বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০১৪ সালের পর থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে গোটা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনার তাঁর নিজের ‘বাড়িতে’, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’ আশা করছেন। এই থেকে যদি কেউ ধরে নেন যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা জাতীয় বিষয়ে উৎসাহী নন, নিজের এলাকা নিয়েই ব্যস্ত, তাহলে কি ভুল বলা হবে?

নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানমের এই কথার সূত্রে পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার দরকার হলো কেন? দরকার হলো এই কারণে যে এই নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে বাকি কয়েক মাস—২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কমিশনের মেয়াদ। এই কমিশন গঠনের ইতিহাস যাঁদের জানা আছে, তাঁরা নিশ্চয় মনে করতে পারবেন কীভাবে এই কমিশন গঠিত হয়েছিল। ইতিমধ্যে আবার সেই একই প্রক্রিয়ায় কমিশন গঠনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে এই কমিশন সদস্যদের খুঁজে পেয়েছিলেন। ২০১২ সালেও একই প্রক্রিয়ায় কমিশন নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচন কমিশন নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের কোনো বিধান নেই। যে বিধান আছে, তা ৫০ বছরেও মানা হয়নি—তা হচ্ছে একটি আইন করা।

২০১৪ সালের পর থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে গোটা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনার তাঁর নিজের ‘বাড়িতে’, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’ আশা করছেন। এই থেকে যদি কেউ ধরে নেন যে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা জাতীয় বিষয়ে উৎসাহী নন, নিজের এলাকা নিয়েই ব্যস্ত, তাহলে কি ভুল বলা হবে?

তারপরও বলা হয়ে থাকে যে সার্চ কমিটি গঠন এক ঐতিহাসিক ব্যাপার। যাঁরা এই সার্চ কমিটিতে ছিলেন, তাঁরা কী বিবেচনায় তাঁদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, কী মাপকাঠি বা যোগ্যতা বিচার করেছিলেন, তার কিছুই নাগরিকেরা জানেন না। বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যম তা অনুসন্ধান করেছে বলেও জানা যায়নি। যদি একটি আইন তৈরি করা হতো, তবে কমিশনের সদস্য হওয়ার যোগ্যতাও জানা যেত। তেমন ইচ্ছা এই সরকারের নেই, কোনো সরকারেরই ছিল না। ক্ষমতাসীনেরা এখন অবশ্যই বিরোধীদের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারেন—ওনারাও করেননি, আমরাও করব না। কিন্তু আগে সংবিধানে একটা ব্যবস্থা ছিল, যা কার্যত রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। সেই অবস্থার অবসান হয়েছে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। গত দুই দফার কমিশন কীভাবে তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে বড় ব্যাপার কী ভূমিকা পালন করেছে। আস্থা বা বিশ্বাস রাখার মতো কিছু তাঁরা করেছেন, এমন দাবি তাঁরাও করবেন বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন কি আইনিভাবে যা করতে পারে, তা করতে আগ্রহী বা উৎসাহী হয়? গত ১০ বছরের ইতিহাস তা বলে না। ফলে ইতিমধ্যে যখন নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বলা হচ্ছে এবং কমিশন গঠনের সময় ঘনিয়ে আসছে, তখন বিবেচনা করা দরকার, আসলেই ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া’র জন্য কী করা দরকার। নির্বাচনী ব্যবস্থা চূর্ণ করার কাজটা হাতেনাতে নির্বাচন কমিশন করলেও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই পঞ্চদশ সংশোধনীর ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইচ্ছা থাকাটাই যথেষ্ট নয়। কেননা, নির্বাচন রাজনীতির অংশ, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির অনুপস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা শুধুই বাক্যবিস্তার। কথা বলার অধিকার সংকুচিত করে নির্বাচন বিষয়ে যতই বলা হোক, তা কারও মনে আস্থা সৃষ্টি করবে না।

এসব কারণেই প্রশ্ন হচ্ছে, নিজ নিজ বাড়িতে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন না হয় সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হলো, কিন্তু ‘সারা দেশের প্রশ্নবিদ্ধ’ নির্বাচনের কী হবে? ইতিমধ্যে দুটি নির্বাচন কমিশনের ঐতিহ্য অনুসরণ করে ভবিষ্যতেও কি নির্বাচন কমিশন এই ধরনের ‘নির্বাচনের’ আয়োজন করবে, যা তাদের ভাষায় ‘প্রশ্নবিদ্ধ’? এর অন্যথা হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন