default-image

রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। আর তাঁদের প্রণীত আইন, বিধিবিধান প্রয়োগ, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তার দায়িত্ব প্রধানত সিভিল সার্ভিসের। তাদের তদারকি ব্যবস্থা স্তরে স্তরে বিভাজিত। বিধিবিধান ও যুগবাহিত রেওয়াজ এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের কারও কাজে জন-অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ভাবমূর্তিতে দেখা দেয় সংকট। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে অন্যদের জন্য তা দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকে। ব্যবস্থাটি প্রশংসিত হয় সব মহলে।

সম্প্রতি সরকারের এরূপ কিছু পদক্ষেপ নজর কেড়েছে। অধীন কর্মচারীর সঙ্গে একজন জেলা প্রশাসকের অনৈতিক সম্পর্কের জন্য তাঁর পদাবনতি অন্যদের কঠোর বার্তা দিল। ঠিক তেমনি আরও একজন জেলা প্রশাসক ও তাঁর অধীন কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে হয়েছে ফৌজদারি মামলাও। বিচারাধীন বিষয়ে আর মন্তব্য করা হলো না। সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দুর্নীতি বা অনিয়মের মধ্যে অবস্থান করে না। সুতরাং তাদের অন্যদের মন্দ কাজের দায় নিতে যাওয়া সমীচীন নয়। কারও অন্যায় কাজে সমর্থন বা ধামাচাপা দিলে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। ভালো ব্যক্তিরাও অন্যদের সঙ্গে বিবেচিত হন বিতর্কিত ব্যক্তিদের কাতারে।

বিজ্ঞাপন

তবে এসব বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় আইনকানুন, ন্যায়নিষ্ঠা ও পরিমিতিবোধও বিবেচনায় রাখা সংগত। লঘু পাপে যেন কেউ গুরুদণ্ড না পায়, সেটাও বিবেচনায় রাখা সমীচীন। অন্যদিকে অপরাধী দমনে দৃঢ় ভূমিকার জন্য কাউকে যেন ক্ষতিকর বা অমর্যাদাকর অবস্থায় না পড়তে হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিবেচনায় রাখা আবশ্যক যে আমাদের সমাজব্যবস্থায় অন্যায়কারীরা খুবই শক্তিশালী সামাজিকভাবে।

এ প্রসঙ্গে বিশেষ কয়েকটি নজির সামনে আনা প্রয়োজন। একজন অতিরিক্ত সচিব একপর্যায়ে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে জনা ১৫ সৎ কর্মকর্তা দিলে তিনি সরকার থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবেন। এ বক্তব্যের জন্য তাঁকে ত্বরিত বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয় আট মাস আগে। করা হয় বিভাগীয় মামলাও। মামলায় তাঁকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয় ‘তিরস্কার’ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিজ্ঞজনোচিত কথা বলেননি। এটা মানানসই হয়নি তাঁর পদের দায়িত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে। মনে হয়, আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি অবাস্তব একটি বক্তব্য দেন।

তবে জানা যায়, তিনি সৎ কর্মকর্তা। সরকার কিংবা কাউকে বিব্রত করার জন্য এমনটি তিনি বলেছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আর আট মাস আছেন ওএসডি হিসেবে। আমরা সরকারিভাবে যা-ই বলি, এ ধরনের ওএসডি থাকা একটি শাস্তিও বটে। এ দেশে চাকরিজগতে এমনটাই বিবেচনা করা হয়। চাকরির শেষ প্রান্তে আছেন এই কর্মকর্তা। পদোন্নতির সম্ভাবনাও নিজ থেকেই শেষ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁকে বিভাগীয় মামলা করে তিরস্কার না করলেও চলত বলে মনে হয়। দীর্ঘদিন ওএসডিতে তিনি আছেন। হয়তোবা আরও থাকতে হবে। এর মাধ্যমেই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া যে তাঁর অসংগত ছিল, সে বার্তা দেওয়া হয়েছে। সবাই ভেবেছিল, বিষয়টি চুকে গেছে। এটা যে চোকেনি, তা দেখা গেল এ ধরনের তিরস্কারের মাধ্যমে। তাঁর ওপর অবিচার করা হয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না। তবে এটুকু বলা যাবে, বর্ণিত মৃদু শাস্তি অনাবশ্যক ছিল।

কয়েক দিন আগে উপসচিব পদে বিভিন্ন ক্যাডার থেকে তিন শতাধিক কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। তাঁদের চাকরির মেয়াদ ১২ বছরের মতো। পদোন্নতি দিতে এখন শূন্য পদের সংখ্যার বালাই নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এর সূচনা। প্রশাসন হয়ে এখন পুলিশেও চলছে। অনেক বলা ও লেখা হয়েছে এসব বিষয়ে। এ ছাড়া দেখা যায়, মেধাক্রমে ওপরে থাকা কর্মকর্তাকে টপকে নিচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে যান। আর তা হতে পারে পদোন্নতির শর্তাদি পূরণ না করলেও। সেসব নাই-বা ধরলাম। এসব দিক দিয়ে ঠিক থেকেও কেউ কেউ ছিটকে পড়েন বলে জানা যায়। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সদস্যদের প্রজ্ঞা, ন্যায়নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে আমাদের আস্থা আছে। তা-ও তো দেখি, এ ধরনের অযাচিত ঘটনা ঘটে।

সাম্প্রতিক কালে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে র‍্যাবের সঙ্গে ছয় বছর সাড়াজাগানো কাজ করে একজন তরুণ কর্মকর্তা ছিটকে পড়েছেন তালিকা থেকে। তাঁর আকস্মিক বদলির সময়ে বলা হয়, এক কর্মক্ষেত্রে তিন বছরের অধিক কাজ করার কথা নয়। তাহলে আরও তিন বছর আগে তাঁর ন্যায্য বদলি করা হলো না কেন? এই কর্মকর্তা ক্যাসিনো অভিযানসহ পুরান ঢাকার এক প্রভাবশালী সাংসদ–তনয়কে গ্রেপ্তার ও তাঁর বাসায় তল্লাশির নেতৃত্বে ছিলেন। খুবই কঠিন ছিল তাঁর কাজ। ভেজালবিরোধী অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক ডাকসাইটে লোক। হয়তো বলা হবে, পদোন্নতির জন্য আরও অনেক যোগ্যতা-অযোগ্যতা আছে। আর এসএসবির সদস্যরা দেখেশুনেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হতে পারে। জোর দিয়ে কিছু বলা যাবে না।

কিন্তু জনশ্রুতি ভিন্ন। এসএসবির সদস্যরা যেসব তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করেন, সেগুলো তাঁদের তৈরি নয়। সুতরাং ভুলভাবে পরিবেশিত তথ্যের ওপর সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। এ ধরনের জানা-অজানা আরও বিষয়াদি আছে। মাঠ প্রশাসনে ডাকসাইটে কর্মকর্তা হিসেবে দেশব্যাপী সুপরিচিত কর্মকর্তা কেউ কেউ সচিব হন না অজ্ঞাত কারণে, হলে অবদান রাখতে পারতেন। আশা করব, বিষয়গুলো ভুল হলে পুনর্বিবেচনায় সংশোধিত হবে।

বিজ্ঞাপন

শুধু সচিবালয় বা জেলা প্রশাসনে নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যদিকেও ঘটছে এ ধরনের অযাচিত ঘটনা। আমাদের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অল্প দিন কাজ করেছিলেন এক তরুণ কাস্টমস কর্মকর্তা। এর আগে তাঁর পদায়ন ছিল প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন তিনি কয়েক মাস। সেখানে এক মাসেই ২০ কেজি স্বর্ণ আর বৈদেশিক ডাক থেকে আড়াই কোটি টাকার ওষুধ উদ্ধার করেন। অল্প দিনের মধ্যেই সরে যেতে হয় তাঁকে। আর আঁতে ঘা লাগার চক্রটি কোনো ক্ষেত্রেই কম প্রভাবশালী নয়। একপর্যায়ে সফল হয়ে যায় তারা। বিতাড়িত কর্মকর্তা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন কিছু অযাচিত বিশেষণ, যেন ‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’।

সিভিল সার্ভিসে পুরস্কার সর্বক্ষেত্রে সোজা পথে আসে না। শুদ্ধাচার পদকজয়ী কেউ কেউ অল্প দিনেই হয়ে যান ভিলেন। তেমনটা হন বিপিএম-পিপিএমজয়ী ব্যক্তিদের গুটিকয়। এর অর্থ আমরা যথার্থ লোককে মূল্যায়ন করি না। গিল্টিকেই সোনা বলে চালিয়ে দিতে চাই। আর খাঁটি সোনা পড়ে থাকে ছাইয়ের স্তূপে। একপর্যায়ে নিক্ষিপ্ত হয় ভাগাড়ে। অথচ নিষ্ঠাবান ও যোগ্যদের যথোচিত মূল্যায়ন এবং বৈরী পরিস্থিতিতে সহায়তা করলে তাঁদের মনোবল আরও বাড়বে। দিতে পারবেন অধিকতর সেবাও। অপরাধী চক্র দেখবে লাল সংকেত। কিছুটা হলেও পিছু হটবে। অন্যদিকে যাঁরা সমাজবিরোধীদের প্রতি সহায়ক থাকেন, নিজেরা মনোযোগী হন ভোগ কিংবা অন্যায় ক্ষমতা প্রয়োগে, তাঁদের প্রতি হওয়া দরকার ক্ষমাহীন। সম্প্রতি এ ধরনের কিছু হয়েছে। তবে পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। পুরস্কার ও শাস্তির ক্ষেত্রে যত ন্যায়নিষ্ঠ ও সংবেদনশীল হবে, তবেই অধিকতরও গণমুখী হবে সিভিল সার্ভিস।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন