বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ই-কমার্স খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আমাজনের উদাহরণ টেনে বলছেন, বৈশ্বিক এই প্রতিষ্ঠান রাতারাতি অর্থ উপার্জনের চিন্তা করেনি বলেই এর প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বের ১ নম্বর ধনীর তালিকায় উঠে আসেন। মাত্র দুই দশক আগে সাধারণ এক উদ্যোক্তা ছিলেন জেফ বেজোস। কিন্তু তিনি সে সময় বুঝতে পেরেছিলেন, এমন এক সময় আসবে, যখন কম্পিউটার বা মোবাইলে এক ক্লিকেই কেনা যাবে যেকোনো কিছু। শপিং মলের জনপ্রিয়তা কমে যাবে, দোকানপাট নানা অফার দিতে বাধ্য হবে। ফলে গেছে তাঁর সেই দিব্যদৃষ্টি। এখন এক ক্লিকেই মিলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। শপিং মল বা রেস্তোরাঁর বদলে মানুষ ঘরে বসেই পছন্দের খাবার পাচ্ছে। পোশাক, গয়না, ওষুধ, খাবার, ইলেকট্রনিকসসামগ্রী, কসমেটিকস, সবজি—সবকিছুই মিলছে অনলাইনে। জীবনের প্রয়োজনে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্রমেই ই-বাণিজ্যে ঝুঁকে পড়ছে ভোক্তারা।

বাংলাদেশের ই-কমার্সের বাজার দ্রুত বিস্তার লাভ করতে শুরু করে প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকে। তিন বছর ধরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় শতভাগ। অর্থাৎ, প্রতিবছর প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে খাতটি। করোনা পরিস্থিতিতে গত বছরের মার্চে সাধারণ ছুটি শুরু হলে ই-বাণিজ্যের বেশ প্রসার ঘটে। বর্তমানে এ খাতের আকার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের মধ্যে এটি ২৫ হাজার কোটির মাইলফলকে পৌঁছাবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

দেশে বর্তমানে ৩০ হাজার অনলাইন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২টির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো ই-কমার্স খাতকে খারাপ বলা উচিত হবে না বলে অনেকেই মনে করেন। আগে দেখেছি, একটি নামী এমএলএম প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে কোনো কাজে লাগানো হয়নি। সেগুলো একটি দুষ্টচক্র ভোগদখলে রেখেছে কিন্তু গ্রাহকেরা তাঁদের পাওনা বুঝে পাননি।

অথচ আমরা দেখছি, সম্ভাবনাময় এই খাত গত কয়েক মাসে বেশ টালমাটাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বেশ কয়েকটি নামী-বেনামি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার মধ্য দিয়ে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। গ্রাহক ও মার্চেন্টের অর্থ লোপাটের কারণে বিতর্কিত একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের আইনের আওতায় নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি অবিশ্বাস্য মূল্যছাড়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করত। এ কারণে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি ছিল বলে অনেকের ধারণা।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৩০ হাজার অনলাইন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২টির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো ই-কমার্স খাতকে খারাপ বলা উচিত হবে না বলে অনেকেই মনে করেন। আগে দেখেছি, একটি নামী এমএলএম প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে কোনো কাজে লাগানো হয়নি। সেগুলো একটি দুষ্টচক্র ভোগদখলে রেখেছে কিন্তু গ্রাহকেরা তাঁদের পাওনা বুঝে পাননি। এ ক্ষেত্রেও যেন এমনটা না হয়, সে জন্য গ্রাহকদের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে বলে অনেকেরই আশা। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, অর্থ লোপাটকারীদের জেলে পাঠানো সমাধান নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেন শাস্তি পান এবং গ্রাহকেরাও যেন তাঁদের টাকা ফেরত পান, সে রকম একটি উপায় বের করা উচিত সরকারের।

দেশের ই-কমার্স খাতে আস্থা ধরে রাখতে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় কিছুদিন আগে নীতিমালা ও নির্দেশিকা জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নির্দেশিকায় প্রধানত পণ্য সরবরাহ ও টাকা ফেরত দেওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। ভিন্ন শহরে অবস্থান করলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পণ্য স্টকে না থাকলে তার জন্য কোনো পেমেন্ট গ্রহণ করা যাবে না। আগাম পরিশোধ করা টাকা পণ্য সরবরাহের পরই বিক্রেতার অ্যাকাউন্টে জমা হতে হবে। ক্রেতার অগ্রিম মূল্য পরিশোধের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পণ্যটি ডেলিভারি ম্যান বা ডেলিভারি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে তা টেলিফোন, ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানাবে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডেলিভারি ম্যান পণ্যটি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেবেন। সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য বা সেবা ডেলিভারি ম্যানের কাছে হস্তান্তর করার মতো অবস্থায় না থাকলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান পণ্যমূল্যের ১০ শতাংশের বেশি অর্থ অগ্রিম নিতে পারবে না। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, এসব নির্দেশনা শুধুই কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে।

আগেই বলেছি, অনেকেরই ধারণা, সামান্য কিছু বিতর্কিত ই-প্রতিষ্ঠানের কাণ্ডে এই খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্ডার যেমন কমছে, তেমনি অগ্রিম পেমেন্টের সংখ্যাও কমেছে। বেড়েছে ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি)। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আস্থার সংকটের কারণে এমনটা হয়েছে। এই সংকট কাটতে সময় লাগবে। ৬ মাস থেকে ১ বছর লাগবে। বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান, যাদের গ্রাহক বেশি, তাদের খুব বেশি সমস্যা না হলেও ছোটদের ওপরে এর বেশ প্রভাব পড়েছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। নতুন গ্রাহক না আসার পাশাপাশি পুরোনো গ্রাহকেরাও সরে যাচ্ছেন।

ই-কমার্স খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সার্বিকভাবে ই-কমার্সে গত কিছুদিনে ২০-২৫ শতাংশ অর্ডার কমে যাওয়ার পাশাপাশি অগ্রিম অর্ডার নিতে পারছেন না অনেকে। পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানিগুলো নগদ টাকা দিতে বেশি দেরি করছে। অন্যদিকে ক্যাশ অন ডেলিভারি বেড়ে গেছে। ফলে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সরকার যদি ই-কমার্সে কমপ্লায়েন্স ইস্যু চাপিয়ে দেয়, তাহলে ছোট উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

বর্তমানে যখন করোনার প্রকোপ কমছে, এই সময়ে ই-কমার্স খাত টেকসই মডেলের দিকে যাবে বলে আশা করেছিলেন অনেকে। কিন্তু উল্টো এখন ক্রেতাদের মনে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি একটা আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারী খুঁজতে গিয়ে বিশাল ডিসকাউন্ট মডেল তৈরি করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে বেশি ভলিউমে ব্যবসা করে দ্রুত বড় হতে চেয়েছে। কিন্তু সেটাতে তারা সাফল্য পায়নি। তারা বিশাল ডিসকাউন্ট মডেল থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এখান থেকে বের হতে পারলে মডেলটি সাসটেইন করতে পারত বলে অনেকের বিশ্বাস।

অনেকেই বলেছেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো যত দিন না ম্যানুয়াল পদ্ধতি ছেড়ে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হবে, তত দিন এই খাতে সমস্যা থেকেই যাবে। ক্রমবর্ধমান ই-কমার্স খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা ও প্রতারণা ঠেকাতে সরকার বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা নিচ্ছে বলে জানা গেছে। বলা হয়েছে, একটি নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে; পাশাপাশি ডিজিটাল প্রতারণা হলে যেন বিচার করা যায়, সে জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং মানি লন্ডারিং অ্যাক্টে কিছু সংশোধনী আনা হবে বলেও জানা গেছে। প্রতিটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনও নিতে হবে।

তবে এগুলোই সমাধানের পথ কি না, নাকি তরুণ বেকারত্ব আর সামাজিক অবক্ষয়ের এই যুগে জালিয়াতিপ্রবণতা বন্ধের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা সামাজিক সুশাসন বৃদ্ধি কিংবা নজরদারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমাজনের মতো সম্মানিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বাজারে প্রবেশের মধ্যে তার সমাধান নিহিত, তা নিয়েও অনেকে ভাবছেন।

মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন