বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রীয় দমন–নিপীড়নের সঙ্গে গত প্রায় এক দশক জুড়ে যুক্ত হয়েছে ভুয়া সংবাদের ঢল। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম ইচ্ছা করেই অনেক কিছু চেপে রাখত। আবার ভুয়া গালগল্পও ফেঁদে বসত। এ ধারা এখনো বিদ্যমান আছে। ভুয়া খবর প্রকাশে সম্ভবত শীর্ষে আছে ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সংবাদমাধ্যমকে ভুয়া সংবাদ ও গুজব গেলাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। চাইলেই আগের মতো এখন কোনো ঘটনাকে আড়ালে রাখা সম্ভব নয়। প্রোপাগান্ডা কঠিন সংবাদমাধ্যমের জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদমাধ্যমের জন্য অনেকটা দ্বিমুখী ধারালো তলোয়ারের মতো। সংবাদকে অধিকতর বস্তুনিষ্ঠতার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। অনেক গোপন তথ্যই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে গণমাধ্যমকর্মীরা আর প্রশ্নহীন থাকছেন না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাতাসের আগে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। অহেতুক ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে জনসাধারণকে।

মোটের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। নতুন নতুন সংবাদের জন্য পাঠক, দর্শকেরা সংবাদমাধ্যমের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে আসে। তালেবানরা কাবুল দখল শুরু করছে, এ তথ্য সংবাদমাধ্যমের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদমাধ্যমের ওপর জোরালো চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা বিভিন্ন ধরনের সংবাদ প্রকাশ করে থাকেন, এঁদের অনেকেই পেশাদার সংবাদকর্মী নন।

এই পরিস্থিতিতে পেশাদার সংবাদমাধ্যমগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন ও প্রচার করতে হচ্ছে। একটু এদিক–সেদিক হলেই হয় মামলা অথবা ভুয়া সংবাদ পরিবেশনের কলঙ্কের দাগ লেগে যেতে পারে। দেশে অনেক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেই ভুয়া সংবাদ পরিবেশন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবাদ পরিবেশনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সংবাদমাধ্যমই নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে পারছে না। আবার ভুয়া সংবাদ বাছাইয়ে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদের প্রচার ও প্রসার প্রকট আকার ধারণ করেছে। যে কারণে সঠিক ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন খুবই সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। সংবাদমাধ্যমকে অনেক বেশি পরীক্ষা–নিরীক্ষা করতে হয় সংবাদের উৎস সম্পর্কে। দেশের অনেক সংবাদমাধ্যমই যথাযথভাবে যাচাই–বাছাই না করায় ভুয়া সংবাদের ফাঁদে পড়ছে।

ঠিক এই জায়গাতেই প্রথম আলো অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। প্রথম আলোর অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। ভুলভ্রান্তিও থাকতে পারে। তবে পেশাদারত্বের জায়গায় প্রথম আলো সব সময় অবিচল ও অটল ছিল। এসব ক্ষেত্রে অন্যান্য গণমাধ্যম থেকে যোজন–যোজন এগিয়ে আছে প্রথম আলো। সবার আগে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করতে হবে। যেকোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের এটাই প্রথম ও একমাত্র লক্ষ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে সস্তা জনপ্রিয়তায় প্রথম আলো গা ভাসিয়ে দেয়নি; বরং পাঠকদের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রদান করে বহু মত ও পথের সম্মিলন ঘটিয়েছে। প্রথম আলো দেশের নানা মত, আদর্শ ও দর্শনে বিশ্বাসীদের পত্রিকায় পরিণত হয়েছে। প্রথম আলোর সংবাদ ও বিশ্লেষণগুলোতে কোনো বিষোদ্‌গার ও আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করা হয় না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির বিষোদ্‌গার, শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে রুচি–বিবর্জিত কথাবার্তা, মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের একপেশে সমালোচনা করা আমাদের গণমাধ্যমের এক বাজে বৈশিষ্ট্য। এই পথে না হেঁটে প্রথম আলো বরং পরিশীলিত ভাষা ও উদাহরণ ব্যবহার করে বিষয়বস্তুকে তুলে ধরার চেষ্টা করে।

বস্তুনিষ্ঠতার উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলার ঘটনাগুলো উল্লেখ করা যায়। ওই সময়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের পরিবেশিত সংবাদে দেখা যায়, চাঁদপুরে হামলাকারীরা এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে। কিন্তু পরে দেখা গেছে, এই সংবাদ সঠিক নয়। বোঝাই যাচ্ছে, অন্যান্য সংবাদমাধ্যম এই ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি; বরং পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে ভুল সংবাদ পরিবেশন করে। দু–একটি পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলেও ওই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। স্বভাবতই প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সংবাদ দেখিনি। ছাপা সংস্করণেও ছিল না। পরে সরেজমিন অনুসন্ধান করে প্রথম আলো সংবাদ প্রকাশ করে। প্রথম আলোর বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাউকে ধর্ষণ বা হত্যা করা হয়নি; বরং প্রথম আলো অনুসন্ধান করে ওই হামলার ইন্ধনদাতার নাম বের করে সংবাদ প্রকাশ করেছে।

এ রকম আরও অনেক উদাহরণ আছে। বিস্ময়করভাবে দেশের অনেক সংবাদমাধ্যমই এখন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে না। অনেক সংবাদমাধ্যমে তো ইনিয়ে-বিনিয়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না এমনটিও লেখা হয়েছে। প্রথম আলো ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে। এ ক্ষেত্রেও সরেজমিন প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথম আলো ধরে ধরে দেখিয়েছে, ঠিক কোন কোন জায়গায় কীভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে।

পৃথিবীতে কোনো কিছুই শতভাগ সিদ্ধ নয়। প্রথম আলোরও নানা সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা আছে। নিজস্ব নীতিও থাকতে পারে। এই নীতির সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু কখনোই অপরের মতামত উপেক্ষা করেনি প্রথম আলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক গণমাধ্যমই অনেক সংবাদই ছাপে না কিংবা প্রকাশ করতে পারে না। বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা ধরনের আইনি ঝামেলার শঙ্কা, হুমকি, ধমকি ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শতভাগ নির্ভুল সংবাদ পরিবেশনে প্রথম আলো নিজের অবস্থানে অটল আছে।

অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমেই এ ধরনের চরিত্র অনুপস্থিত। বিস্তারিত অনুসন্ধান না করে আমাদের গণমাধ্যম কেবলই চিলের পেছনে দৌড়ায়। চিল আদৌ কান নিয়েছে কি না, কান যথাস্থানে বহাল তবিয়তে আছে কি না, তার খোঁজ না নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে চিলের পিছু পিছু দৌড় শুরু করে। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই দৌড় দেয় অন্যদের বিভ্রান্ত করতে। নিঃসন্দেহে প্রথম আলো এসব বিষয়ে তাঁর অবস্থার পরিষ্কার করতে পেরেছে।

গণতান্ত্রিক অবস্থায় সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন করা আর কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময়কালে কাজ এক জিনিস নয়। গণতান্ত্রিক শাসনে সবকিছু নির্ধারিত হয় আইনের মাধ্যমে। কর্তৃত্ববাদী শাসনে কর্তৃপক্ষই শেষ কথা। এই শাসনে জনসাধারণের মতামতের কোনো অবস্থান নেই। চারদিকে দিক থেকেই টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করা হয়। প্রথম আলোও নানা ধরনের চাপের মুখে আছে। প্রথম আলোর সম্পাদকসহ একাধিক সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা চলমান। কেবল প্রথম আলোর একজন সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধেই ১১টি মামলা চলমান আছে। মামলার চাপ মাথায় নিয়ে প্রথম আলোর সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন জেলার আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

মিথ্যা, বানোয়াট বা কল্পিত সংবাদের জন্য নয়; বরং চাক্ষুষ বাস্তব ঘটনার ওপর সংবাদ পরিবেশন করে মামলার মুখে পড়েছেন প্রথম আলোর সংবাদকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের কথাও উল্লেখ করা যায়। রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে কিন্তু ভুল সংবাদ পরিবেশন বা প্রচারের অভিযোগ নেই। ওই সময় কোভিড-১৯–এর ভ্যাকসিন–সংক্রান্ত যত সংবাদ রোজিনা ইসলাম বা প্রথম আলো প্রকাশ করেছিল, সেগুলোর কোনোটিই বাতিল করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ; বরং অধিকাংশ তথ্যই পরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। অথচ ঠুনকো এক অভিযোগে রোজিনা ইসলামকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে। এখনো তাঁর পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছে। প্রথম আলো রোজিনা ইসলামের পাশে থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। আর মামলার পাহাড় দেখেই প্রথম আলোর ওপর রাষ্ট্রীয় চাপের বিষয়টি অনুধাবন করা যায়।

এসব চাপ, ভুয়া সংবাদের দৌরাত্ম্যকে এক পাশে রেখে প্রথম আলো দেশের শীর্ষ সংবাদপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুধু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশই নয়, এই প্রতিষ্ঠান থেকে ২১-২২ বছরে একঝাঁক পেশাদার সাংবাদিক তৈরি হয়েছেন। এঁরাই এখন দেশের সংবাদমাধ্যমের জগতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশে এই মুহূর্তে কমপক্ষে পাঁচজনের বেশি সম্পাদক আছেন, যাঁরা একসময় প্রথম আলোতে কাজ করেছেন। বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে প্রথম আলোর সাবেকদের সংখ্যা নেহাতই কম নয়। সংবাদ সংগ্রহ, বাছাই ও পরিবেশনায় সঠিক মাত্রার পেশাদারির কারণে দক্ষ জনবলও তৈরি করছে প্রথম আলো।

পৃথিবীতে কোনো কিছুই শতভাগ সিদ্ধ নয়। প্রথম আলোরও নানা সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা আছে। নিজস্ব নীতিও থাকতে পারে। এই নীতির সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু কখনোই অপরের মতামত উপেক্ষা করেনি প্রথম আলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক গণমাধ্যমই অনেক সংবাদই ছাপে না কিংবা প্রকাশ করতে পারে না। বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা ধরনের আইনি ঝামেলার শঙ্কা, হুমকি, ধমকি ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শতভাগ নির্ভুল সংবাদ পরিবেশনে প্রথম আলো নিজের অবস্থানে অটল আছে। প্রথম আলো গুজবে কান দেয় না। অনেকেই স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জিকির তুলে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক তোষামোদিতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছেন। প্রথম আলো নিজেদের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়নি। অনেকটা একাই স্রোতের বিপরীতে লড়ে যাচ্ছে। মনে হতে পারে, অনেকটা নিঃসঙ্গ শেরপার মতো অবস্থা। কিন্তু প্রথম আলো একা নয়, দেশ–বিদেশে প্রথম আলোর কোটি কোটি পাঠক আছেন। এই পাঠকেরাই শক্তি। ভরসার জায়গা। প্রথম আলো আরও বেশি করে পাঠকের পত্রিকায় পরিণত হবে, গণমানুষের মুখপত্র হিসেবে কাজ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা করি।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন