২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির ওপর সরকারি বিভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী বিগত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। আগের বছরগুলোর তুলনায় এ হার বেশ কম, তবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত বিশ্বে অনেক দেশই যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি কতটা কমানো যায় সে প্রয়াসে রত, সেখানে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির এই হার নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসের তুলনায়ও এ হার বেশ বেশি।

অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। তা সত্ত্বেও কী করে এতটা প্রবৃদ্ধি সম্ভব হলো, তা অনেকেই বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখছেন। দেশের অনেক বরেণ্য অর্থনীতিবিদ সরকারি ভাষ্যে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাঁরা বলছেন যে হিসাব মিলছে না। এ বিশ্লেষণ তাঁদের কাজ, এটা তাঁরা করতে থাকুন। আমজনতার একজন হিসেবে আমার চিন্তাটা আরও অনেক সহজ এবং দৃশ্যমান একটা বিষয় নিয়ে।

বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলারে। এটা মূলত মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাব, এটা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত আয় নয়, আমরা তা জানি। তবে মাথাপিছু আয় যখন বাড়বে, তখন যাদের মাথাগুলো গণনা করা হচ্ছে, তাদেরও তো আয় বাড়তে হবে, তাই না? আর আমার সমস্যাটা এখানেই। আমার চারপাশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যে মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত দেখি, তাদের কারোরই তো আয় বাড়তে দেখলাম না। তাহলে এই যে প্রায় দেড় শ ডলার মাথাপিছু আয় বেড়ে গেল, এই বৃদ্ধিটা গেল কোথায়?

বৈশ্বিক বিচারে যা-ই হোক, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমার শ্রেণিগত অবস্থান একজন সচ্ছল মধ্যবিত্ত, থাকা-খাওয়া নিয়ে যাকে দুশ্চিন্তা করতে হয় না। আমার এবং আমার মতো মানুষের আয় ২০১৮-১৯-এর তুলনায় ২০১৯-২০-এ কমেছে। কারণ, অবসরে যাওয়া এসব মানুষের আয়ের মূল উৎস সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানতে রাখা অর্থের ওপর সুদ, যা কমে গেছে। আমার বাসায় যে মেয়েটা খণ্ডকালীন কাজ করেন, তাঁর স্বামী ফুটপাতে চা বিক্রি করতেন। দুজনের আয়ে সংসার চলে যেত। লকডাউনের প্রথম দুই মাস বেচারা চা বেচতে বের হতে পারেননি। তৃতীয় মাস থেকে বেরিয়েছেন, কিন্তু মানুষজন কম, তাই বিক্রি কমে গেছে অনেক। অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ পরিবারটির আয় হয়েছে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক কম।

বাসাবাড়িতে এ রকম খণ্ডকালীন কাজ যাঁরা করেন, তাঁদের একটা বড় অংশ বিগত পাঁচ মাস কোনো কাজই পাননি, কারণ করোনার ভয়ে অনেক পরিবারই তাঁদের ছেড়ে দিয়েছে। মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন অনেকে বিনা কাজে অর্ধেক বেতন দিয়েছেন। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই কর্মীদের আয় পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম ছিল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। রিকশাচালকদের আয় কমেছে অনেক। বাস মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ তাদের দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজির অর্থের কোনো ভাগ দেয়নি বেকার হয়ে যাওয়া পরিবহনশ্রমিকদের।

ব্যক্তিগত গাড়িচালকেরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন অনেক কম। অনেকেরই গাড়ি বন্ধ এপ্রিল মাস থেকেই। তবু বিনা কাজেই গাড়িচালকদের বেতন দিয়ে গেছেন অনেকেই, তবে যে মধ্যবিত্তের নিজেরই আয় কমে গেছে, তাঁদের অনেকেই এটা করতে পারেননি। কেউ কেউ বেতন দিয়েছেন অর্ধেক। আমার গাড়িচালক পুরো বেতন পেলেও তাঁর সামগ্রিক আয় কমে গেছে। সপ্তাহে অন্তত দুদিন ছুটি পেতেন তিনি, আরও দু-তিন দিন এক বেলা কাজ। সচ্ছলতা আনার জন্য তিনি কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনে ‘পাঠাও’-এর রাইডসেবা দিতেন এই সময়ে। মার্চ-এপ্রিল থেকে এ কাজ বন্ধ, মোটরসাইকেলের কিস্তি দেওয়া নিয়ে তিনি সমস্যায় আছেন।

বিভিন্ন ছোটখাটো প্রাইভেট কোম্পানিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরও অনেকেই দুর্দশায় পড়েছেন। বসুন্ধরার একটি দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে সদ্য বিবাহিত দুই ভাই সস্ত্রীক থাকতেন ২০ হাজার টাকা ভাড়ায়। এপ্রিল থেকে তাঁদের বেতন কমে গেছে এবং নতুন পরিস্থিতিতে বাড়ির মালিককে ভাড়া কমিয়ে দিতে হয়েছে ৫০০০ টাকা, অন্যথায় এ বাসা ছেড়ে তাঁদের আরও সস্তা কোনো বাসস্থানে চলে যেতে হতো। এমন অনেক ছোট ফ্ল্যাটের মালিক আছেন, যাঁরা এই ভাড়ার ওপরই নির্ভরশীল। আয় কমেছে তাঁদেরও, তবু চেষ্টা করছেন ভাড়াটে ধরে রাখতে। ভাড়া দিতে না পেরে ঢাকা ছেড়েছেন অনেকে, টু-লেটের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। আর যাঁরা গ্রামে গেছেন, তাঁদের জন্যও কিন্তু সেখানে কোনো কাজ অপেক্ষা করছিল না।

কী অবস্থা গেছে গ্রামের মানুষের? আমার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলায়। আমার চাচাতো, মামাতো ভাইয়েরা গ্রামে থাকেন এবং চাষাবাদ করেন। বেলাব সবজির এলাকা, সবজির কল্যাণে তাঁদের বাড়িতে পাকা ঘর হয়েছে, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং মোটরসাইকেল কিনেছেন। বেগুনের ভরা মৌসুমে এল করোনার লকডাউন। খেত থেকে বেগুন তুলে ভ্যানে করে পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে খরচ প্রতি কিলো দুই টাকা, বিক্রয়মূল্যও তা–ই। ১০ মণ বেগুন বিক্রি করে একটি টাকাও ঘরে আসেনি, উৎপাদন ব্যয় সম্পূর্ণ নিজের পকেট থেকে।

উত্তরবঙ্গের সবজিচাষি আর দক্ষিণের ফুল খামারিরাও একই বিপদ মোকাবিলা করেছেন। বাদ যাননি ক্ষুদ্র ডেইরি আর পোলট্রি ফার্মের মালিকেরাও। আমাদের পারিবারিক উদ্যোগে একটা স্কুল হয়েছে গ্রামে। এমনিতেই এমপিওভুক্ত নয় যেসব স্কুল, তাদের শিক্ষকদের বেতন বেশ কম। ক্লাস নেই, ছাত্রবেতন নেই। অনেক কষ্টে তাঁদের অর্ধেক বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর প্রচেষ্টায় এককালীন অনুদান হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা করে পেয়েছেন তাঁরা, কষ্ট খানিকটা লাঘব হয়েছে তাতে। রেমিট্যান্স–নির্ভর যেসব পরিবার, তারা এখনো আর্থিক দুর্দশার সম্মুখীন হয়নি। কিন্তু প্রবাসে স্বজনদের চাকরিচ্যুতির আতঙ্ক তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

চারদিকে দৃষ্টি মেলে তাই আয় বেড়েছে, এমন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। বরং মনে হয়েছে উল্টোটাই ঘটছে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, দারিদ্র্য থেকে বের হয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ আবার দরিদ্রে পরিণত হয়েছেন। অতিধনীদের আয় অবশ্যই বেড়েছে, এটা বেড়েছে বিশ্বজুড়েই। আর হয়তো বেড়েছে ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় শহীদ, সাহেদদের মতো মানুষদের। বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের আয় কমে যাওয়ার অঙ্ক আর সেই সঙ্গে বিবিএসের তথ্যে মাথাপিছু আয়ের যে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক, এর পুরো যোগফলটাই কি এই অতি ক্ষুদ্রসংখ্যক ভাগ্যবান তাঁদের ঝুলিতে ভরেছেন? নাকি আমাদের ফিরে যেতে হবে পরিসংখ্যান নিয়ে সেই পুরোনো প্রবাদে? কথিত আছে, মিথ্যা তিন প্রকার—মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান।

মো. তৌহিদ হোসেন: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন