default-image

খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের (নদীর নামে ইউনিয়নের নাম) শেষ জনপদ কালাবগি। দুই পাশে দুই নদী। পশ্চিমে শিবসা, পুবে সুতারখালী। যেকোনো একটা নদী পার হলেই সুন্দরবনের নলিয়ান রেঞ্জ। শিবসা তীরের পশ্চিমপাড়া নামের লোকালয়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্বে তাকালে চোখে পড়ে শয়ে শয়ে ঝুলন্ত ঘর; গায়ে গায়ে লাগানো। বাঁশের খুঁটির ওপরে মাচা পেতে বানানো হয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই। জোয়ারের পানিতে প্রায়ই ভিজে যায় ঘরের পাটাতন বা মাচা। পাড়াটির অবস্থান আর ঘরের ধরনের জন্য এ পাড়ার নাম হয়েছে ঝুলন্তপাড়া। কেউ বলেন ‘ঝুলনপাড়া’, কালাবগির ঝুলনপাড়া। মূল রাস্তা থেকে পাড়ার দিকে রাস্তা থাকলেও তা দিয়ে যাতায়াতের উপায় নেই। নদীভাঙনে সবকিছু হারিয়ে এই মানুষগুলোর এখন ঠাঁই হয়েছে ঝুলন্ত বাড়িতে। নদীর কূল ঘেঁষে কালাবগির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এঁকেবেঁকে চলে গেছে সরু কাঁচা পায়ে চলার রাস্তা। এপারে কালাবগি গ্রাম, ওপারে সুন্দরবন। মাঝখানে হয় শিবসা, না হয় ভদ্রার পুত সুতারখালী।

শিবসা আর সুতারখালী নদীতে মাছ ধরে আর সুন্দরবনে এটা–ওটা করে তাঁদের দিন চলত। ঘূর্ণিঝড় আইলায় (২০০৯) দাকোপের ৯ ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল সুতারখালী আর কামারখোলা। আইলার পর সুতারখালীতে কাজ করতে গিয়ে কালাবগির ঝুলনপাড়ার পরান, জোসনা, সুচরণ, বাবলুর মা, গোবিন্দ কাকাদের সঙ্গে আলাপ হয়। ঝড়, জোয়ারে পানি থইথই, ভাটায় প্যাচপেচে কাদায় কেন থাকেন তাঁরা? আমাদের এসব প্রশ্ন তাঁদের কাছে বোকা বোকা প্রশ্ন বলে মনে হয়েছিল। জোসনার জেঠি সেই কষ্টেও একগাল হেসে জবাব দিয়েছিলেন, পেট বড় বালাই, কেউ এখানে হাউসে থাকে না। খাবার মেলে এখানে। জেঠি জীবিকার কথা বলেছিলেন। তাহলে কী এমন ঘটেছে যে এই মানুষগুলো তাদের জীবিকা ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবছে?

আইলার পর বহুবার সুতারখালী ইউনিয়নের নাম সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তবে সুতারখালী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আইলার পরে যে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছিল, সেটিও ভেঙেচুরে একাকার হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সুতারখালী ইউনিয়নের চারদিকে আবার যে নতুন বাঁধ হয়েছে, তার বাইরে থেকে গেছে কালাবগির ঝুলনপাড়ার ৫০০–৭০০ পরিবার। নদীর তীরে ভাঙনের আশঙ্কা বেশি, এই অজুহাতে অনেক দূর দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে। কালাবগির মানুষেরা এই অজুহাত শুনতে রাজি নয়। তাদের মতে, যত দূরে নিয়ে যতই পোক্ত করে বাঁধ দেওয়া হোক না কেন, তা টিকবে না। জনপদ নিরাপদ করতে হলে ভাঙন রোধের দিকেই আগে নজর দিতে হবে। ভাঙন রোধের কোনো ব্যবস্থা ছাড়া কোনো বাঁধ টেকানো যাবে না। শিবসা নদী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে, তাকে ঠেকানোর অন্য বুদ্ধি লাগবে। যুক্তির কথা, কিন্তু বাঁধের বাইরে আগেও সুতারখালীর মানুষ বসবাস করেছে জোয়ার–ভাটার মধ্যেই। তারা জীবিকার পথ খুঁজে নিয়েছে। আগে কুমির কালেভদ্রে ভদ্রা বেয়ে সুতারখালী নদীতে আসত। এখন কুমিরের এই আনাগোনা প্রতিদিনের ঘটনা। দূরে বা ভাটায় ভেসে ওঠা চরে ক্ষণিকের রোদ পোহানো নয়, রীতিমতো ঘরের নিচে রাতদিন জোয়ারে, ভাটায় ঘুরঘুর করছে কুমির।

কিন্তু কেন হঠাৎ কুমিরের এই আনাগোনা? সুন্দরবনের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় অংশের বনজীবী মানুষের বক্তব্য, সুন্দরবনের ভেতরের নদী আর খঁাড়িগুলোতে কুমিরের স্বাভাবিক খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় কুমির লোকালয়ের কাছে চলে আসছে। সুন্দরবনের কুমিরদের প্রধান খাবার মাছ আর কাঁকড়া। বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া আহরণ, নিধন ও রপ্তানি কুমিরের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

নানা কারণে উপকূলে চিংড়ি চাষ মুখ থুবড়ে পড়ায় কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে রাতারাতি সবকিছুর মালিক হওয়ার নেশায় মেতেছেন একশ্রেণির মানুষ। ‘সাদা সোনা’ বলে পরিচিত চিংড়ি ফেলে ‘কালা সোনা’ বলে পরিচিত কাঁকড়া চাষে মন দিয়েছেন অনেকে। এই উদ্যোগে সহযোগী হয়েছে নানা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তাকারী নানা দেশি–বিদেশি প্রতিষ্ঠান। সুন্দরবন অঞ্চল থেকে কাঁকড়া ধরে মোটাতাজা করে বিক্রি করে ‘দারিদ্র্য বিমোচন’ করছেন অনেকে। মুন্সিগঞ্জের কলবাড়ি থেকে বুড়িগোয়ালিনী-নীলডুমুর রাস্তার দুই পাশ ছেয়ে গেছে এই কাঁকড়া চাষে। কিন্তু কাঁকড়া ধরা হচ্ছে সুন্দরবনের সর্বত্র। মাদি কাঁকড়ার চাহিদা বেশি। করোনাভাইরাস সংকটের আগে ১১০ গ্রাম মাদি কাঁকড়া ২০০ টাকা কেজি, ১৫০ গ্রামের মাদি কাঁকড়া ৩০০ টাকা, ১৮০ গ্রামের মাদি কাঁকড়া ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে সাতক্ষীরার কাঁকড়া মোকামে। মাদি কাঁকড়ার পেট ডিমে ভরে উঠলে সেটা বিক্রির উপযুক্ত হয়। তার মানে কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। তারই সাক্ষাৎ প্রতিক্রিয়া মানুষের বসতির কাছে অভুক্ত কুমিরের আনাগোনা।

অনেকে বলার চেষ্টা করছেন চিংড়ি আমাদের পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জীবন–জীবিকাকে ক্ষতবিক্ষত করলেও সুন্দরবন কালা সোনা কাঁকড়ার পরিবেশ-প্রতিবেশ এবং জীবন ও জীবিকাবান্ধব। কথাটা কি ঠিক? পরিবেশের তৈরি স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলা নষ্ট করে রাতারাতি কিছু টাকা কামানো গেলেও আখেরে সেটা না জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগীদের অভিযোজনে সাহায্য করবে, না জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। কেউ কেউ বলছেন কাঁকড়ার হ্যাচারি করে সুন্দরবনের কাঁকড়া সুরক্ষা সম্ভব। চিংড়ি চাষের স্বর্ণযুগেও একই কথা বলা হয়েছিল। সাগরের চিংড়ি পোনা ধরা বন্ধ হয়নি এক দিনের জন্যও। তার ওপর হ্যাচারিতে কাঁকড়া বাঁচে ৩ শতাংশের বেশি নয়। বিষয়টি এখনই ভেবে দেখা দরকার।

গওহার নঈম ওয়ারা: লেখক ও গবেষক
nayeem5508@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0