default-image

সাম্প্রতিক কালে ব্যাংক খাত নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। ‘সব ব্যাংক ঋণ দিতে চায় না’ (প্রথম আলো, ১৮ নভেম্বর ২০২০), ‘সংকট থেকে তারল্যের বান ব্যাংক খাতে’ (বণিক বার্তা, ১৬ নভেম্বর ২০২০), ‘কাগজে-কলমে ব্যাংকের মুনাফা বাড়ছে’ (ডেইলি স্টার, ১ অক্টোবর ২০২০), ‘বড়রা পাচ্ছে, ছোটরা ঘুরছে’ (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০) ইত্যাদি। কেন এ ঘটনাগুলো ঘটছে?

অধিকাংশ আওতার বাইরে

বড় প্রতিষ্ঠাননির্ভর শিল্প ও সেবা খাতে ঘোষিত প্রণোদনা তহবিলের অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে ঋণ বিতরণের অগ্রগতি মাত্র ৩১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এনজিওর মাধ্যমে বিতরণের ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে গত ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। পোলট্রি, মৎস্য, ডেইরি, প্রাণিসম্পদ, মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষের জন্য ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ৮৪ হাজার ৯৪১ জনকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৮৯ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

চার পক্ষের গরমিল

প্রথমত, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বিভিন্ন কাগজপত্র-দলিল, জামানত বা বন্ধকের প্রয়োজন। অনানুষ্ঠানিক খাত এগুলোতে অভ্যস্ত নয়। এরা ঋণ নেয় মূলত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত এবং জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ। তা ছাড়া যেকোনো বহিস্থ অভিঘাত সহ্য করার সক্ষমতা কম। সংগত কারণেই কোভিড-১৯ অতিমারিকালে প্রণোদনা প্যাকেজের এসব খাতই সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির প্রধান লক্ষ্য হওয়ার কথা। এঁরা ঘুরে দাঁড়ালে অধিকাংশ ঘুরে দাঁড়াবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বাস্তবানুগ কৌশল প্রয়োজন ছিল।

দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে একের পর এক নীতিমালা তৈরি করে অথবা তাগিদ দিয়েও ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্য পূরণ করাতে পারছে না। বড়-ছোটনির্বিশেষে সবার জন্য ঋণের একই সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়ায় তাঁদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর উৎসাহ নেই। ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য অল্প খরচে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সর্বোচ্চ মুনাফা। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ২ হাজার প্রতিষ্ঠানকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ না দিয়ে বৃহৎ ১০টি প্রতিষ্ঠানকে একই পরিমাণ ঋণ দিলে ব্যাংকের খরচ কম হবে। ৫ শতাংশের বদলে ঘোষিত ঋণের ক্ষেত্রে সরকার ৬ শতাংশ ভর্তুকি দিলে ব্যাংকগুলোর এসব খাতে ঋণ দিতে উৎসাহের সম্ভাবনা বেশি।

তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহেও সৃজনশীলতা প্রয়োজন। ব্যাংক আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে। এ জন্য মেয়াদি বিনিয়োগকে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফিক্সড ডিপোজিট সংগ্রহে বৃহৎ বা কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যাংকগুলোর ঝোঁক। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা দর-কষাকষির মাধ্যমে সুদের হার বাড়ায়; ঝুঁকি হ্রাসে অল্প মেয়াদে আমানত রাখে। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল বাবদ খরচ বাড়ে। ঋণ প্রধানত প্রকল্প বাবদ মেয়াদি হওয়ায় ব্যাংকেরও ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এক, দুই বা তিন লাখ টাকার মেয়াদি আমানত নিয়ে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগযোগ্য তহবিল গঠন করতে পারে। ঝুঁকি অনেকের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ায় এবং বিনিয়োগযোগ্য তহবিল খরচ কমে যাওয়ায় সুদের হারও কমে যেতে পারে। অন্যদিকে জাতীয় সঞ্চয়ও বাড়বে। ফলে বিনিয়োগ বেড়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

চতুর্থত, কোভিড-১৯ থেকে উত্তরণে মূল লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে অর্থনৈতিক উৎকর্ষ সাধন। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এ কর্মযজ্ঞ সাধন সম্ভব নয়। সক্রিয় রাজস্বনীতি লাগবে। এ জন্য রাজস্বনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। নীতি-কৌশল প্রণয়নে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় ঘটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় হতে হবে।

ক্ষমতা ও গোষ্ঠীতন্ত্র

তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংক দেওয়া ঋণ আদায় না হলেও বা খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও স্থিতিপত্রে সম্ভাব্য আয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে কৃত্রিমভাবে ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে যাবে। আবার ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি (প্রভিশনিং) রাখতে হচ্ছে না বলে মুনাফা বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ সাধারণ শেয়ারমালিকদের দিতে বলেছে। কিন্তু আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব থাকায় এবং নামে-বেনামে শেয়ার থাকায় মুনাফার বড় অংশ পরিচালকেরা হাতিয়ে নিতে পারেন।

গত জুনের শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সুবিধাভোগী ঋণখেলাপি গোষ্ঠীর কাছেই উত্তরোত্তর ঋণ যাচ্ছে। সরকারের নীতি-কৌশলের ফল অধিকাংশ মানুষ পাচ্ছে না, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পাচ্ছে। গোষ্ঠীতন্ত্র জারি থাকলে ব্যাংক খাতের অবস্থা নাজুকতর হবে।

বিজ্ঞাপন

তত্ত্বেও আলোড়ন দরকার

২০০৭ সালে অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে মডার্ন মনিটারি থিওরির (এমএমটির) যাত্রা। এ ভাষ্যে, রাষ্ট্র চাইলে যত ইচ্ছা মুদ্রা বাজারে ছাড়তে পারে। বন্ডের বিপরীতে প্রচুর অর্থের জোগান দেওয়া হয়। এই অতিমারিকালেও তাই করা হচ্ছে। ঋণাত্মক সুদের হার চালু হয়েছে বা চিন্তাভাবনা চলছে। ২০০৭ সালের মন্দার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ‘কোয়ান্টিটি থিওরি অব মানি’ বা ‘অর্থের পরিমাণ তত্ত্ব’ অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অনুসরণ করছিল। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, মুদ্রা সরবরাহ বাড়ালে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে এবং অর্থের মজুত স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা বহিস্থভাবে নির্ধারিত হয়।

অতীতের ও বর্তমানের কোনো ঘরানার তত্ত্বই উন্নয়নশীল দেশের কাঠামোগত সমস্যা নিরসনে সাফল্য অর্জন করেনি। প্রথমত, অর্থের মজুত বা সরবরাহ বহিস্থ চলক নয়, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালীদের দ্বারাই ঋণপ্রবাহ নির্ধারিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অর্থের মজুত বা সরবরাহ যতই থাকুক না কেন, প্রয়োজনীয় রাজস্বনীতিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা না নিলে কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। চলমান তত্ত্বও উন্নয়নশীল বিশ্বের মৌলিক সমস্যা তথা কাঠামোগত পরিবর্তন অর্থাৎ শিল্পায়নে কতটুকু যথাযথ, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জ্ঞান সরবরাহকারী ও নজরদারি প্রতিষ্ঠান আইএমএফের নীতি-কাঠামো আগের মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক থেকে বেরিয়ে মুদ্রানীতির নতুন লক্ষ্যমাত্রা খুঁজছে।

বাংলাদেশেও নিজস্ব পরিস্থিতির উপযোগী সৃজনশীল মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করানো প্রয়োজন। তত্ত্ব, নীতি ও বাস্তবায়নে সমন্বয় করতে পারলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বৈষম্যমূলক না হয়ে আকাঙ্ক্ষিত সমতাভিত্তিক হতে পারে।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’–এর চেয়ারপারসন

rt@du.ac.bd

মন্তব্য পড়ুন 0