default-image

গত শনিবার সোনারগাঁও হোটেল চত্বরে ঢুকলে যে কেউ অবাক হয়ে যেতেন। সকাল ১০টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত সেখানে প্রচণ্ড ভিড়। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নির্বাচন ঘিরে সারা দেশ থেকে কয়েক শ মানুষ এসেছেন। ভোটার, প্রার্থী, সমর্থক, সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি পুরো আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সন্ধ্যা সাতটার পর থেমে থেমে ফল ঘোষণা হচ্ছিল আর...ভাই জিন্দাবাদ, ... ভাইয়ের দুই নয়ন ফুটবলের উন্নয়ন...জাতীয় স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ।

ফিফার নিয়ম মেনেই এই নির্বাচন করতে হয় চার বছর পরপর। আর বাফুফে নির্বাচন ঘিরে যত মানুষের আগ্রহ, সবাই গ্যালারিতে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখলে দেশের ফুটবলের সামগ্রিক চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত। সেটা না হওয়ায় একসময়ের জমজমাট ঘরোয়া ফুটবল এখন অনেকটা প্রাণহীন। তবে আপাতদৃষ্টিতে বাধাবিপত্তিহীন বাফুফের এই নির্বাচন প্রাণের আনন্দে ছিল ভরপুর। তারপরও কোথাও কি একটু প্রশ্ন থেকে গেল না!

বিজ্ঞাপন

তিন সভাপতি প্রার্থীর অন্যতম সাবেক তারকা ফুটবলার বাদল রায়ের নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা পর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার, সেটি গ্রহণযোগ্য না হওয়া, পরে সংবাদ সম্মেলনে করে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া, আবার ভোটের এক দিন আগে প্রকাশ্যে নিজেকে সভাপতি প্রার্থী ঘোষণা করা এবং সবশেষ নাটক নির্বাচনের দিন। বাদল রায় নির্বাচনের ভেন্যুতেই এলেন না। তা তিনি যতই বলুন শারীরিক অসুস্থতায় ওয়ারীর বাড়িতে ছিলেন, তবে অনেকের কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। কেননা, তাঁর ওপর চাপ রয়েছে এমন কথা বিভিন্ন সূত্রে আমরা শুনেছি।

২০১৭ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। চলাফেরা করেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সেই তিনি ভোটকেন্দ্রে না এলেও ১৩৫ ভোটের মধ্যে তাঁর বাক্সে ৪০টি পড়েছে। কাজী সালাউদ্দিন ৯৪। শফিকুল ইসলাম মাত্র ১ ভোট। অনেকে মনে করেন, মাঠে না থেকেও যিনি ৪০ ভোট পান, মাঠে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। সুতরাং সাদাচোখে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ‘বাদল রায় রহস্যটা’ প্রশ্ন হয়েই থাকল।

তবে ১২ বছর ধরে বাফুফে সভাপতির চেয়ারে থাকা কাজী সালাউদ্দিনের নির্বাচনী দক্ষতা প্রশ্নাতীত। বিরোধীদের পরিবর্তনের ডাক উপেক্ষা করে ভোটাররা তাঁর পক্ষেই রায় দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ‘সালাউদ্দিন হটাও’ দাবি বা তাঁর বিরুদ্ধে নানা জায়গায় হওয়া বিক্ষোভকে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেন সালাউদ্দিন। এবং ভোটে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রমাণ করেছেন।

বিরোধীরা ছিলেন নাবিকবিহীন নৌকা। তাঁরা মাঠে-ঘাটে, টিভি টক শোতে গরম বক্তৃতা দিয়ে শেষ পর্যন্ত শনিবার বাফুফের বার্ষিক সাধারণ সভায় মুখে কুলুপ আঁটেন। ‘ফুটবল শেষ হয়ে গেল’, ‘ফুটবল বাঁচাও’, বিরোধীদের এসব হা-হুতাশ শুধু টক শোতেই, আসল জায়গায় নয়। তাঁরা সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে একজন সভাপতি প্রার্থী পর্যন্ত দিতে পারেননি। অসুস্থ বাদল রায়কেই শেষ পর্যন্ত চালাতে হয়েছে নিঃসঙ্গ লড়াই।

বাফুফের নির্বাচনে বরাবরই বাতাসে ওড়ে টাকা। ২০১২ সালে সালাউদ্দিন দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হন (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়), সেবার নির্বাচনের সামগ্রিক চিত্র নিয়ে পরদিন ১ মে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘টাকায় কথা বলে’। অর্থাৎ ২১ সদস্যের কমিটিতে অনেক প্রার্থীই শুধু টাকার জোরে জিতে আসেন। এই ধারা চলছেই। নির্বাচনের পর অনেক কর্মকর্তা বিদেশভ্রমণ আর নানা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। এসব কারণে বাফুফের কমিটিতে থাকার আগ্রহ অনেকের। ২১ পদে এবারের নির্বাচনে ৪৭ জন প্রার্থী ছিলেন।

কিন্তু এটা ভাবা ভুল যে ২১ জনের বাফুফের একটি কমিটিই ফুটবলের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে পারে! আমাদের ফুটবলের সংকট আসলে অনেক গভীরে। হাতে গোনা কয়েকটি বাদে বাকি ক্লাবগুলোর নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। পৃষ্ঠপোষক কমে গেছে। ক্লাবের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় দেশের ফুটবলও ভীষণভাবে ভুগছে। অথচ গোটা বিশ্বেই ফুটবল ক্লাবভিত্তিক খেলা।

এ দেশে ক্লাবগুলোর কোনো একাডেমি নেই। বাফুফেও আজ পর্যন্ত নিজস্ব স্থাপনায় একটি একাডেমি করতে পারেনি, যেখান থেকে খেলোয়াড় উঠে আসবে। অথচ লিওনেল মেসির মতো ফুটবলারকে ছোট থেকেই লালন–পালন করে আজকের অবস্থানে এনেছে বার্সেলোনা। এ দেশে ফেডারেশনের কমিটিতে কে এলেন, কে গেলেন, সেটা নিয়েই চলে নিরন্তর চর্চা। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটা হয় বলে জানা নেই।

বিজ্ঞাপন

শনিবার রাত একটায় সোনারগাঁও হোটেল থেকে ফেরার পথে এই কথাগুলোই মনে আসছিল বারবার। বাফুফের নির্বাচনই কি দেশের ফুটবল উন্নয়নের চাবিকাঠি! কিছুটা তো অবশ্যই। তবে ক্লাবকে শক্তিশালী করার কথা উচ্চারিত হয় কমই। অনেক ক্লাব হারিয়ে গেছে, টিকে থাকলেও বেশির ভাগ ধুঁকছে। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আজ পর্যন্ত একটা নিজস্ব মাঠ হলো না।

ব্যক্তিগত নৈপুণ্যধারী খেলোয়াড় প্রায় শূন্য। ক্রিকেট মাশরাফি, সাকিব, তামিমসহ একঝাঁক তারকা পেয়েছে গত দুই দশকে, ফুটবল তেমন তারকা পায়নি। ফলে লোকে মাঠে আসার আগ্রহ হারিয়েছেন। তবে একজন শীর্ষ স্তরের ফুটবলারের আয় বেড়েছে, বছরে তাঁরা ক্লাব থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকাও পান। বাফুফের দায়িত্ব ছিল সারা দেশের ফুটবলে নজর রাখা, নিয়মিত লিগ ও টুর্নামেন্ট করা। প্রিমিয়ার লিগটা তারা নিয়মিত করেছে। অথচ খেলোয়াড় উঠে আসার সিঁড়ি ঢাকার নিচের দিকের লিগগুলো চরম অবহেলিত। গত ১২ বছরে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পাইওনিয়ার লিগ হওয়ার কথা ৪৮টি, হয়েছে ২৩টি। কেন এগুলো অনিয়মিত প্রশ্নে নির্বাচনের আগে সালাউদ্দিন বলেন, ‘টাকা দিন, তৃণমূলে লিগ করব।’ গত বছর বাফুফে খরচ করেছে ৩৭ কোটি টাকা (আগামী বছর বাজেট ৫১ কোটি ৪৪ লাখ), অথচ নিচের দিকের লিগগুলো করতে টাকার টান পড়ে!

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিনের কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক। ২০০৮ সালে শুরুটা ভালো করলেও পরে তিনি গতি হারিয়ে ফেলেন। তাঁর সময়ে কিছু সাফল্য নিশ্চয়ই আছে। তবে সবচেয়ে হতাশার, গত চারটি সাফ ফুটবলের গ্রুপ থেকেই বাংলাদেশের বিদায় নেওয়া। ভুটানের কাছে প্রথমবার হেরে ২০১৭ সালে দেশের ফিফা র‌্যাঙ্কিং সর্বনিম্ন ১৯৭-এ গিয়ে ঠেকে (বর্তমানে ১৮৭)। সালাউদ্দিনের দেখানো ২০২২ সালে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে এবার বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করে ফিফা র‌্যাঙ্কিং ১৫০-এর কাছে আনতে চান সালাউদ্দিন। তাঁর নতুন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ৩৬টি। তবে একা তরি ভেড়াতে পারবেন না তীরে। ক্লাব, ফুটবলার, সরকার, সবার সম্মিলিত চেষ্টা দরকার। অন্যথায় সবই হারিয়ে যাবে হতাশার চোরাবালিতে।

মাসুদ আলম: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন