বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিতর্ক ও বিতর্ক–পরবর্তী আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়: ১৯৭১-৭২ সালে যদি এমন একটি ঘটনা ঘটত, কেউ যদি হিন্দুদের পূজামণ্ডপে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন রেখে আসত, তাহলে কি এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ও সহিংসতা ঘটত? আলোচনা শেষে উপস্থিত সবাই একমত হন যে গত ১৩ অক্টোবরের কুমিল্লার ঘটনার পর সারা দেশের বেশ কিছু এলাকায় যেসব ন্যক্কারজনক সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তার কিছুই ১৯৭১ সালে ঘটত না, কারণ সদ্য সৃষ্ট বাংলাদেশের আপামর জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন গণতন্ত্র তথা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং সমাজতন্ত্র তথা সামাজিক ন্যায়বিচারের পাশাপাশি তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতার দীক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন। আর সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতার মানসিকতা যে সমাজে বিরাজ করে, সে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক পরিচিতির কোনো সুযোগ ও স্থান থাকে না।

পাকিস্তান আমলে শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসরেরা জনগণের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর বহু চেষ্টা করেছে। এমনকি রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ করার অপচেষ্টায়ও তারা লিপ্ত হয়েছিল, যাতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। বস্তুত বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় যত তারা বাধা দিয়েছে, তত বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা জনগণের মধ্যে আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং নিজের প্রাণের বিনিময়ে একে অপরকে রক্ষা করেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের অনেক অপচেষ্টা সত্ত্বেও এবং ইসলামকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার সংস্কৃতি বহুদিন অটুট ছিল। বিভিন্ন সময় আমরা দেখেছি রাজনীতিবিদেরাই কখনো কখনো দলমত-নির্বিশেষে সংঘবদ্ধভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করেছেন। আর সম্মিলিত এসব প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল তত দিন, যত দিন আমাদের রাজনীতিবিদেরা ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের স্বার্থে এবং কল্যাণে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। ক্ষুদ্র স্বার্থে কোনো অপকর্মে লিপ্ত হতে এখন আর তাঁদের বিবেকে বাধে না।

বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং পরবর্তী আলোচনা থেকে আরও বেরিয়ে আসে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক অবক্ষয় ঘটেছে, যার পরিণতিতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ক্রমাগতভাবে সমাজে বিস্তার লাভ করে। একটি অবক্ষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি—অতীতে যেসব সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটেছে, তার কোনোটিরই বিচার হয়নি। ২০০১ সালের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, রামুর ঘটনা, নাসিরনগরের তাণ্ডব—এগুলোর হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। আরেকটি অবক্ষয় হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার এবং ধর্মাশ্রয়ী দল ও গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর দোষারোপের রাজনীতির ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ আমরা লক্ষ করেছি সাম্প্রতিক সময়ে। গত ১৩ অক্টোবরের কুমিল্লার তাণ্ডবের শুরু থেকেই, কোনো রূপ তদন্তের আগেই এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিএনপি আওয়ামী লীগকে এবং আওয়ামী লীগ বিএনপিকে দোষারোপ করতে শুরু করে। আর এমন অপরাজনীতির কারণে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিরা আড়ালে থেকে যায় এবং তাদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনী আঁতাত। আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ২০০৬ সালের আওয়ামী লীগ ও খেলাফত মজলিসের মধ্যকার চুক্তি, যে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ব্লাসফেমি আইন প্রণীত হতো, আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হতো এবং আরও অনেক মৌলবাদী অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়িত হতো। সৌভাগ্যবশত প্রবল প্রতিবাদের মুখে চুক্তিটি বাতিল করতে আওয়ামী লীগ বাধ্য হয়। এ ছাড়া গত কয়েক দশকে আমাদের রাজনীতিবিদেরা ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠীর কাছে ক্রমাগতভাবে নতজানু হয়েছেন এবং তাঁদের নানা অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন, স্কুলের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন যার অন্যতম উদাহরণ। উপরন্তু মূলত সরকারি বিধিনিষেধের কারণে সারা দেশে ধর্মীয় জলসার ক্রমান্বয়ে বিস্তার ঘটেছে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে।

আরেকটি অবক্ষয় হলো আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর দোষারোপের রাজনীতি, যার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ আমরা লক্ষ করেছি সাম্প্রতিক সময়ে। গত ১৩ অক্টোবরের কুমিল্লার তাণ্ডবের শুরু থেকেই, কোনো রূপ তদন্তের আগেই এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই বিএনপি আওয়ামী লীগকে এবং আওয়ামী লীগ বিএনপিকে দোষারোপ করতে শুরু করে। আর এমন অপরাজনীতির কারণে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিরা আড়ালে থেকে যায় এবং তাদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

প্রসঙ্গত, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী আমাদের প্রধান দুটি দলের নেতা-কর্মীরাও সাম্প্রতিক এ তাণ্ডবের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং অনেক তরুণ ছিল এর অগ্রভাগে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এবং ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী অনেক এলাকায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূজামণ্ডপের পাহারায় ছিল না এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্যার্থে দ্রুত এগিয়েও আসেনি, যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই শর্ষের মধ্যেই ভূত আছে বলে অনেকের ধারণা।

বিতর্ক ও বিতর্ক–পরবর্তী আলোচনায় এটি সুস্পষ্ট হয়েছে, উপরিউক্ত কারণেই ক্রমাগতভাবে ধর্মাশ্রয়ী, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদের বীজ আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পেছনে আরেকটি কারণ হলো বিশ্বব্যাপী ক্রমাগত ধর্মাশ্রয়িতার বিস্তার, যা সব দেশের ও সব ধর্মাবলম্বীর মধ্যেই ঘটেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের ঘটনাবলিও বাংলাদেশের জনমনে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সৃষ্টিতে ইন্ধন জুগিয়েছে। এসবের ফলে পুরো সমাজ আজ বিস্ফোরণোন্মুখ এক বারুদের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে, যার উৎস হলো দল-মত-পেশা-নারী-পুরুষ-বয়সনির্বিশেষে আমাদের জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের মধ্যে ক্রমাগতভাবে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা, অসহনশীলতা ও ঘৃণার মানসিকতা।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখে দেওয়ার মাধ্যমে কোনো এক স্বার্থান্বেষী মহল একটি জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি এ বারুদের স্তূপের ওপর ছুড়ে দিয়েছে, যা থেকে আগুনের শিখা দেশের অনেক এলাকায়ই ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ঘরে আজ যে আগুন লেগেছে, তার পেছনে রয়েছে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতার বিস্তার ও স্বার্থপরতার রাজনীতি। এরই সুযোগ নিয়েছে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল, যার সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যা বেরিয়ে আসতে হবে।

বিতর্ক ও বিতর্ক–পরবর্তী আলোচনা থেকে উপস্থিত সবার মধ্যে যে বিষয় সুস্পষ্ট হয়েছে, তা হলো কুমিল্লার সহিংসতা এবং এর বিস্তার জাতি হিসেবে আজ আমাদের জন্য জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও আজ যদি আমরা জেগে না উঠি এবং সমাজের সব শুভ শক্তিকে একত্র করে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং উচ্ছন্নে যাওয়া তরুণদের রক্ষা করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে এর জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে। কারণ, আমাদের পুরো জাতি যে বারুদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, ভবিষ্যতে যেকোনো দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আবারও জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি—এমনকি একের পর এক অসংখ্য জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি—এর ওপর ছুড়ে দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব না–ও হতে পারে। দুই বছর পরের অপেক্ষমাণ জাতীয় নির্বাচন এবং তা নিয়ে ভয়াবহ বিরোধ এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে আমাদের আশঙ্কা।

  • বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন