default-image

আজ থেকে ৩০ বছর আগে ১৯৮৯ সালের ১৯ মে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ঝাও জিয়াং তিয়েনআনমেন স্কয়ারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। ভোর পাঁচটায় সাত দিন ধরে অনশন করা লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রিয় শিক্ষার্থীরা, তোমাদের কাছে আমাদের আসতে অনেক বিলম্ব হয়েছে। আমি দুঃখিত। দুঃখিত। তোমরা আমাদের যে সমালোচনা করেছ, তা আমাদের আসলেই প্রাপ্য ছিল।’ 

ঝাও জিয়াং জানতেন, তাঁর দেশের প্রধান নেতা তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেনাবাহিনী ঢুকিয়ে নির্বিচার হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। সেই রক্তক্ষয়ী অবস্থা থেকে বিক্ষোভকারী তরুণদের বাঁচানোর জন্য তিনি বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের অনশন ভাঙার জন্য কাতর আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের মতো তরুণ বয়সীদের আবেগ আমরা বুঝি। তোমাদের মতো বয়সে আমরাও বিক্ষোভ করেছিলাম এবং পরিণতি না ভেবেই রেললাইনে বুক পেতে দিয়েছিলাম। তোমাদের সেই অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হয়েই বলছি, তোমাদের সমস্যা নিয়ে আমরা বিশদ আলোচনা করব। তোমরা ঘরে ফিরে যাও।’ 

ঝাও জিয়াংয়ের এই বক্তৃতার পরদিনই সামরিক আইন জারি করা হয় এবং ঝাওকে গৃহবন্দী করা হয়। এর ১৫ দিন পর সেনাবাহিনী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে গণহত্যা চালায়। 

২০০৫ সালে ঝাও জিয়াং মারা যান। তাঁর শবদেহের সঙ্গে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের অর্জনকেও চীন সরকার কবর দিয়ে দিয়েছে। সরকারি সব নথিপত্র থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলা হয়েছে এবং কাগজপত্রে যুক্ত ছবিও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। 

বাক্স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের আদলে ব্যক্তিস্বাধীনতার দাবিতে ১৯৮৯ সালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে শুধু ছাত্রছাত্রী জড়ো হয়েছিল, তা নয়। বিক্ষোভের শুরুটা তারা করলেও পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তাঁদের মা-বাবা, দাদা-দাদি, স্কুল-কলেজের শিক্ষক থেকে কারখানার শ্রমিকেরা পর্যন্ত। বেইজিংয়ের সাধারণ মানুষ বিক্ষোভকারীদের খাবার রেঁধে খাইয়েছেন। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন সেখানে সেনাবাহিনী ঢোকার আগে ৩ জুন দিবাগত রাতে লিউ জিয়াওবো এবং আরও তিনজন বুদ্ধিজীবী নিজেদের জীবন বিপন্ন করে শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদে চত্বর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, তার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেনদরবার করে বহু শিক্ষার্থীকে বাঁচিয়ে দিতে পেরেছিলেন। এই সময় লিউ সরকারকে তার সংবিধানের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই লিউ কারাবন্দী থাকা অবস্থায় ২০১০ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান এবং সুদীর্ঘ দিন কারাগারে থাকার কারণে লিভার সিরোসিসে ভোগার পর ২০১৭ সালে তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় এবং এর সপ্তাহ দুয়েক পর তিনি মারা যান। 

এখন ১৯৮৯ সাল নয় এবং হংকংও বেইজিং নয়। তারপরও হংকংয়ে বিক্ষোভ করা শিক্ষার্থীরা এখন ঠিক তিয়েনআনমেনের শিক্ষার্থীদের মতোই চীনের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে রয়েছে। হংকংয়ের বেইজিংপন্থী রাজনীতিকেরা দায়িত্বজ্ঞানহীনদের মতো বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তুলনা করছেন। হংকংয়ের তরুণেরা তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে এখন রাস্তায় নেমেছেন। তাঁরা চীনের প্রভাব থেকে দেশকে বের করে আনতে চান। নিজেদের অর্থনৈতিক অধিকারে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ বরদাশত করতে চান না। আর এই দাবি তোলার মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের জীবনকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। 

হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের বুঝতে হবে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাঁদের পক্ষে দাবি আদায় সম্ভব হবে না। তাঁরা মনে করছেন, চীন যদি রাজনৈতিকভাবে হংকংকে মুক্ত করে দেয়, তাহলে তা চীন এবং হংকং উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। তবে চীন তাঁদের সেই দাবির মধ্যে বিদেশিদের উসকানি খুঁজে পাচ্ছে। চীন মনে করছে, হংকংয়ের এই বিক্ষোভ দমন করতে না পারলে তা দেশটির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। হংকংয়ের কয়েক মাইলের মধ্যে শতাধিক ট্যাংক ও সমরাস্ত্রবাহী যান নিয়ে সেনাবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। 

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। হংকংয়ের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলতে ছাত্রদের উসকানি দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। আবার শিক্ষার্থীদের দাবি যে অযৌক্তিক নয়, তা-ও চীন সরকারকে তাদের বোঝাতে হবে। ১৯৯৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী হংকংয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা যে চীনের হাতে, সে বিষয়ও আন্দোলনকারীদের মাথায় রাখতে হবে। যেহেতু চীনের সামরিক শক্তি অনেক বেশি, সেহেতু আন্দোলনকারীদের একতাবদ্ধ থেকে অহিংস উপায়ে চীনকে চাপে রাখতে হবে। আন্দোলন থেকে এখনই দাবি পূরণ সম্ভব হবে, এমনটি মনে না করে এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে এগোতে হবে। 

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত

মেডেলিন থিয়েন ব্রুকলিন কলেজের সাহিত্যের শিক্ষক ও লেখক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0