default-image

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত মূলধারার শিক্ষা সম্পর্কে আলোচনায় মনে রাখা প্রয়োজন যে এর প্রবর্তন করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা। নানা পরিবর্তন-বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তা আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে। ১৯২১ সালে স্থাপিত বোর্ড অব ইন্টারমিডিয়েট অ্যান্ড সেকেন্ডারি এডুকেশন, ঢাকা প্রবর্তিত ১৯৩৩ সালের শিক্ষাক্রমে ছয়টি আবশ্যিক (ইংরেজি-২০০ ও বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস, ধর্মীয় শিক্ষায় ১০০ নম্বর করে) এবং একটি ঐচ্ছিক বিষয় মিলে ৭০০ নম্বরের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা নেওয়া হতো। তখন হাইস্কুল এক্সামিনেশন অনুষ্ঠিত হতো। দেশ ভাগের পর ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। ১৯৫০ সালে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে সামান্য পরিবর্তন করা 
হয়। এ সময় বাংলায় নম্বর বাড়িয়ে ২০০ নম্বর এবং ধর্মীয় ভাষা হিসেবে ১০০ নম্বরের একটি নতুন বিষয় আবশ্যিক করা হয়। এর
ফলে বিষয়ের সংখ্যা সাত এবং মোট নম্বর বেড়ে হয় ৯০০।
১৯৬০ দশকের আগে মাধ্যমিক শিক্ষায় কোনো শাখা বিভক্তি ছিল না। মাধ্যমিক শিক্ষা ছিল একমুখী। বড় রকমের পরিবর্তন করা হয় ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে। তার ভিত্তিতে কারিকুলাম কমিটির ১৯৬০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রথম প্রবর্তন করা হয় কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্পকলা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ নামে ছয়টি বিভাগ বা গ্রুপ। ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কলা ও বিজ্ঞান বিভাগের জন্য আটটি বিষয়ে ছিল মোট এক হাজার নম্বর। আর অন্যান্য বিভাগের জন্য এক হাজার ১০০ নম্বর।
স্বাধীনতার পর আমূল পরিবর্তন করা হলো মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ১৯৮৫ সাল থেকে ছয় বিভাগ অবলুপ্ত হলো। প্রবর্তিত হলো দ্বিমুখী (মানবিক ও বিজ্ঞান) শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি। বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও ভূগোল এই চারটি আবশ্যিক বিষয়; তার সঙ্গে যুক্ত হলো দুটি গুচ্ছে ভাগ করা নৈর্বাচনিক বিষয়সমূহ থেকে তিন বিষয়। তাতে মোট বিষয় হলো সাত এবং নম্বর এক হাজার। ১৯৯১ সালে আবশ্যিক বিষয় হিসেবে যুক্ত হয় ধর্মশিক্ষা। তবে দ্বিতীয় গুচ্ছ থেকে মাত্র একটি নৈর্বাচনিক বিষয় নিয়ে মোট নম্বর এক হাজারই রাখা হলো। ১৯৯৬ সালের শিক্ষাক্রমে ছেলেদের জন্য ১০০ নম্বরের কৃষিশিক্ষা আবশ্যিক করা হলো। তবে মেয়েদের জন্য কৃষিশিক্ষা অথবা গার্হস্থ্যবিজ্ঞান নেওয়ার সুযোগ থাকল। ফলে ছয় আবশ্যিক বিষয়ে নম্বর হলো ৮০০ কিন্তু মোট নম্বর এক হাজার। নৈর্বাচনিক বিষয় আগের মতো থাকলেও অতিরিক্ত ১০০ নম্বরের একটি ঐচ্ছিক বিষয় পড়ার সুযোগ দেওয়া হলো সবাইকে। শর্ত হলো, প্রাপ্ত নম্বরের মধ্যে ৪০ নম্বর বাদ দিয়ে ফল নির্ধারণ করা হবে।
১৯৯৫ সালে প্রকাশিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি ব্যবসায় শিক্ষা নামে নতুন একটি শাখা প্রবর্তিত হয়। ফলে মাধ্যমিক স্তরে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা নামে তিনটি শাখা চালু হলো। এই শিক্ষাক্রম কিছু সংশোধন করে ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় মাধ্যমিক পরীক্ষা। ১৯৯৯ সালে আরও একটু সংশোধন করা হলো। ২০০২ সালে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার জন্য ২০০ করে, তার সঙ্গে গণিত, ধর্মীয় শিক্ষায় ১০০ নম্বর করে মোট ৬০০ নম্বর আবশ্যিক। বিজ্ঞান শাখায় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞান/উচ্চতর গণিতে ১০০ নম্বর করে আরও ৩০০ নম্বর। মানবিক বিভাগে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি/পৌরনীতিতে ১০০ নম্বর করে ৩০০ নম্বর; অনুরূপভাবে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ব্যবসায় পরিচিতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় উদ্যোগ/বাণিজ্যিক ভূগোলে ১০০ নম্বর করে ৩০০ নম্বর। অর্থাৎ তিন শাখাতেই আবশ্যিক চার ও নৈর্বাচনিক তিন বিষয় মিলে মোট ৯০০ নম্বর। সঙ্গে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ নম্বরের সাধারণ বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ নম্বরের সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ আবশ্যিক করা হলো। অর্থাৎ সব গ্রুপের জন্য সর্বমোট নম্বর এক হাজার। অতিরিক্ত বিষয় নিলে মোট নম্বর এক হাজার ১০০। অতিরিক্ত বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর থেকে ৪০ নম্বর বাদ দিয়ে ফল নির্ধারণ করার বিধান বহাল থাকল।
২০১৪ সালের পাঠ্যসূচি অনুযায়ী বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ করে এবং ১. গণিত, ২. ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, ৩. শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলায় ১০০ নম্বর করে মোট ৭০০ নম্বরের আবশ্যিক বিষয় হিসেবে সবাইকে পড়তে হবে। সঙ্গে বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য ১. পদার্থবিজ্ঞান, ২. রসায়ন, ৩. জীববিজ্ঞান/গণিত এবং ৪. বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়ে ১০০ করে মোট ৪০০ অবশ্যপাঠ্য করা হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় পড়তে হবে ১. ব্যবসায় উদ্যোগ, ২. হিসাববিজ্ঞান, ৩. ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং এবং ৪. বিজ্ঞান। মানবিক শাখার শিক্ষার্থীদের জন্য ১. বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা, ২. ভূগোল ও পরিবেশ, ৩. অর্থনীতি/পৌরনীতি ও নাগরিকতা এবং ৪. ভূগোল। প্রতিটি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে। তিন শাখার শিক্ষার্থীরাই এর সঙ্গে একগুচ্ছ ঐচ্ছিক বিষয় থেকে ১০০ নম্বরের যেকোনো একটি অতিরিক্ত বিষয় নেওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ ২০১৬ সালের পরীক্ষার্থীর অতিরিক্ত বিষয়সহ মোট নম্বর হবে ১ হাজার ২০০।
২০১৫ সাল থেকে নবম শ্রেণিতে যুক্ত হবে (ক) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং (খ) ক্যারিয়ার শিক্ষায় ৫০ নম্বর করে আরও ১০০ নম্বর। অর্থাৎ, ২০১৭ সাল থেকে একজন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীকে ১ হাজার ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতেই হবে। আর অতিরিক্ত বিষয়সহ মোট নম্বর হবে ১ হাজার ৩০০।
লক্ষণীয়, মানবিক শাখার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা এবং বিজ্ঞান শাখার জন্য বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় আবশ্যিক করা হলেও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় তা পড়া যাবে কেবল ঐচ্ছিক অর্থাৎ অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে। আবার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ব্যবসায় উদ্যোগ। কেন? তার জবাব নেই।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ প্রথমেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বিধৃত সংশ্লিষ্ট নির্দেশনাসমূহ ও জাতিসংঘ শিশু অধিকার বিবেচনায় রেখে মানবতার বিকাশ এবং জনমুখী উন্নয়ন ও প্রগতিতে নেতৃত্বদানের উপযোগী মননশীল, যুক্তিবাদী, নীতিমান, নিজের ও অন্যের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক ও কর্মকুশল নাগরিক গড়ে তোলা শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।’ এই শিক্ষানীতিতে তাই বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দেশ-কালের চাহিদা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণীত হয়। যুগের দাবি মেটাতে না পারলে সে শিক্ষা মানুষের কাজে লাগে না। বোঝা যাচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বায়নের এই যুগে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে।
শিক্ষা বিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষার্থীর বয়স, রুচি ও সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়েই শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণীত হওয়া উচিত। নতুন এই পাঠ্যসূচি প্রণয়নে আমরা কি তা মনে রেখেছি? বহুমুখী শাখায় বিভক্ত করে আমরা ২০১৭ সাল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা নিতে যাচ্ছি এক হাজার ২০০ + ১০০ নম্বরের। এই স্তরে বিধান অনুযায়ী, শিক্ষার্থীর বয়স থাকে ১৪-২০ বছর। তবে সাধারণত অধিকাংশেরই বয়স থাকে ১৫-১৭ বছরের মধ্যে।
যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে সিলেবাসের বোঝা কমাতে বারবার তাগিদ দিচ্ছেন, সেখানে কেন বোঝা বাড়ানো হচ্ছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন প্রফেসর মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন এই সিলেবাসের চাপ বেশি বলেই মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, আমাদের কিশোর শিক্ষার্থীরা বই এবং সিলেবাসের চাপে আরও বেশি কোচিংনির্ভর হয়ে পড়তে পারে। তিনি বলেন, মাধ্যমিক স্তরে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে ব্যবসায় উদ্যোগ, ব্যাংকিং, ফিন্যান্স পড়ানো কতটা যুক্তিযুক্ত তাও ভেবে দেখা দরকার।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা (সূচিপত্র, ঢাকা), এনসিটিবি ওয়েবসাইট
আমিরুল আলম খান, শিক্ষাবিদ।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন