default-image

রাজনীতির অঙ্গনে এখন পেট্রলবোমা-সন্ত্রাসকে ছাপিয়ে উঠেছে সংলাপের দাবি। ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের’ পক্ষ থেকে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধ করা ও সংলাপের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়ায় রাজনীতির অঙ্গন সংলাপ ইস্যুতে সরগরম হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ অনুভব করছে, নাগরিক সমাজের ব্যানারে একটা নির্দল গোষ্ঠী মধ্যস্থতা করার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। দেশের এই দুঃসময়ে যখন একদল দুর্বৃত্ত পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস করে সাধারণ মানুষের প্রাণ হরণ করছে এবং সরকার তার সব বাহিনীকে ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের এই উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপ ও সংলাপ আহ্বানকারীদের তির্যক সমালোচনা করেছেন। তিনি সাম্প্রতিক কালে বিএনপি-জামায়াতেরও এত সমালোচনা করেননি, যতটা নাগরিক সমাজের করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কী কী কারণে নাগরিক সমাজের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তা আমরা জানি না। আমরা সাদাচোখে দেখছি, নাগরিক সমাজ তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অবিলম্বে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা দোষী ব্যক্তিদের আইনানুগভাবে শাস্তি দিতে বলেছে। তারা ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলেছে। তারা আরও বলেছে, বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে বর্তমানে উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকটের অবসান করতে হবে। এ ব্যাপারে তারা নিজেরা কোনো ভূমিকা পালন করার জন্য প্রস্তাব দেয়নি। তারা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে কোন কথাটি প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দ হলো, তা আমরা বুঝতে পারি না।
সরকার, আওয়ামী লীগ ও তাদের চৌদ্দ দল ছাড়া দেশের আর কোনো দল, জোট, সংগঠন, ফোরাম কি আছে, যারা সংলাপের বিরোধিতা করছে? সংলাপ হচ্ছে গণতন্ত্রের ভাষা। যেকোনো রাজনৈতিক বিবাদ দূর করতে আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। আলোচনায় বসা মানে আত্মসমর্পণ নয়। যারা আলোচনার বিরোধিতা করছে, তারা বোমা-সন্ত্রাস টিকিয়ে রাখতে চায়। আশা করি দেশের সচেতন মানুষ এই বিশেষ গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে দেবে না। জনগণ শান্তি চায়। তাই আশা করা যায় জনগণ আলোচনার পক্ষে।
হাইকোর্ট কয়েক দিন আগে হরতাল-অবরোধ ও পেট্রল-সন্ত্রাস বন্ধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করা যায় সরকার এবার সন্ত্রাস, অবরোধ ও হরতাল বন্ধে ‘কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণ করবে। এর ফলে যদি বোমা-সন্ত্রাস, অবরোধ-হরতাল বন্ধ হয়, তাহলে জনসাধারণ সরকারকে অভিনন্দন জানাবে। অবরোধ বা হরতালের ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশ সরকার কীভাবে পালন করবে, তা এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। দেশে গণতন্ত্র, সংসদ, সংবিধান ইত্যাদি বহাল রেখে হরতাল–অবরোধ বন্ধ করা সহজ কাজ হবে না। তবু হাইকোর্টের নির্দেশ বলে কথা। সরকারের আইন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয় এ ব্যাপারে একটা কৌশল বের করবেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সরকার সন্ত্রাস বন্ধে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ গ্রহণ করলে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস হয়তো বন্ধ হবে, কিন্তু তাতে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট দূর হয়ে যাবে না। নাগরিক সমাজ শুধু বর্তমান সংকট দূর করার জন্য সংলাপের প্রস্তাব করেনি। ভবিষ্যতে যাতে সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক আচরণে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য একটি জাতীয় সনদ রচনা এবং তাতে সব দল যেন একমত হতে পারে, তারও উদ্যোগ নিয়েছে। নাগরিক সমাজের কমিটি কীভাবে সংলাপের লক্ষ্যে এগোতে পারে, তার একটা খসড়া রূপরেখা এই লেখায় তুলে ধরছি। কমিটিতে অনেক যোগ্য, অভিজ্ঞ, গুণী ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা হয়তো সঠিকভাবেই তাঁদের কর্মসূচি তৈরি করছেন। তবু নানাজনের নানা চিন্তা তাঁদের সহায়ক হতে পারে।
সংলাপের প্রথম পর্ব: ১. আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বা জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার সঙ্গে পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস বন্ধের ব্যাপারে কথা বলতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে বোমা-সন্ত্রাস কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। যদি তাঁরা বোমা-সন্ত্রাসের দায়িত্ব নিতে রাজি না হন, তাহলে এর প্রতিবাদে ও অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে বিবৃতিসহ নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে পরামর্শ দিতে হবে। আওয়ামী লীগ এসব কর্মসূচি পালন করেছে। তবে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অনেকে বোমা-সন্ত্রাসে যুক্ত বলে সংবাদপত্রে নাম, ঠিকানা, প্রমাণসহ খবর বেরিয়েছে। ২. আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে বোঝাতে হবে যে বিএনপিসহ সব বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি অবাধে বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে হবে। সরকারকে এই মর্মে একটি বিবৃতি দিতে হবে যে বিএনপির সব অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে, অবাধে নির্দিষ্ট স্থানে সভা-সমাবেশ তারা করতে পারবে। প্রয়োজন হলে ডিএমপি এ ব্যাপারে কিছু শর্ত দিতে পারে, যা সব দলের প্রতি প্রযোজ্য হবে। ৩. রাজনৈতিক মামলায় আটক বিএনপির নেতা–কর্মীদের মুক্তি দিতে হবে। ৪. অবরোধ বা হরতাল থেকে পাবলিক পরীক্ষাকে অব্যাহতি দিতে হবে। ৫. রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে কতগুলো শর্তে সব প্রধান দলকে একমত হতে হবে। ৬. সংলাপ চলাকালে অবরোধ–হরতালের কর্মসূচি স্থগিত রাখতে হবে।
দ্বিতীয় পর্ব: সংলাপের প্রথম পর্ব সফল হলে দ্বিতীয় পর্বে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে প্রস্তাব দিতে হবে: ১. চলমান সংকট নিরসনের জন্য সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। ২. নাগরিক সমাজ ও সব কেন্দ্রীয় পেশাজীবী গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ৩. সংবাদপত্রে, টিভিতে প্রশ্নমালা দিয়ে ই-মেইলে, ডাকযোগে সাধারণ মানুষের মতামত নিতে হবে। এই আলাপ–আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার রাজনৈতিক দল ও জনমতের একটা প্রতিফলন পাবে। এই আলাপ-আলোচনা ও প্রশ্নমালার সম্ভাব্য এজেন্ডা কী হতে পারে? ক. ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে তাঁদের অবস্থান কী? খ. তাঁরা কি বর্তমান সরকারকে মেয়াদের বাকি সময় পর্যন্ত মেনে নিতে রাজি আছেন, নাকি ছয় মাসের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন চান? গ. নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁদের মতামত কী? (সংবিধান সংশোধন না করেও গ্রহণযোগ্য একটি পথ বের করা যায়।) ঘ. বর্তমান নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁদের মনোভাব কী?
এভাবে সরকার জনমতের একটা প্রতিফলন পাবে। এর পরের কাজ সরকারের। প্রতিনিধিত্বমূলক জনমত যদি সরকারের বর্তমান অবস্থানের পক্ষে যায়, তাহলে সরকার বিনা দ্বিধায় পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবে এবং ২০১৯ সালে নির্বাচন দেবে। যদি জনমত এর বিপরীত হয়, তাহলে সরকার তাদের নিজেদের ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে। বিদেশে জনমতের চাপে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়াও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা ও প্রশ্নমালার মাধ্যমে জনমত জরিপ ইত্যাদি খুব পেশাদারি ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে করতে হবে। বিআইডিএস ও সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে এর পরিকল্পনা, পরিচালনা ও লজিস্টিকসের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে ভিন্ন নামও প্রস্তাব করা যায়। তবে তা উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
নাগরিক সমাজের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখছি, তা ‘দিবাস্বপ্ন’ কি না, জানি না। তবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এর চেয়ে কার্যকর বিকল্প আর দেখি না। যাঁরা পুলিশ ও হাইকোর্ট দিয়ে এই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান চান, তাঁরা সাময়িক শান্তি বা স্বস্তির কথা ভাবছেন। কিন্তু আমরা বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিকভাবে দেখছি এবং এর রাজনৈতিক সমাধান চাইছি। সমাধান দেশ ও জনগণের স্বার্থেই হতে হবে।
নির্বাচন প্রশ্নে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হলে জাতীয় সনদ নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড আবার আলোচনা শুরু হবে। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্র নিশ্চিত করছে না। নির্বাচিত সরকারকে আমরা ‘নির্বাচিত স্বৈরাচার’ হিসেবেও দেখেছি। এ জন্য নির্বাচনের আগেই জাতীয় সনদে একমত হওয়া খুব জরুরি। তবে বর্তমান সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সংকট দূর করার আগে জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। সংলাপের প্রথম পর্ব সফল হলেই জাতীয় সনদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করা যাবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন