‘সুশাসনের’ ফরিদপুর মডেল

সাম্প্রতিক কালে ফরিদপুরের জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বিরোধ ও সংঘাতের যেসব খবর আসছে, তাকে রোগ না বলে রোগের উপসর্গ বলাই শ্রেয়। যেকোনো আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোয় তিনটি অঙ্গ থাকে—নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা। কোন বিভাগের কী কাজ, সেটি আমাদের সংবিধান সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যে যার সীমারেখার ভেতরে থেকে কাজ করলে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু কোনো পক্ষ সীমা লঙ্ঘন করলেই সমস্যা তৈরি হয়। যেখানে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করার কথা, সেখানে তাঁরা সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়েছেন।

রাষ্ট্র কীভাবে চলবে, তা ঠিক করবেন আইনপ্রণেতারা। তাঁরা নীতি-পরিকল্পনা নেবেন, তা বাস্তবায়ন করবে নির্বাহী বিভাগ বা জনপ্রশাসন। নির্বাহী বিভাগ কাজটি ঠিকমতো করছে কি না, জনপ্রতিনিধিরা সে বিষয়ে নজরদারি করবেন। তাঁরা জনপ্রশাসনের জবাবদিহি আদায় করবেন। হস্তক্ষেপ করবেন না।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি চরভদ্রাসন উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন নিয়ে যা ঘটেছে, তা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি উভয়ের জন্য অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক। এটি জেলা প্রশাসক কিংবা ইউএনওর সঙ্গে একজন জনপ্রতিনিধির নিছক ঝগড়া বা কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব ভাবলে ভুল হবে। জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মূল কাজ যে জনগণের সেবা করা, উভয় পক্ষ সে কথা অনেক আগেই ভুলে গেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাজ করতে হয় স্থানীয় সাংসদ ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধির আজ্ঞাবহ হিসেবে, এটি মোটামুটি সবার জানা। সমস্যা হলো চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলায় কার আজ্ঞা পালন করবেন, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি। স্থানীয় সাংসদ মুজিবর রহমান চৌধুরী, যিনি নিক্সন নামে অধিক পরিচিত, স্বতন্ত্র সাংসদ হলেও আওয়ামী রাজনীতিই করেন। আবার একই এলাকায় আছেন তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সাংসদ কাজী জাফর উল্যাহ। এই দুই ক্ষমতাধরের রশি-টানাটানিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা চিড়েচ্যাপ্টা। কৌশলী সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণত দুই পক্ষের মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি এমনই, একচুল ছাড় দিতে রাজি নয়, প্রত্যেকে শতভাগ আনুগত্য চায়।

চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড, তার পেছনেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আছে। নির্বাচনে যিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়েছেন, মোহাম্মদ কাউসার, তিনি ছিলেন কাজী জাফর উল্যাহর সমর্থক। তাঁকে দলের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার বিষয়েও কাজী সাহেবের উদ্যোগী ভূমিকা ছিল। এরপর কাউসার পক্ষ ত্যাগ করে নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে যোগ দেন। চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগ তাঁর এ পক্ষত্যাগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের কাছে সুপারিশ করে। জেলা আওয়ামী লীগ তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় এবং কেন্দ্রীয় কমিটিকে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন না করে কাউসারের পক্ষে সবাইকে কাজ করার নির্দেশ দেয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, নির্বাচনে সুবিধা করা যাবে না ভেবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। ফলে এই নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও নৌকার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। নির্বাচনের খবর সংগ্রহের কাজে মাঠে থাকা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক কম। ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি নয়। কিন্তু নৌকার প্রার্থীর প্রভাবাধীন এলাকায় ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ। নির্বাচন করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার চাহিদা অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনী এলাকায় ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছেন। সাংসদ বা অন্য কেউ তাঁকে বলে দিতে পারেন না কোথায় কতজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করবেন। নিক্সন চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে ও পথসভায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে নৌকা প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করার এবং তাঁর পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। যে পোলিং এজেন্টকে নিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তিনি আরেক উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী। তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাক্সে ব্যালট ভরার গুরুতর অভিযোগ ছিল। ওই এলাকার ভোটার না হয়ে তিনি কীভাবে পোলিং এজেন্ট হলেন?

আগে নির্বাচন সামনে রেখে নেতা-কর্মীরা দল বদল করতেন। কিন্তু চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাফর উল্যাহর পক্ষ ত্যাগ করে সাংসদ নিক্সন চৌধুরীর পক্ষ নিয়েছেন। অর্থাৎ পক্ষ-বিপক্ষ সবই আওয়ামী লীগ।

নিক্সন চৌধুরীর আচরণের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে বিসিএস প্রশাসন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. নওয়াবুল ইসলাম বাদী হয়ে চরভদ্রাসন থানায় ওই সাংসদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অভিযোগ করা হয়, একজন সাংসদ হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনী এলাকায় উপস্থিত থেকে নির্বাচনের প্রচারণা ও কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন এবং নির্বাচনী দায়িত্ব ও সরকারি কর্তব্য পালনরত কর্মকর্তাদের হুমকি, গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নিক্সন চৌধুরী নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বিসিএস প্রশাসন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ও কর্মকর্তাদের গালাগাল করার জন্য নিক্সন চৌধুরীর বিচার চেয়েছেন। প্রশাসনের ওপর জনপ্রতিনিধির অন্যায় আচরণের যথার্থ জবাবই বটে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় হেলালুদ্দীন আহমদ নির্বাচন কমিশনের সচিব ছিলেন। সেই সময় তিনি যদি এই ঔচিত্যবোধ দেখাতে পারতেন, তাহলে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারত। কিন্তু তিনি ও তাঁর মতো দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তা করেননি। একটি মন্দ নির্বাচন নির্বাচনী ব্যবস্থার ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ভয়াবহ ক্ষত রেখে যেতে পারে।

কিছুদিন আগে থেকে ফরিদপুর আওয়ামী লীগ নেতাদের যেসব দুষ্কর্মের বয়ান বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা রোমাঞ্চকর কাহিনিকেও হার মানায়। একটি জেলাপর্যায়ের নেতা ও পাতিনেতারা দুই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন, সংখ্যালঘুসহ বিভিন্নজনের বাড়িঘর ও জমিজমা দখল করে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করেছিলেন। অথচ জেলা প্রশাসন সেসব দুষ্কর্মে বাধা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সে সময়ে তাদের বিবেক কার কাছে বন্ধক ছিল?

বিজ্ঞাপন

মন্ত্রী-সাংসদের ক্ষমতার দোহাই দিয়ে তাঁরা দায় এড়াতে চাইলেও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে ব্যর্থতা ঢাকবেন কীভাবে? সাংসদ নির্বাহী বিভাগের কেউ নন। সরকারের সেই নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রশাসনেরই। জনপ্রশাসনে আমরা আগৈলঝাড়ার ইউএনও গাজী তারিক সালমান কিংবা নারায়ণগঞ্জের এপিএস মোহাম্মদ বশিরের মতো তৃতীয় কাউকে পাইনি, যাঁরা জনপ্রতিনিধির অন্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন। বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাইয়ের’ ভূমিকায় দেখা যায়। বছরের পর বছর একটি জেলায় প্রকাশ্যে এত অন্যায়-অবিচার চলতে থাকল, কিন্তু ফরিদপুরের প্রশাসন কোনো প্রতিকার করল না, এটি কেমন কথা?

মাদকের বিরুদ্ধে সরকার তথা প্রশাসনের শূন্য সহিষ্ণুতার ‘নজির’ আমরা কক্সবাজারে দেখেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নজিরও বেরিয়ে আসছে ফরিদপুরের দুই ভাইয়ের রাজত্বে, বেরিয়ে এসেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশ–কাণ্ডে, বেরিয়ে এসেছে মেডিকেল কলেজের পর্দা–কাণ্ডে এবং হাল আমলে করোনা পরীক্ষার কেলেঙ্কারিতে।

এর কোনোটার দায় সরকারের নির্বাহী বিভাগ বা জনপ্রশাসন এড়াতে পারে না।

সোহরাব হাসান : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

sohrabhassan55@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0