default-image

১৯৭১ সালে কানাডার ম্যানিটোবায় হাতে গোনা অল্প কয়েকজন বাংলাদেশি বাস করতেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁদেরও বসে থাকতে দেয়নি। কয়েক হাজার মাইল দূরে, প্রতিকূল পরিবেশে, তাঁদের সেই তৎপরতার খবর ম্যানিটোবা অভিবাসী বাংলাদেশিদের কেউ কেউ জানলেও দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানেন না, দুর্ভাগ্যবশত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও তা প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের ভূমিকা নিয়ে কবি ও সাংবাদিক সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল কয়েক বছর ধরেই কাজ করছেন। মূলত তাঁরই উৎসাহে মুক্তিযুদ্ধে কানাডার প্রেইরি অঞ্চলের অভিবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা নিয়ে একটি অনুসন্ধান চালাই। অনুসন্ধানের ফলাফল চমকপ্রদ।

বিজ্ঞাপন

ম্যানিটোবা, সাস্কাচুয়ান ও অ্যালবার্টা—এই তিন প্রদেশ নিয়ে কানাডার প্রেইরি অঞ্চল। প্রেইরিই কানাডার মূল সমতল ভূমি। ভৌগোলিকভাবে প্রেইরি কানাডার ঠিক মাঝামাঝি। প্রেইরির অর্থনীতি কৃষিভিত্তিক। পাঞ্জাব যেমন ভারতের ‘ফুড বাস্কেট’, ম্যানিটোবাও তেমনি ‘কানাডার ফুড বাস্কেট’। ম্যানিটোবা প্রদেশটি অত্যন্ত সমতল হওয়ায় এবং উত্তরে পাহাড়-পর্বত না থাকায় উত্তর মেরুর হিমশীতল বাতাস সোজা প্রেইরি অঞ্চলে আঘাত হানে। ফলে ম্যানিটোবা বছরের ছয় থেকে সাত মাস হিমশীতল থাকে। বছরের প্রায় চার মাস তীব্র শৈত্যপ্রবাহ থাকায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ম্যানিটোবায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে আসা মানুষের সংখ্যা সামান্যই। স্বাভাবিক কারণেই উষ্ণ দেশ যেমন ভারত, বাংলাদেশের অভিবাসীরা ম্যানিটোবাকে বসবাসের উপযোগীই মনে করত না।

১৯৭১ সালে প্রদেশটি বর্তমানের মতো অত্যাধুনিকও ছিল না; বরং ছিল দারিদ্র্যপ্রবণ। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চিকিৎসা ও প্রকৌশল পেশায় নিয়োজিত ভিনদেশিদের উচ্চ পারিশ্রমিকে প্রদেশটিতে চাকরি দিয়ে নিয়ে আসা শুরু হয়। তাঁদের জন্য আরও আকর্ষণ ছিল সহজে স্থায়ী নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ, আত্মীয়-পরিজনদের এনে অভিবাসী বানানোর সুযোগ। বাংলাদেশিদের আগমনের বেলায় ভিসারও প্রয়োজন হতো না। দূতাবাস একটি চিঠি লিখে দিলেই তাঁরা চলে আসতে পারতেন।

১৯৬৬ সালে উচ্চতর শিক্ষা এবং চাকরির জন্য লন্ডনে অবস্থান করছিলেন মধ্যকুড়ির তরুণ চিকিৎসক ফরিদ শরিফ। তিনি চট্টগ্রামের মানুষ। হঠাৎই মনে হলো কানাডায় যাবেন। ১৯৬৭ সালের শুরুতেই ডাক্তার শরিফ ম্যানিটোবায় এলেন। ম্যানিটোবার রাজধানী উইনিপেগে সে সময় ডজনখানেক বাংলাদেশি পরিবার বাস করত।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চের কালরাতের তথ্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেই ডাক্তার শরিফসহ কয়েকজন চিকিৎসক ম্যানিটোবার প্রথম বাংলাদেশ সমিতি তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল দুটি: এক. দেশ স্বাধীন করতে সম্ভাব্য সব রকমের সহায়তাদান; দুই. শরণার্থীদের বেঁচে থাকার রসদ সরবরাহ করা।

এই গবেষকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ডাক্তার শরিফ দাবি করেন, সম্ভবত সেটিই ছিল কানাডায় বাংলাদেশিদের গড়া প্রথম সমিতি। তাঁদের দেখাদেখি উৎসাহিত হয়ে কানাডার অন্যান্য প্রদেশে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বেশ কয়েকটি বাংলাদেশ সমিতি গড়ে ওঠে। সমিতি দুটি তহবিল গঠন করে। একটি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের জন্য নগদ তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজনে, অপরটি শরণার্থীদের জন্য খাবারদাবার, পোশাক, ওষুধসহ তৈজসপত্র সংগ্রহের প্রয়োজনে।

ম্যানিটোবায় বসবাসরত পশ্চিমবঙ্গের ১৫ জন বাঙালিকে তাঁরা দলভুক্ত করেন। তাঁরা আমেরিকার সমিতিগুলোর সঙ্গেও জোট বাঁধলেন। এবার প্রয়োজন হলো কানাডীয় দূতাবাস এবং সরকারি মহলের সহায়তায় মুজিবনগরের অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে ওয়্যারলেসে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা। চেষ্টা চলল সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের। তাঁরা সক্ষমও হয়েছিলেন। কানাডীয় দূতাবাস এবং সরকারও সহানুভূতি ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। পাঠানো গিয়েছিল অর্থ ও যুদ্ধসরঞ্জাম।

স্বাধীনতার পর ইত্তেফাক পত্রিকায় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথায় উত্তর আমেরিকার জোটবদ্ধ বাংলাদেশিদের সহায়তার বিস্তারিত বিবরণ লেখেন। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি গ্রন্থেও প্রবাসী এবং ম্যানিটোবাবাসীর অবদানের উল্লেখ রয়েছে।

এই অনুসন্ধানে সাস্কাচুয়ান ও অ্যালবার্টা প্রদেশের বাংলাদেশি প্রবাসীদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের বিশেষ কোনো তথ্য মেলেনি। কিন্তু উভয় প্রদেশেই সব সময় ম্যানিটোবার তুলনায় অনেক বেশি বাংলাদেশি বাস করেন। প্রেইরিতে এবং প্রবাসের অন্যত্র জন্মগ্রহণ করা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বর্তমান ও উত্তর প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় দিকগুলো জানানো প্রয়োজন। নইলে দেশ, মাটি ও শিকড়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পরিপূর্ণতা দিতেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।

অনেক তথ্য আরও বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। ডাক্তার শরিফ এখনো জীবিত। তাঁর জবানিতে ম্যানিটোবাবাসীর মুক্তিযুদ্ধ-সহায়তার বিস্তারিত তথ্য নথিবন্দী করা প্রয়োজন। শুধু ম্যানিটোবা নয়, প্রেইরির অন্য দুটি প্রদেশসহ সারা বিশ্বের যেসব দেশে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বসবাস করেছেন, সেসব দেশ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এ বিষয়ে অন্তত একটি বিশেষ কাজ শুরু হতে পারে। দূতাবাসগুলোকে গবেষণায় সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অনাবিষ্কৃত, অগ্রন্থিত ও অসংকলিত দলিল ও ঘটনাপঞ্জি যাতে মুক্তিযুদ্ধের তথ্যে সন্নিবেশিত হতে পারে, সে জন্য প্রতিটি দূতাবাসে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সেল তৈরি করা বাঞ্ছনীয়।

ড. হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, সেন্টার ফর পিস স্টাডিজ, পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোসিওলজি; নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন