আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের যত দায়

মার্কিন সেনারা ছেড়ে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের ভাগ্য কী হবে, এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা–কল্পনা।
ফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন এবং ন্যাটো জোটের বাহিনী ফিরতে শুরু করায় আফগানিস্তানের সরকার ভেঙে পড়বে এবং তালেবান আবার কাবুল দখল করে তাদের শাসন কায়েম করবে বলে সবার মনে ধারণা জোরালো হচ্ছে। এই ধারণা যাতে প্রতিষ্ঠা না পায় এবং আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর মনোবল যাতে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত আফগান সরকারের সঙ্গে বসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি কৌশলপত্র তৈরি করা দরকার ছিল। একটি যৌক্তিক রূপরেখা প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে তালেবান ঠেকানো যেত।

কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ ধরনের কৌশল এখন করতে চাইলেও তা করার সময় আসলে তাদের হাতে নেই। এক বছরের মধ্যে সরকারের পতন ঘটিয়ে তালেবান ক্ষমতা দখল করবে—এই ভবিষ্যদ্বাণী যাঁরা করছেন, খোদ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। জো বাইডেন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আফগানিস্তানের অনেক জেলার নিয়ন্ত্রণ তালেবানের হাতে চলে গেছে।

পাকিস্তানকে বুঝতে হবে, যে তালেবানকে আজ তারা সহযোগিতা দিচ্ছে, সেই তালেবান কাবুল কবজায় নেওয়ার পর আফগানিস্তানে বসে থাকবে না। তারা পাকিস্তানকেই তখন টার্গেট করবে

আফগান বাহিনীর এক এলাকার সদস্যরা যখন দেখছেন অন্য এলাকার সহযোদ্ধারা তালেবানের হাতে পরাজিত হচ্ছেন, তখন তাঁদের মনোবল ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আফগানিস্তানে যেসব স্থানীয় সাহসী মানুষ দোভাষী হিসেবে পশ্চিমা সেনাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন বা অন্য অনেকভাবে তাঁদের সহায়তা করেছিলেন, সেই সব সাহসী আফগানকে পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তার বন্ধুদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। এমনকি যখন কাবুলের পতন অবশ্যম্ভাবী, তখনো তাকে আফগান সরকারের পাশে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখা দরকার, ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার পরও সেখানে কমিউনিস্টদের বসিয়ে দেওয়া হাবিবুল্লাহ সরকারকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছিল। ১৯৯২ সালে কাবুল পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত হাবিবুল্লাহ সরকার মস্কোর কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা পাচ্ছিল।

কিছুদিন আগে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি এবং তাঁর সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় সদস্যরা যেভাবে ওয়াশিংটনে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন সবাই আশা করেছিল, আশরাফ গনির সরকারকে মার্কিন সরকারের দিক থেকে অন্তত অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যতটুকু আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দরকার, তা দেওয়া হবে। কিন্তু আশরাফ গনির সরকার সম্প্রতি এমন সব এলাকা থেকে তাদের নিরাপত্তা বাহিনী সরিয়ে নিতে শুরু করেছে (যেগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর মজবুত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল), যার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, গনির সরকারের মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার আশা একেবারেই ক্ষীণ।

তবে সেনাবাহিনী সরিয়ে আনলেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্তত দূর থেকে হলেও আফগান সরকারের পাশে থাকা। পশ্চিমা কয়েক হাজার কন্ট্রাক্টর ও প্রযুক্তি কর্মকর্তা আফগানিস্তান ও এর কাছাকাছি এলাকায় কর্মরত। আফগান হেলিকপ্টার ও সাঁজোয়া যানবাহন পরিচালনায় সহায়তা করা এবং সেগুলো নষ্ট হলে মেরামত করার কাজে তাঁরা নিয়োজিত। এই ঠিকাদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আফগান বাহিনীর সামরিক কার্যক্রমকে আগের মতো চালিয়ে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে।

যখন ন্যাটোর সেনারা সবাই চলে যাবে, তখন তাঁদের ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলো আফগান সেনারা যাতে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, এমন অনেক সশস্ত্র গ্রুপ আছে, যাদের যৌক্তিক বেতন দিয়ে সরকারি বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে তালেবান কোণঠাসা হয়ে পড়তে পারে। তালেবানের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে এলাকাছাড়া হয়েছেন, এমন নাগরিকদের জন্য বড় বড় শরণার্থীশিবির বানানো এবং সেখানে থাকা লোকদের জীবিকার অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পাকিস্তানকে তালেবানের পাশে থাকা থেকে বিরত রাখা। পাকিস্তানকে বুঝতে হবে, যে তালেবানকে আজ তারা সহযোগিতা দিচ্ছে, সেই তালেবান কাবুল কবজায় নেওয়ার পর আফগানিস্তানে বসে থাকবে না। তারা পাকিস্তানকেই তখন টার্গেট করবে।

ইউএসএ টুডে থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মাইকেল ও’হানলোন ইউএসএ টুড–এর প্রদায়ক পর্ষদের সদস্য