default-image

দিনটি ছিল ২০০৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোববার। পড়ন্ত বিকেল। এই দিনে রয়টার্সে আমার কাজের চাপ কম থাকে। কারণ, শনি ও রোববার—এই দুদিন সারা বিশ্ব যেন ঘুমিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বিশ্বব্যাপী আমাদের সহকর্মীরা এই দুদিন বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে চোখ খুলতে চান না। তাই ঢাকায় আমাদের জন্য দিনটি একটু ঢিলেঢালাভাবেই চলে। সোমবার গোটা বিশ্ব যেন জেগে ওঠে। আমরাও সকাল ১০টা বাজতেই তৎপর হই। আমাদের ঢাকা অফিসের সম্পাদকীয় সহকর্মীরা সিঙ্গাপুরের ডেস্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই আমাদের সকাল ৯টা থেকে জেগে উঠতে হয়। কারণ, সিঙ্গাপুরে তখন বেলা ১১টা। অর্থাৎ আরও দুই ঘণ্টা আগে তাদের ডেস্কটপ সচল হয়েছে।

এটা-সেটা করছি। চা খাচ্ছি। আড্ডা দিচ্ছি। গল্প করছি। এমন সময় আমার টেবিলের হালকা ক্রিম রঙের টেলিফোনটি করে বেজে উঠল। আমি আলতো হাতে রিসিভারটি তুললাম। হ্যালো বলতেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কার্লফ্রেজের ভরাট কণ্ঠ কানে এল। কার্লফ্রেজ মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের পরিচালক। আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বললেন, আমাদের নিমন্ত্রণে আরনল্ড জিটলিন খুব কম সময়ের জন্য ঢাকা এসেছেন। দুদিনের সেমিনারে কথা বলবেন। সাংবাদিকতা আর সংবাদপত্র বিষয় নিয়ে। তবে আপনি চাইলে তাঁর একান্ত সান্নিধ্য পেতে পারেন। রয়টার্সে সাক্ষাৎকার আকারে প্রকাশ করতে পারেন। আরনল্ড জিটলিনের নাম এর আগে আমি শুনেছি। ৫০ বছরের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ এই বর্ষীয়ান সাংবাদিককে একান্ত করে পাওয়ার সুযোগকে হাতছাড়া কীভাবে করি? মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপিতে ৩০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন নানা পদমর্যাদায়। ১৯৭১ সালে তিনি এপির পক্ষে বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতিতে ভারাক্রান্ত তিনি।

কার্লফ্রেজকে আমার সম্মতির কথা জানালাম। তবে শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়ে বললাম, আরনল্ড জিটলিনর সাক্ষাৎকার রয়টার্স প্রকাশ করবে কি না জানি না, কিন্তু আমার পেশাগত জীবনের ওপর কোনো না কোনোভাবে এর প্রতিফলন ঘটবে। কার্লফ্রেজ তখনই পরের দিনের জন্য সকাল ১০টার সময় বেঁধে দিলেন। তিনি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের একটি আবাসিক হোটেলে উঠেছেন মার্কিন দূতাবাসের অতিথি হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

পরের দিন ঠিক সময়ে হাজির হলাম। স্বাভাবিক আলাপচারিতার ফাঁকে হোটেলের পরিচারক চা পরিবেশন করে গেলেন। নিতান্তই ব্যক্তিগত কথাবার্তা। কিন্তু এই আলাপ তো আমার পেশাগত জীবনের কাজে আসবে না। যদিও জীবনের কোনো কিছুই ফেলনা নয়। জড়তা আর লজ্জার আবরণ তুলে ফেললাম সন্তর্পণে। তিনিও মনখুলে কথা বললেন।

বটবৃক্ষের মতো সুশীতল ছায়া দিয়ে গেলেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক আরনল্ড জিটলিন। আরনল্ড কথা বললেন বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিকের উৎকর্ষ নিয়ে। এ দেশের ইংরেজি কাগজগুলোর ভাষা কতটা সাবলীল এবং আন্তর্জাতিক মানের, সে প্রসঙ্গে বললেন, ইংরেজি আপনাদের মায়ের ভাষা নয়। তাই সে বিবেচনায় আমি বলব, এ দেশের ইংরেজি পত্রিকার মান একটা স্তরে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের নানা দেশের মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পত্রিকা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই ধরনের পাঠকের সংখ্যা মোটেও অপ্রতুল নয়। এই মাধ্যমটিতে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ নানা দেশের কাগজ পড়েন। তারা মান যাচাই করেন। তাই আজ বাংলাদেশকে কেবল নিজেদের পাঠকের কথা চিন্তা করলে হবে না। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করতে হবে। তাহলে বলা যায়, বাংলাদেশের ইংরেজি কাগজগুলোর ভাষাগত মান আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। আলোচনার ফাঁকে বললাম, আপনি তো কেবল ইংরেজি কাগজের কথাই বললেন। কিন্তু মাতৃভাষায় যেসব দৈনিক প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আপনার কোনো উপদেশ-পরামর্শ আছে কি? আরনল্ড এ প্রসঙ্গে বললেন, দুই ভাষার পত্রিকায় ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে বটে। কিন্তু পরিবেশনের কৌশল, মান, উপস্থাপনা—এগুলো তো অভিন্ন। পাঠকের কাছে পৌঁছাতে হলে, আদৃত হতে হলে এই কৌশল দুই ভাষার পত্রিকার জন্যই প্রযোজ্য।

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে সিলেটে বাংলাদেশ বিমানের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ল। কী অলৌকিকভাবে ৮৪ যাত্রীর সবাই প্রাণে রক্ষা পান। বিমানটি ছিল ফকার এফ ২৮। দিনটি ছিল ২২ ডিসেম্বর, সোমবার। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা রয়টার্স থেকে এই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এপির তুলনায় কয়েক মিনিট পিছিয়ে ছিলাম। আমাদের কয়েক মিনিট আগে তারা সংবাদ করতে সমর্থ হয়। পরের দিন ঢাকায় রয়টার্স অফিসের কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয় সিঙ্গাপুর থেকে। তৎকালীন বার্তা সম্পাদককে আমরা বললাম, ঢাকা থেকে সিলেট প্রায় ২৪১ কিলোমিটার উত্তর–পূর্ব দিকে। সড়কযোগে ৬ ঘণ্টার পথ। বার্তা সম্পাদক প্রশ্ন করলেন, কেন আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বিমান ভাড়া করে দুর্ঘটনাস্থলে গেলাম না। তখন পর্যন্ত এ ধরনের সুযোগ তৈরি হয়নি বলে জানানো হলো।

এ রকম ক্ষেত্রে আমরা যাচাই না করে রিপোর্ট ফাইল করতে পারি কি না জানতে চাইলে আরনল্ড ঘোরতর আপত্তি করে সমূহ বিপদের কথা বললেন। বললেন, একবার আমাদের এক সহযোগী প্রতিষ্ঠান এ রকম একটি সংবাদ পরিবেশন করে বিপদগ্রস্ত হয়েছিল। তারা সংবাদ পরিবেশন করে বলেছিল আফ্রিকার কোনো এক দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সফর করবেন। দেশটির নাম এখন আর মনে করতে পারছি না।

আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফর করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল দুই দেশের সরকারের তরফ থেকে। সুনির্দিষ্ট দিন ও সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানটি ওই দেশের বিমানবন্দরে অবতরণের পরপর ওই সংবাদ প্রতিষ্ঠান সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা না করে এই বলে সংবাদ পরিবেশন করে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দুদিনের সফরে কিছুক্ষণ আগে অমুক দেশে পৌঁছেছেন। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করেছি। বিমান থেকে তাঁর নামার দৃশ্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিজেদের চোখে না দেখা পর্যন্ত রিপোর্ট করিনি। এক এক করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সব সফরসঙ্গী বিমান থেকে অবতরণ করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবতরণ করেননি। তিনি শেষ মুহূর্তে এক জরুরি প্রয়োজনে তাঁর নির্ধারিত সফর স্থগিত করেন। তখন ওই সংবাদ প্রতিষ্ঠান তাদের পরিবেশিত ও প্রচারিত সব সংবাদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং পাঠকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এ ধরনের ক্ষমা চাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী পরিবেশিত ও প্রচারিত সংবাদসহ তুলে নেওয়ার ঘটনা কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার জন্য বিরল ঘটনা। কারণ, তাতে সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গ্রাহক ও পাঠকদের মনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয় এবং সংবাদ প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। সংবাদ প্রতিষ্ঠানেরও ভাবমূর্তি ধুলায় লুণ্ঠিত হয়।

কথা উঠল তথ্য-প্রমাণভিত্তিক রিপোর্ট নিয়ে। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া রিপোর্ট করা যায় কি না। কারও কথা শুনে রিপোর্ট করা সংগত কি না। এক বাক্যে আরনল্ড এর বিরোধিতা করলেন। বললেন, প্রয়োজনে আরও সময় অপেক্ষা করুন। সংবাদের যে উৎস, তার সঙ্গে কথা বলুন। বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। তথ্য-প্রমাণের জন্য ধৈর্য এবং যত্ন আপনাকে করতেই হবে। কারণ, বিশুদ্ধ খবরের বিকল্প নেই। আমি ওই সময়কার ইকোনমিক রিভিউ পত্রিকায় বাংলাদেশসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনের প্রসঙ্গটি তুললাম। কোনো তথ্য–প্রমাণ ছাড়া এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে যেভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা তাঁর কাছে তুলে ধরলাম। আরনল্ড আগ্রহ নিয়ে শুনলেন এবং মন্তব্য করে বললেন সুস্পষ্টভাবে উৎস (সোর্স) উল্লেখ ছাড়া এভাবে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তথ্য-প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে প্রতিযোগীকে কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব জানতে চাইলে আরনল্ড বললেন, সংবাদের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি সমস্যা। এই সমস্যা সব দেশে রয়েছে। বললেন, আপনি আপনার সোর্সকে ভালোবাসুন। তাকে রক্ষা করা আপনার পবিত্র দায়িত্ব। এই উপলব্ধি যদি আপনি আপনার সংবাদের উৎসর মধ্যে সম্প্রসারিত করতে পারেন, তাহলে সমস্যা সমাধান আপনার জন্য সহজ হবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে সংবাদপত্রগুলো কেমন বেতন দেয়, জানতে চাইলেন আরনল্ড। জবাব দিলাম। কয়েকটি কাগজের নাম বললাম। ভালো, বেশ ভালো। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আগের সেই দুরবস্থা নেই। অন্য পেশার তুলনায় মোটেও খারাপ নয়। প্রতিক্রিয়ায় আরনল্ড বললেন, এপিতে আমি ৩০ বছর নানা পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেছি। আমার দুই সন্তানকে বড় করেছি। তাদের লেখাপড়া আর সংসার আমার এই আয় থেকেই নির্বাহ হয়েছে। সাংবাদিকতার বাইরে আমি একটি টাকাও উপার্জন করিনি। কখনো অসুবিধায় পড়িনি। সততা বড় কথা। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে অনেক বড় অঙ্কের উপার্জন করেন আমেরিকার সাংবাদিকেরা। কিন্তু এই তুলনা ঠিক হবে না। ওই দেশের প্রেক্ষাপটেই চিন্তা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে জীবন নির্বাহ ব্যয় বেশি। যদি বড়লোক হওয়ার বাসনা থাকে, তাহলে সাংবাদিকতা নয়, অন্য পেশা বেছে নেওয়া উচিত। আমার ছেলে এখন যা আয় করে, আমি আমার জীবনে তা চোখে দেখিনি। কিন্তু সাংবাদিকতায় কাজের সন্তুষ্টি অনেক বেশি। আপনি যা লিখছেন, তার একটা সরাসরি প্রভাব পড়ছে সমাজের ওপর। সমাজ এর দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। এটা কি আপনার জন্য বড় প্রাপ্তি নয়?

আরনল্ড জিটলিন বিরোধিতা করলেন সাংবাদিককে জেলে পাঠানোর ব্যাপারে। একজন সাংবাদিকের লেখা প্রতিবেদনকে তিনি ফৌজদারি বা জেলযোগ্য অপরাধ বলে মনে করেন না। তবে তিনি বললেন, কোনো সাংবাদিক যদি নিজের স্বার্থ আদায়ের জন্য ভয় দেখিয়ে রিপোর্ট করার হুমকি দেন বা তেমন উদ্দেশ্যে রিপোর্ট করেন, তাহলে সেটা অবশ্যই জেলযোগ্য অপরাধ। আরনল্ড বললেন, সাংবাদিকের কলম যত মুক্ত হবে, সমাজ তত বেশি উপকৃত হবে। তিনি সাবধান করে দিয়ে বললেন, এই স্বাধীনতার যেন অপব্যবহার না হয়, সেদিকে আপনাদের নজর দিতে হবে। স্বাধীনতাকে মলিন করবেন না।


সিরাজুল ইসলাম কাদির রয়টার্সের সাবেক ব্যুরোপ্রধান। বর্তমানে আমেরিকান চেম্বার্স জার্নালের নির্বাহী সম্পাদক।
serajulquadir26879@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0