বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেড় বছর টানা বন্ধের পরে ১২ সেপ্টেম্বর যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলছে, তখন সংশ্লিষ্ট কেউ কিন্তু অবিকল ১৭ মার্চ-পূর্ব বাস্তবতায় নেই। এই বাস্তবতা মন্ত্রণালয় থেকে স্কুল পর্যন্ত সব কর্তৃপক্ষকে বিবেচনায় রাখতে হবে। এই দেড় বছর ছিল—দুর্ভাগ্যক্রমে যা এখনো চলমান—এক অভূতপূর্ব অদৃষ্টপূর্ব বিপর্যয়ের কাল। শিশু-কিশোর-তরুণেরাও কাটিয়েছে বন্দিজীবন, বারবার শুনেছে ক্রমাগত মৃত্যু, অসুস্থতা ও নানা বিপর্যয়ের কথা; অতিপরিচিত আপনজনদের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর দুঃখ পরিবারের সঙ্গে বইতে হয়েছে তাদেরও। বর্তমান ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মতো ভয়ংকর বাস্তবতা সইতে হচ্ছে। এই সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোর বাইরে অনেক পরিবারকে সরাসরি মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আঘাত সইতে হয়েছে। ফলে কেবল শিক্ষার্থীই নয়, শিক্ষক-অভিভাবকসহ সবার প্রতিই সবার, বিশেষভাবে কর্তৃপক্ষগুলোর, সহানুভূতিশীল ভূমিকাই বাঞ্ছনীয়। এটি একটি পারস্পরিক দায়িত্ব। কারণ, সংকট থেকে উত্তরণের আসল ধাপ—অন্তত শিক্ষার ক্ষেত্রে, শুরু হবে খোলার পরেই। এর জন্য সবার কেবল ইচ্ছার ঐক্য হলে হবে না, সমব্যথীর ঐক্যও দরকার।

পূর্ববর্তী শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিলে দেশে ১৩ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। অন্য বিষয় বাদ দিলেও এদের আর্থিক সামর্থ্যের ফারাক বিস্তর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসম বাস্তবতা, শিক্ষক ও অভিভাবক (এবং সেই সূত্রে শিক্ষার্থীদেরও) অসম সামর্থ্য ও স্বাস্থ্যসচেতনার মধ্যে লক্ষাধিক স্কুল-কলেজে চার কোটির বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে বাস্তব শিক্ষার পুনরাভিযান সুষ্ঠুভাবে হবে তো?

প্রশ্নের আকারে এই কথা বলার কারণ, করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমনকি সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনায় প্রায়ই অস্পষ্টতা, অসম্পূর্ণতা দেখা গেছে, যা পরে পরিবর্তন-পরিমার্জন করতে হয়েছে। শিক্ষাজগতে করোনার আঘাত কেবল শিক্ষার সংকটে সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, কিছু স্কুল টিকতে না পেরে বন্ধ হয়েছে, অনেক স্কুল কোনোমতে অস্তিত্ব রক্ষা করেছে, অনেক শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন বা বাধ্য হয়ে ভিন্ন পেশায় সরে গেছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ঝরে পড়া (এর মধ্যে বাল্যবিবাহও হয়েছে) এবং পিছিয়ে পড়ার ঘটনা বাস্তব সত্য। আর সবার মানসিক আঘাতের কথা তো বলাই বাহুল্য।

শোনা যাচ্ছে, স্কুল খোলার আগে সরকার ও মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে স্কুলের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করা শুরু হয়েছে। আমরা জানি না বাস্তবতা বুঝে ঘাটতি পূরণে সহায়তা, পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ তাদের কতটা থাকছে। শুধু বলব এ কাজটা যেন নেহাত একটি আমলাতান্ত্রিক যান্ত্রিক কাজ হয়ে না ওঠে। এখন আসলেই পুনর্গঠন এবং পূর্ণ উদ্যমে নতুন শুরুর সূচনা হতে যাচ্ছে। ফলে এর আবহটি হতে হবে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য ইতিবাচক ও উদ্দীপনামূলক। এখানেই মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বের ধরন ও গুণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সরকার, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের চেষ্টায় বিকল্প ব্যবস্থায় ক্লাস হলেও পড়াশোনায় কিছু ঘাটতি থেকেই গেছে। তাই বলব পরীক্ষা এবং শিক্ষাবর্ষের সমাপ্তি নিয়ে তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না। বরং আমি বলব ২০২১ শিক্ষাবর্ষ দুই মাস বাড়িয়ে ’২২-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হোক। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ২০২২ সাল ১০ মাসে সম্পন্ন করায় অসুবিধা হবে না। এমন নজির আমাদের ইতিহাসে রয়েছে।

যতই বহু স্তরের কর্তৃত্বের তলানিতেই থাকুন না কেন শেষ বিচারে শিক্ষকেরাই মানুষ গড়ার কারিগর এবং শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড বটে। আর এই বিশাল কর্মকালের কেন্দ্রে রয়েছে যে শিক্ষার্থীরা, তাদের বয়সোচিত নাজুক মনের কথা মাথায় রেখেও এ কাজে সাবধানতা এবং সংবেদনশীলতা জরুরি। গত জানুয়ারি মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার নির্দেশনা’ নামে ৩৬ পৃষ্ঠার যে দলিল প্রকাশ করা হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য ব্যবহারোপযোগী ছিল না। বরং সম্প্রতি স্কুল খোলার ঘোষণা আসার পরে প্রদত্ত ১৯টি করণীয়র নির্দেশনা আসায় স্বস্তি পাওয়া গেছে। এটি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন আকারে ছাপানো হলে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টিগোচর হবে। অভিভাবকদের জন্য স্বতন্ত্রভাবে নির্দেশনাসংবলিত গণবিজ্ঞপ্তি টিভি ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রদত্ত দলিল এবং বর্তমান নির্দেশনায় এমন কিছু পরামর্শ রয়েছে, যা স্কুলে করোনার করালগ্রাসের বাস্তবতা, তার ভয়-ভীতি-বিপদের হুমকি যেন নমুনা হিসেবে সবার চোখের সামনে দৃশ্যমান থাকবে। এটি মোটেও শিশুবান্ধব চিন্তার প্রকাশ নয়। করোনা নিয়ে যত উদ্বেগ ও সতর্কতামূলক ভাবনা, তা শিক্ষক-অভিভাবক এবং কর্তৃপক্ষের মাথায়-মনে থাকবে, কিন্তু শিশুরা থাকবে যথারীতি নির্ভার আনন্দে। বলা দরকার, শিশুদের আস্থা অর্জিত হলে তাদের দিয়ে যেকোনো নির্দেশনা মানানো এবং তা নির্ভুলভাবে সম্পাদন অতি সহজ কাজ। এ ছাড়া এত দিনে তারাও কিছু স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে জেনেছে, এতে অনেকে অভ্যস্ত হয়েছে। তারপরও খোলার আগে তাদের কাছ থেকে এসব কাজে সহযোগিতা চেয়ে স্কুলের পক্ষ থেকে সরাসরি চিঠি দিলে ভালো কাজ হবে। শিশুরা দায়িত্বশীল হওয়ার মধ্যে মর্যাদা বোধ করবে এবং সানন্দে চাহিদা পূরণ করবে। অভিভাবকদেরও করণীয় জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে পারে স্কুল। এর বেশি যা তা হলো স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করা ও উপকরণ ক্রয়।

সরকার, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের চেষ্টায় বিকল্প ব্যবস্থায় ক্লাস হলেও পড়াশোনায় কিছু ঘাটতি থেকেই গেছে। তাই বলব পরীক্ষা এবং শিক্ষাবর্ষের সমাপ্তি নিয়ে তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না। বরং আমি বলব ২০২১ শিক্ষাবর্ষ দুই মাস বাড়িয়ে ’২২-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হোক। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে ২০২২ সাল ১০ মাসে সম্পন্ন করায় অসুবিধা হবে না। এমন নজির আমাদের ইতিহাসে রয়েছে।

প্রতিটি স্কুল নিজ নিজ বাস্তবতা অনুযায়ী, বিশেষত করোনাকালের নতুন বিন্যাস অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সপ্তাহে ছয় দিনের সকাল-দুপুর দুই বেলা ব্যবহার করে সব শিক্ষার্থীকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্কুলে আনতে পারলে ভালো হবে। বেসিন, পানি ও স্যানিটাইজার, তাপ মাপার যন্ত্র ইত্যাদি কেনায় যেসব স্কুলের সহায়তা প্রয়োজন, তাদের সে অর্থ সময়ের আগে দেওয়া সম্ভব হবে কি? মনে হয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এক–দুটি অক্সিমিটার ও অন্তত একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকা বাঞ্ছনীয়। চার-পাঁচজন শিক্ষক এসব বিষয় তদারক করবেন, প্রয়োজনে স্থানীয় বা অভিভাবক-চিকিৎসকের সহযোগিতা নেবেন। এমনিতেই চিকিৎসক-অভিভাবকদের নিয়ে একটি সহায়ক দল করে রাখা যায়। যেসব স্কুলে তেমন অভিভাবক নেই, তাঁদের জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ কাজ করতে পারেন।

কোথাও রোগের লক্ষণ এক-দুজনের বেশি হলে তা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চেপে না রেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে—হতে পারে উপজেলা শিক্ষা বা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। সরকারের তরফে আরও একটি কাজ জরুরি ভিত্তিতে করে রাখা প্রয়োজন, তা হলো দেশব্যাপী স্থানীয় এক–দুটি হাসপাতালে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পেডিয়াট্রিক বেডের সংখ্যা বাড়ানো।

দেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—যারা এক বা একাধিক ভবনের আবদ্ধ কক্ষে, অনেকে প্রায় ফ্ল্যাট বাড়িতে ক্লাস নেয়। তাই আগামী দিনের জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কেমন ভবন-স্থাপনা হবে বা হতে পারবে, তারও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত। বর্তমানে এমন প্রতিষ্ঠান থাকলে তাদের যথাযথ ক্যাম্পাসে সরে যাওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া উচিত। তবে এ কাজ তো কেবল হুকুমেই হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যের প্রশ্ন রয়েছে। আমি জানি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের—বিশেষত বেসরকারি স্কুলের—এ সামর্থ্য নেই। তাই এ কারণেই আমি বারবার বলে আসছি যেহেতু দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ সঠিকভাবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই, তাই শিক্ষাই হওয়া উচিত জাতির অগ্রাধিকারভিত্তিক মেগা প্রকল্প। আশা করি, করোনার ঝাপটায় এই উপলব্ধি আমাদের হবে এবং অচিরেই দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের উন্নত দেশের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য সুপরিসর স্বাস্থ্যসম্মত স্কুল ভবন, মাঠ ও ল্যাবসহ সব সুযোগসংবলিত ক্যাম্পাস এবং অন্তত ১: ৩০ শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত বজায় রেখে যোগ্য দক্ষ শিক্ষকেরও ব্যবস্থা হবে।

আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন