default-image

‘ছেলেরা স্ত্রীর চেয়ে বন্ধুকেই সমস্যার কথা বেশি বলেন’—এমন একটি তথ্য প্রথম আলোর সাম্প্রতিক তারুণ্য জরিপে বের হয়ে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে কোনো কোনো পাঠক কৌতুক করেছেন, আবার কেউবা বলেছেন, এ রকম একটি তথ্য এতটা প্রাধান্য দিয়ে পরিবেশনের যৌক্তিকতা আসলে কতটুকু। তথ্যটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়েছে। সম্প্রতি ওআরজি-কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড পরিচালিত প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপ পরিচালিত হয় ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১ হাজার ২০০ তরুণ-তরুণীর মধ্যে। এই জরিপ থেকে বেরিয়ে এসেছে তরুণদের সম্পর্কে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, যা স্পষ্টতই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।

প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপ ২০১৯ অনুযায়ী, নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ তরুণ বন্ধুদের ওপর আস্থা রাখেন। ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণী সমস্যা নিয়ে স্বামীর ওপর আস্থা রাখেন। বিপরীতে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ সমস্যা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন। আমি শুধু সংবাদটি মন দিয়েই পড়িনি, মনোযোগসহ পড়েছি অনলাইনে পাঠকের প্রতিক্রিয়া। অধিকাংশ মন্তব্যকারীই ছিলেন পুরুষ। এমনকি ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ পরিচয়ে প্রকাশিত পাঠকের মন্তব্যে মন্তব্যকারীকে পুরুষ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। মন্তব্যগুলোয় নারীর প্রতি তাচ্ছিল্য ও সম্মানের অভাব প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। ‘বউরে সমস্যার কথা কইলে হাজারটা প্যাচাল শুনতে হয়’ ধরনের মন্তব্যের সংখ্যাই বেশি।

আরেকটি অবাক করা বিষয় হলো ছেলেরা বন্ধুর পরই মায়ের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন, যার হার প্রায় ৫২ শতাংশ। তাই নারীর সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলাই আসলে বিড়ম্বনা, এই ধারণা আসলে ভুল। অর্থাৎ সমস্যা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে মা গ্রহণযোগ্যতা পেলেও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেন না স্ত্রী। যে নারী স্ত্রী হিসেবে সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য পুরুষের নির্ভরতা অর্জন করতে পারছেন না, সে নারীই একসময় মা হিসেবে সমস্যা নিয়ে আলোচনায় ছেলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন। তাই বিষয়টিকে সামান্য বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

জরিপে বেরিয়ে আসা এ তথ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে নারীর প্রতি পুরুষের অশ্রদ্ধা, অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

সমস্যা নিয়ে নারীর সঙ্গে আলোচনায় অনাগ্রহী হওয়ার কারণ হিসেবে পুরুষেরা সাধারণত যা বলেন, তা হলো নারীটি পুরুষের সমস্যা নিয়ে অতিরিক্ত উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন এবং বারবার নানা ধরনের প্রশ্নের মাধ্যমে পুরুষটিকে জর্জরিত করেন। ফলে, একপর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠেন পুরুষটি। অনেকে আবার মনে করেন, সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনা দেওয়ার সক্ষমতা নারীর নেই। তাই সমস্যা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা না-বলায় এমন কিছু এসে-যায় না।

সত্যিকার অর্থে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা পুরুষকে নারীর প্রতি এই ধরনের ধারণা লালন করতে শেখায়। আমাদের সমাজ নারীকে তাঁর আবেগ প্রকাশে উৎসাহিত করে। আবেগের প্রকাশ নারীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বলে মনে করা হলেও পুরুষের ক্ষেত্রে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাই যেন পুরুষের একধরনের যোগ্যতা। নারীরা শৈশব থেকেই সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে শেখেন, নানা বাস্তবতায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং এর প্রকাশ ঘটান নানাভাবে। অন্যদিকে, পুরুষ তথাকথিত ‘মেয়েলি আবেগ’-এর প্রকাশ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চান।

সত্যিকারের পুরুষ হয়ে ওঠার জন্য সমাজ যে মিথ তৈরি করে রেখেছে, সেখানে পুরুষের আবেগের প্রকাশ বড্ড বেমানান। পুরুষ নারীর সামনে সমস্যা নয়, বরং সমস্যা সমাধানের নায়ক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেই ভালোবাসেন। তাই সমস্যা নিয়ে নারীর সঙ্গে আলোচনা পুরুষ তথাকথিত ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, নিজের অজান্তে নারীরও পুরুষের এই রূপের সঙ্গে অভ্যস্ততা গড়ে ওঠে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, পুরুষের প্রচলিত এই রূপ শুধু নারী নয়, পুরুষের জন্যও ক্ষতিকর—যার প্রভাব পড়ছে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ওপর। প্রচলিত এই ধারণার ফলে নারীর আত্মবিশ্বাস বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নারী নিজের সক্ষমতার প্রতি সন্দিহান হয়ে পড়ছেন। পুরুষ শ্রদ্ধাশীল হচ্ছেন না নারীর যোগ্যতার ব্যাপারে। অন্যদিকে, এ ধরনের মানসিকতা কিন্তু পুরুষের জীবনের স্বস্তিকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নির্ধারিত ‘পুরুষ’ হয়ে ওঠার প্রয়াসে পুরুষ নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করছেন, নিজেকে গুটিয়ে ফেলছেন। ফলে তাঁর মানবিক গুণাবলির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য।

পুরুষের আস্থা অর্জনের জন্য একদিকে নারীকে যেমন তার সক্ষমতা অর্জনে মনোযোগী হতে হবে, অন্যদিকে জোরপূর্বক আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষতিকর চর্চা থেকে পুরুষকেও সরে আসতে হবে। পুরুষের তাঁর আবেগপ্রবণ চাহিদাগুলো নিরূপণ করতে শেখা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন অনুভূতিগুলো সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারার সক্ষমতা অর্জন করা। আবেগের সঠিক পরিচর্যা ও তা প্রকাশ না করতে শিখলে মানবিক অনুভূতির যথার্থ বিকাশ ঘটে না। বিকশিত হয় না অংশীদারত্ব, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির মনোভাব। ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বেড়ে যায় সহিংসতা। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা সদ্য প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদ তাঁর জীবনসায়াহ্নে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, উন্নত বাংলাদেশের জন্য চাই সামাজিক ও আবেগীয় বুদ্ধিতে চৌকস একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সামাজিক ও আবেগীয় বুদ্ধিতে পরিপূর্ণ একটি প্রজন্মই কেবল পারে সমতাভিত্তিক সহিংসতামুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দিতে। তাই এই বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে এখনই।

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক
purba_du@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0