রথাবিরোধী আন্দোলন’এ শেরপুরের গণমানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে পাকহানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছেন শেরপুরের বহু অকুতোভয় বীরসেনানীরা। নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে পাকহায়েনাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংস অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত প্রাণের আর্তনাদ সারাবিশ্ব এখন জানে। পরে এই গ্রামের নাম হয় ‘বিধবা পল্লী’। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদেও শেরপুরের মাটি রঞ্জিত হয়েছে।

শেরপুরের পূর্বদিকের ময়মনসিংহ জেলার সীমান্তবর্তী ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলা, পশ্চিমদিকের জামালপুর জেলার বকসিগঞ্জ উপজেলা এবং তার পাশের গাইবান্ধা জেলা ও কুড়িগ্রাম জেলার অনেক মানুষ আজ শেরপুরের যে-কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের কারণে শেরপুর আজ পাঁচ জেলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মিলনস্থল। উল্লিখিত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতিসাধনের কারণে শেরপুরে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় তাহলে এ অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা আলোকিত মানুষ হয়ে দেশসেবায় নিজেকে ব্রত রাখার সুযোগ পাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই ঘোষণা করেছেন, প্রতিটি উপজেলায় সরকারি স্কুল এবং প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণার আলোকে ধারাবাহিকভাবে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ এসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে বা স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে সংসদে বিল পাস হয়েছে। আমাদের প্রাণের দাবি উচ্চশিক্ষায় অনগ্রসর এই অঞ্চলে শহিদ শেখ রাসেলের নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হোক।

শেরপুরে শেখ রাসেলের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি কেন? এমন একটি জিজ্ঞাসা আসতে পারে। এ-প্রসঙ্গে বলা যায়: শেখ রাসেল ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট কালরাতে নিভে যাওয়া একটি প্রাণের নাম। নিজের কোনো অংশগ্রহণ না-থাকার পরও রাজনীতির যূপকাষ্ঠে তাঁকে জীবন দিতে হয়। তিনি নিষ্পাপ। অর্থাৎ পবিত্রতার প্রতীক। আর উচ্চশিক্ষাতো তাই, যা মানুষকে বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে পবিত্র করে তোলে। শহিদ শেখ রাসেলকে নিয়ে সমাজ বা রাজনীতির কোথাও কোনো বিতর্ক নেই। সবাই তাঁকে নিষ্পাপ ফুলের সঙ্গেই তুলনা করেন। এই বিকর্তহীন শুভ্র চরিত্রের মানুষটির নামেইতো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া যথাযথ। স্মর্তব্য, শেখ রাসেলের নামে দেশের কোথাও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেরপুরে একাধিকবার গেলেও মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতি ও জাতির পিতা বা তাঁর পরিবারের কারো নামেই শেরপুরে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। নীতিনির্ধারণী মহলের সুদৃষ্টি পেলে শেখ রাসেলের নামে শেরপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সে শুভ সূচনা হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়’ এই ঘোষণা অনুসারে বিভিন্ন আন্দোলন-বিদ্রোহের পীঠস্থান, ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধ শেরপুর জেলাতে অনতিবিলম্বে ‘শেখ রাসেল বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন করা প্রয়োজন। আশাকরি, সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

* কবি নির্মলেন্দু গুণ, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর, ড. আমিনুর রহমান সুলতান, ড. ইসলাম শফিক

শেখ রাসেল বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন গণকমিটি, ঢাকার পক্ষে

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0