default-image

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর ব্রিটিশ হাইকমিশনের একজন ইতিহাসবিদ কর্মকর্তা জাদুঘর পরিদর্শনের পর এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানান, বিশ্বের বহু দেশে বেসরকারি উদ্যোগে উৎসাহী ব্যক্তিরা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে প্রাথমিক উৎসাহে ভাটা পড়ে এবং অর্থাভাবে এ ধরনের জাদুঘর পাঁচ বছরের বেশি টেকে না। অধিকাংশ জাদুঘর বিত্তশালীদের ট্রাস্ট ফান্ড ও নিবেদিতপ্রাণ ট্রাস্টি ও কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। তদুপরি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বাংলাদেশে মতাদর্শগত কারণে সমাজে বিভক্তি গভীর ও বিস্তীর্ণ। সরকার পরিবর্তন হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়। এ সত্য মেনেও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজ ২২ মার্চ তার ২৫ বছর পূর্ণ করছে।

এটি সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠাকালে কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত ও সর্বোপরি সর্বজনের সমর্থনের ফলে। ১৯৯৫ সালে আমরা আটজন ট্রাস্টি দুই লাখ টাকা আমানত দিয়ে ট্রাস্ট গঠন করে নিবন্ধন করি। আর্থিক সহায়তা আশা করেছি, এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আমাদের নিরাশ করেনি। যাত্রা শুরু সেগুনবাগিচার ভাড়াবাড়িতে, সেখান থেকে ২০১৭ সালে আগারগাঁওয়ে প্রায় এক একর জমির ওপর নিচে তিনটি বেসমেন্টসহ ছয়তলা বিশাল অট্টালিকায় স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দ্বারোদ্‌ঘাটন হয়েছে। এ জমি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাদ্দ দিয়েছেন এবং আমরা সরকারি বাজারমূল্যে ক্রয় করেছি। তিনি প্রস্তুতিপর্ব থেকেই সহযোগিতা করেছেন, সে জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রস্তুতিপর্ব ১৯৯৫ সাল থেকে বহু বিনিদ্র রজনীতে আমরা কয়েকটি মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম। আমাদের লক্ষ্য ছিল দর্শনার্থীরা প্রদর্শিত সামগ্রীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শ উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। হাজার বছর ধরে নানা ধর্মের শাসকেরা রাজত্ব করা সত্ত্বেও এ অঞ্চলে পরধর্মসহিষ্ণু উদার সমন্বয়ধর্মী সমাজ গড়ে উঠেছিল। এ নিদর্শনগুলো দিয়ে দর্শনার্থীদের যাত্রা শুরু হয়। প্রদর্শিত হচ্ছে পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুসহ ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সমান্তরাল কার্যক্রমের নিদর্শন। প্রদর্শিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ-গণহত্যা, প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন, আন্তর্জাতিক পরিসরে শত্রু ও মিত্রদের ভূমিকা এবং সর্বশেষ বিজয় অর্জন। আমরা কেবল প্রদর্শিত সামগ্রীর মাধ্যমে আত্মদান ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকাহিনি তুলে ধরেছি, দর্শনার্থীরা এ স্মারকগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন, সেটি প্রতিজনের নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্বাসের বিষয়।

আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রস্তুতিপর্ব ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পরিচয় সাধন। ১৯৯৮ থেকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এবং ২০০৪ সাল থেকে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের মাধ্যমে সারা দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার শিক্ষার্থীরা অদ্যাবধি এক দফা প্রদর্শনী এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র দেখেছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষদর্শী অভিভাবকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আমাদের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বহু অজানা ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রচলিত ধারার জাদুঘর নয়। নানা আয়োজনের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ তুলে ধরা হয়েছে। এ কাজে সহায়তার উন্মুক্ত হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীরা। এ জন্য দুর্গম এলাকা থেকে আসা লোকশিল্পী ছাড়া কেউ জাদুঘরের কাছ থেকে সম্মানী প্রত্যাশা করেননি। করোনাকালে আশঙ্কা ছিল কর্মসূচি পালনে সমস্যার সম্মুখীন হব। বরং তথ্যপ্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহার করে তরুণ কর্মীদের উদ্যোগে অনলাইনে দেশ-বিদেশের বহুগুণ দর্শক-শ্রোতাকে কর্মসূচির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আজ মুক্তিযুদ্ধের সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অমূল্য স্মারক, একাত্তরের দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র, দুর্লভ দলিল এবং জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবমুক্ত তথ্যসংবলিত দলিলাদি। জাদুঘর একটি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান। এ বিষয়ে আমাদের পারদর্শিতা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে স্মারক সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেছেন। কেবল অর্থ দ্বারা জাদুঘর গড়ে ওঠে না, টিকে থাকে না। এ বিশাল অট্টালিকা নির্মাণে প্রয়োজনীয় উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছেন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টের বিশিষ্ট স্থপতি ও প্রকৌশলীরা।

ইতিমধ্যে আমাদের পারদর্শিতা এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে যে উদ্যোক্তাদের আহ্বানে আমরা ঢাকায় পুলিশ জাদুঘর, বরিশালে কীর্তনখোলা নদীর পাশে বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং হবিগঞ্জে কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর জাদুঘর ও পাঠাগার গঠনের একান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শদাতা রূপে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বাংলাদেশের গণহত্যা আজও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি, আমাদের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড আ জাস্টিস’ এ কাজটিকে ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর করছে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অকৃত্রিম সহযোগিতা করছেন। আজ তাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ২৫ বছরের যাত্রাপথে জনগণের জাদুঘরে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরিশেষে স্মরণ করি যাত্রা শুরুর বিকেলটি। ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অসহযোগ আন্দোলন প্রায় হরতালে পরিণত হয়েছিল। তার মধ্যেই কয়েক শ বিশিষ্টজন রিকশাযোগে উপস্থিত। এমন সময় ঝড় এল খ্যাপা বুনো, সঙ্গে প্রবল বর্ষণ। আমাদের অবাক করে কেউ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেননি। শহীদ রাশীদুল হাসানের শিশু দৌহিত্র অর্চি শিখা চিরন্তন প্রজ্বালন করে জাদুঘরের উদ্বোধন করে। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। দোতলার বারান্দা থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও সহশিল্পীরা গান গেয়েছেন ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান’। পরের দিন সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘শহীদ পরিবারের অশ্রুস্নাত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর উদ্বোধন’।

আমরা যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্‌যাপন করছি, তখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ২৫ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করছে। কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বটে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বন্ধুদের আমরা সম্ভবত হতাশ করিনি।

সারওয়ার আলী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন