সবার প্রশ্ন: তোমার পড়াশোনা এখনো শেষ হচ্ছে না কেন?

‘পরিবারের জন্য কিছু করতে পারব কি না, জানি না। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে, তারা ভাবে, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, একদিন বিসিএস ক্যাডার হবো, ভালো কিছু করব। এখন আর গ্রামে যেতে ইচ্ছা করে না। অনেকেই বলেন, “তোমার পড়াশোনা এখনো শেষ হচ্ছে না কেন?” পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এলাকাবাসী আমার ওপর যে প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন, সেটা হয়তো আর পূরণ করা হবে না।’ হতাশাসিক্ত কণ্ঠে এমনটাই বলছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ সেশনের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী বিপুল।

বিষবাষ্পের মতো দুই বছর আগে চীনের উহান শহর থেকে পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলে করোনা মহামারি। ইতিমধ্যে কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য প্রাণ, ধ্বংস করেছে শিক্ষাজীবন। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুসারে, দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ব্যাহত হয়েছে বাংলাদেশের চার কোটি শিক্ষার্থীর গতানুগতিক জীবনধারা। বেড়েছে শিশুশ্রম, সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও আত্মহত্যা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে সেশনজট। সরকার অনলাইন শিক্ষার সুযোগ করলেও তাতে অংশ নিতে পারেনি প্রান্তিক পর্যায়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী, রয়েছে নেটওয়ার্ক ও ডিভাইসের সমস্যাও।

জানা যায়, করোনাকালে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বাংলাদেশে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৩৯ শতাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং বাকি ২২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাঁদের আত্মহুতির কারণ মূলত পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক চাপ। অকালেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এসব তরুণ প্রাণ।

বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় খুলে দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়। তবুও চাপে আছেন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। সেশনজটের কারণে পিছিয়ে পড়েছেন তাঁরা, কেউ কেউ আবার দু-একটি সেমিস্টার পরীক্ষার জন্যও পিছিয়ে আছেন। হতাশা যেন তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গীস্বরূপ। সর্বদা ভুগছেন মানসিক চাপে, পরিবারের হাল কীভাবে ধরবেন, সেই চিন্তায়।

শিক্ষার্থীদেরকে মহামারির এ অশুভ সময়ের বিষাক্ত দংশন থেকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসতে হবে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সরকার, রাষ্ট্র—সবাইকেই। দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগ পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরও উচিত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভেবে কাজ করা। সবার মা-বাবা চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন। সাময়িকভাবে মানসিক চাপ দিলেও তাঁরা আমাদেরকে হৃদয় নিংড়ে ভালোবাসেন, কখনোই চান না আমরা তাঁদেরকে ছেড়ে চলে যাই। দিন শেষে পরিবারই একমাত্র আপন। বিশ্ব আবার সুস্থ হয়ে উঠুক, সবকিছু আবার সতেজ হয়ে উঠুক।

দিলরুবা ইসলাম জিন্নাত
শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা