default-image

১৯ ফেব্রুয়ারির দুপুর। সচিবালয়ের ৬ নম্বর বহুতল ভবনে বাবাকোর (বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ) দপ্তর। ১৫০১ নম্বর কক্ষে নেমপ্লেট: ছামিউল বশির। নিচে লেখা বিশেষজ্ঞ। যদিও তিনি বদলি হয়ে গেছেন অনেক আগে। বহু আগে বাবাকোর নামফলক শোভা পেত, এখন নেই। সাত ঘাটের পানি খেয়ে তবে জানলাম, এটাই বাবাকোর ঘর। বিবিধ মন্ত্রণালয়ের গলি-ঘুপচির মধ্যে পাঁচখানা কক্ষ নিয়ে চলে বাবাকো। আগেই কবুল করে নিই, ভাষার মাস বলেই বাবাকোর কথা মনে পড়ল। ১৯৯৮ সালে বাবাকো এল অফিস-আদালতের সর্বস্তরে বাংলা চালু করতে। সরকারি অফিসে, অর্থাৎ প্রশাসনে বাংলার ব্যবহার হলেও গুণমানে বাড়েনি। আবার এ-ও সত্য, সরকার চালানোর বাইবেল খ্যাত রুলস অব বিজনেসে ইচ্ছে করে ইংরেজি রাখা হয়েছে। শাসনের ভাষা বাংলা। আর বিচার বিভাগ শাসনকার্যের অন্তর্গত। বাবাকোর যাবতীয় কার্যক্রমে অফিসের সঙ্গে আদালত কথাটিও আছে। অথচ উচ্চ আদালতের রায় এখনো বাংলায় লেখা হয় না।
১৯৯৯ সালের নথিমতে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে বাবাকোর লোকবল নির্বিচারে কাটছাঁট করা হয়। একজন উপসচিবের নেতৃত্বে ২৩টি পদ ছিল। ওই বছর ১১টি পদ বিলুপ্ত করা হয়েছিল। বাবাকো গঠনের এক বছর পরে এ ঘটনা ঘটে। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব।’ শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে উল্লিখিত ২৩ থেকে ১১ জনের বিলোপ, এখন সেই ১১-এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বাস্তবে শূন্য।
জনপ্রশাসনের একটি উইং পর্যন্ত নয়, একটি অধিশাখার মর্যাদা বাবাকোর। তাই এর শীর্ষ কর্মকর্তা একজন উপসচিব পদমর্যাদার। কিন্তু বহাল আছেন একজন যুগ্ম সচিব। কেউ এখানে আসতে চান না। কারণ ক্ষমতা প্রয়োগের মধু নেই। নয় মাস আগে তিন বছর ওএসডি থাকা এক বিদ্যোৎসাহী কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব পদবিধারী হয়েও উপসচিবের চেয়ারে বসেছেন। উপসচিব পদমর্যাদার একমাত্র বিশেষজ্ঞ পদটিও শূন্য। মুদ্রাক্ষরিকের দুটি পদ কবে থেকে খালি, সেটা গবেষণার বিষয়। জ্যেষ্ঠ অনুবাদ কর্মকর্তার পদে যিনি আছেন, তাঁকে নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না। বাবাকোর দপ্তরটি যেভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তাতেও এর পোড়োবাড়ি দশা পরিষ্কার। জনপ্রশাসনের মূল ভবনে বাবাকোর জায়গা হয়নি। বাবাকো কি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ রাষ্ট্রের চোখের বালি হয়ে আছে?
২০০৬ সালের ২২ মে বাবাকোর জন্য যে কাজ বণ্টন করা হয়েছে, তার বয়ান লিখতে হয়েছে ১৫টা দফায়। কাজের মস্ত ফিরিস্তি। বাস্তবে তারা বঙ্গানুবাদ নয়, সব মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো আইনকানুন প্রমিতকরণের কাজটাই করে। আইন তরজমা করা সবচেয়ে দুরূহ কাজ। অথচ ১৯৯৬ সালেও প্রতি ১ হাজার আইনি শব্দ তরজমার জন্য অর্থ বিভাগ হাস্যকরভাবে ১০০ টাকা বরাদ্দ করে রেখেছে। এটা বাস্তবে অচল হলেও এর হালনাগাদও করা হয়নি। তাই কখনো যদি আদালতের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বিষয়ে শাসকগোষ্ঠী প্রয়োজনীয়তা বোধ করে, তাহলে তা বাস্তবায়নে এই বাবাকোতে চলবে না। একে একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয়ে রূপ দিতে হবে। কিন্তু তার কোনো আলামত নেই। সুপ্রিম কোর্টের নিজের কোনো বাংলা চালুর শাখা নেই, তারই বরং বাবাকো দরকার। ১৯৫৬ সালের পর ২০১২ সালে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যখন প্রথমবারের মতো হাইকোর্ট রুলসের বাংলাদেশকরণ করলেন, তখন তা ছাপা হলো ইংরেজিতে। বাংলা তরজমার বিধান রাখা হলো বটে, কিন্তু তা কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেই। আইন কমিশনে গিয়ে তিনি ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন বাংলা করার বিরাট কাজে হাত দিয়েছেন। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধি ও দণ্ডবিধির সংসদ অনুমোদিত অনুবাদ কে কবে দেখবে, তা কারও জানা নেই।
সম্প্রতি স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজি মূলত আদালতে বাংলা প্রচলনের জন্য একটি বেসরকারি বিল জমা দিয়েছেন। ১৯৮৭ সালের আইনটিও ছিল বেসরকারি বিল। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের স্বার্থে, গণতন্ত্র সুরক্ষায় ব্যস্ত থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে কখনো সরকারিভাবে বিল আনার দরকার মনে করেনি। আর হাইকোর্ট এক রায়ে বলেছেন, ‘ওই আইন বাংলায় রায় লিখতে উচ্চ আদালতকে বাধ্য করে না।’ আইন মন্ত্রণালয় ফরাজির নতুন বিলটি বাবাকোতে পাঠিয়েছিল। বাবাকো অনাপত্তি দিয়েছে। বিলটি সংসদীয় কমিটিতে গেছে। আশা করি, এটিকে আঁতুড়ঘরে নুন খাইয়ে মারা হবে না।
ব্যক্তিগত আলাপে রুস্তম আলী ফরাজি জানালেন, ‘হাইকোর্ট ডিক্রি দিয়েছিলেন যে ’৮৭ সালের আইন সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট চাইলে ইংরেজিতেও রায় দিতে পারেন। আমি সুপ্রিম কোর্টে বাংলা চালু করতেই বিল এনেছি।’ অথচ ’৮৭ সালের আইনে ‘আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে’ লেখা আছে। গত বছরের এপ্রিলে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সাইনবোর্ড ইত্যাদি বাংলায় লেখার যে রুল জারি করেন, তাতে আদালতকেও বিবাদী করা হয়। সরকারপক্ষ একটি জবাব দাখিল করেছে। জনস্বার্থে দায়ের করা এ মামলার রুল স্থগিত হওয়ার কারণে এখনো এর রায় মেলেনি।
২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাকে বললেন, ‘বাংলা প্রচলনে ইতিহাসের প্রথম বিলে আমিই সই করেছিলাম।’ তবে তাঁর ধারণা, ওই বিলে সরকারি অফিস এবং কেবল অধস্তন আদালতে বাংলা চালু করার বিধান ছিল। হাইকোর্ট এর উদ্দেশ্য ছিল না। যদিও খোদ সংবিধান বলেছে, ‘আদালত’ অর্থ অধস্তন ও সুপ্রিম কোর্ট দুটোই। পরিহাস এই যে, ১৮৯৮ সালের সিআরপিসির ৫৫৮ ধারা ও ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭(২) ধারামতে, যথাক্রমে ফৌজদারি ও দেওয়ানি আদালতে বাংলা চালু করতে দুই ছত্রের দুটি সরকারি ঘোষণার দরকার ছিল। পাকিস্তানি শাসকেরা সেই ঘোষণা দেননি। বাংলাদেশের শাসকেরাও দেননি। আইন কমিশনে থেকে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু তা কারও কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। অবশ্য শুদ্ধতা ও মানের প্রশ্ন সত্ত্বেও নিম্ন আদালতে এখন বাংলার জয়জয়কার।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক ইন্দ্রিয়ই সজাগ। ১৯৭৯ সালে মন্ত্রিসভায় প্রথম অফিস-আদালতের সর্বস্তরে ব্যাপকভাবে ‘সাধু বাংলা ব্যবহারে’ সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৯৬ সালে তা সমর্থিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ১৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব সরকারি কাজে ব্যবহৃত সব ধরনের ফরম ও স্টেশনারি কেবল বাংলায় ছাপাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। অফিস-আদালতে বাংলা চালু করতে কয়েকবার সচিব পর্যায়ে কমিটি হয়েছে। এর মধ্যে আইনসচিবকে রাখা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার তাতে কখনো ছিলেন না। বাবাকোর পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো কিছু ইংরেজিতে মুদ্রণ করা যাবে না—এ মর্মে সরকারি মুদ্রণালয়ের ওপর একটি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। ফলে ‘ইংরেজিতে প্রণীত আইন, অধ্যাদেশ, বিধি মুদ্রণের প্রস্তাব সরকারি মুদ্রণালয়সমূহ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কথা।’
বাবাকো ম্যানুয়ালমতে, বাবাকো ‘বাংলা ভাষা ব্যবহার-সংক্রান্ত কমিটি’ ও প্রশাসনিক পরিভাষা উপকমিটিকে সার্বিক সাচিবিক সহায়তা দেবে। কিন্তু এ ধরনের কমিটি কখনো স্থায়ী কিছু নয়। বিচার বিভাগ সব সময় এর বাইরে থাকছে। অবশ্য এটাও বলা দরকার, বাবাকো সীমিত লোকবল দিয়ে ইতিমধ্যে অনেক ভালো কাজ করেছে (দেখুন, ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম আলোর প্রতিবেদন)। ১৯৮৭ সালের আইন বলেছিল, ‘এই আইনের লঙ্ঘন অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিলবিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অথচ গত ২৮ বছরে কেউ শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে জানা যায় না। কারণ,
কারও শাস্তি হয়নি। ওই আইনে বলা ছিল, ‘সরকারি গেজেট দ্বারা এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি করতে হবে।’ ২৮ বছরেও এই বিধি তৈরি হয়নি। অনুমান করি, বিধি না থাকার কারণে কারও বিরুদ্ধে কখনো অভিযোগ আনাই সম্ভব হয়নি। বাবাকো সনদ বলছে, তারা ‘অফিস-আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের সমস্যাবলি সম্পর্কে জরিপ ও মূল্যায়ন’ করবে। কিন্তু পরবর্তী আট বছরেও তারা তা করেনি। আগামী ফাল্গুনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কর্তাদের কেতাদুরস্ত লেবাস ধোপাখানায় এবং সরকারি অনুষ্ঠানমালার
বর্ণাঢ্য কর্মসূচি প্রেসে পাঠানোর আগে ওই দুটি সরকারি ঘোষণাসহ এই জরিপটি সম্পন্ন ও তার ফলাফল প্রকাশ করার আহ্বান জানাই। বাবাকো, বর্তমান সরকারের গড়া আইন কমিশন, যাকে ‘শক্তিশালী, গতিশীল এবং উদ্যোগী’ করার সুপারিশ করার পর তিন বছর কেটে গেলেও কারও টনক নড়েছে বলে মনে হয় না।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে দিয়ে শেষ করি। তিনি বলেছিলেন, ‘উভয় বাংলার মুসলমান ও হিন্দুর ঐক্য অত্যন্ত শক্তিশালী করা ও দেশভাগ–পরবর্তী সীমান্তের দুপাশে ধর্মনিরেপেক্ষতার ঝান্ডা ঊর্ধ্বে তুলে ধরাসহ উভয় বাংলার রাজনীতিতে বাংলা ভাষা সুগভীর প্রভাব ফেলেছে।’ এটা মেনে নিয়ে একটি ঘাটতির কথা যোগ করতে চাই, সেটা হলো উচ্চ আদালতের রায়। দুই বাংলার উচ্চ আদালত বাংলায় রায় লেখেননি। তাই এর প্রভাব পরিমাপ করা যাবে কীভাবে?
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন