default-image

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরে শুরু হবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। করোনা মহামারির কারণে বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উদ্‌যাপন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্ভব না–ও হতে পারে। তা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে উপলক্ষটি উদ্‌যাপিত হবে। আওয়ামী লীগ সেই বিরল ভাগ্যবান রাজনৈতিক সংগঠন, যে দল দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও সরকারে রয়েছে। সুতরাং আশা করা যায়, সরকারি ও দলীয়ভাবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পাবে এক ভিন্ন মাত্রা। এ–জাতীয় উপলক্ষ উদ্‌যাপনের বাহ্যিক দিক আনন্দ-উৎসব; আর প্রধান দিক হলো জাতির অগ্রগতিতে স্বাধীনতার ভূমিকার দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহ মূল্যায়ন।

স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল, স্বাধীনতা–পরবর্তী ৪৯ বছরের ইতিহাস সুখকর নয়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শোষণহীন শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের মানুষ ২৪ বছর অকাতরে জীবন পর্যন্ত দিয়েছে। সেই বাংলাদেশে এসেছে রক্তাক্ত সামরিক শাসন। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে সপরিবার হত্যা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন এমন নেতাদের জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক সংবিধান স্থগিত করে জনগণের মৌলিক অধিকারকে হরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী থেকে আসা দ্বিতীয় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকেও সেনাবাহিনীর হাতেই জীবন দিতে হয়েছে। দ্বিতীয়বার সামরিক শাসন এসেছে। এসব ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে গতস্য শোচনা নাস্তি। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে অনুশোচনা বা হাহাকার করে কোনো লাভ হবে না। ও ধরনের দুষ্কর্ম আর যেন কখনো না ঘটে।

বিজ্ঞাপন

যে চার নেতা সবচেয়ে বেশি সময় দেশ পরিচালনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম সময় পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু, যাঁকেই প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি। তাঁর চেয়ে বেশি সময় পেয়েছেন জিয়াউর রহমান। তার চেয়ে বেশি সময় পেয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তাঁর চেয়ে বেশি সময় পেয়েছেন খালেদা জিয়া এবং সবচেয়ে বেশি শেখ হাসিনা।

নির্বাচিত ও অনির্বাচিত; বেসামরিক, আধা সামরিক ও সামরিক যে সরকারই দেশ পরিচালনা করুক না কেন, একটু একটু করে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকারকে কৃতিত্বের স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে, কিন্তু দেশের পরিশ্রমী ও উদ্যোগী মানুষের অবদানই বেশি। অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাধারণ মানুষের ভূমিকা বিশাল।

বাংলাদেশের ভূমির পরিমাণ কম, প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে ছোট দেশ নয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূমিকা সামান্য নয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশের পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর হাজার হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করে প্রশংসিত হচ্ছেন। কিন্তু তারপরও কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা অস্বীকার করা যাবে না। রোহিঙ্গা সংকট তার বড় প্রমাণ। আমরা কূটনৈতিক ব্যর্থতা মানবতাবোধ দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করার কথা, তা না করায় জনগণ নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের অধীন একেকটি কার্যালয় হয়ে পড়ায় কোনো সমস্যা সমাধানে জনগণ কাউকে তাদের পাশে পাচ্ছে না

বিশ্বায়নের এই কালে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়, তা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভেবে দেখা প্রয়োজন। করোনাভাইরাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশই নিরাপদ নয়। পাকিস্তানে কোনো জীবনঘাতী সংক্রামক রোগ দেখা দিলে আফগানিস্তান ও ভারতের জন্য বিপদ। বাংলাদেশের কোনো মারাত্মক ব্যাধিতে মিয়ানমার ও ভারতের মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে না। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কনসেপ্টের প্রবক্তা একজন ফরাসি কি না, তা এখন আর কারও মনে নেই। সার্কের উদ্যোক্তা কে, সেটাও আর এখন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ওই ধরনের একটি আঞ্চলিক সংগঠনের গুরুত্ব সামান্য নয়। সার্ককে অকার্যকর করে তার কোনো সদস্যদেশ লাভবান হয়েছে, সেটা মনে করার কারণ নেই। যে সংগঠনের উদ্যোক্তা বাংলাদেশ, সে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বাংলাদেশই প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারত।

অন্যদিকে আমরা আসিয়ানের দিকে তাকাতে পারি। অভিন্ন লক্ষ্যে গঠিত আসিয়ানের ১০টি দেশ ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোাডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর এখন ‘গ্লোবাল পাওয়ার হাউস’। এই সংগঠনের গুরুত্ব এখন এতই যে এশিয়ার আর তিন গুরুত্বপূর্ণ দেশ জাপান, কোরিয়া ও চীন তার সহযোগী হতে এগিয়ে গেছে। সার্কও গেল এবং তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশ নেই, তাহলে এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান থাকবে কোথায়?

একক সুপারপাওয়ারের আধিপত্যবাদের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে আসছে। আমেরিকার দৌরাত্ম্য কমবে বলেই চীনকে কেউ মাথাচাড়া দিতে দেবে না। আসিয়ান দেশগুলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার মাধ্যমে এক নতুন উন্নত এশিয়া নির্মাণের দিকে এগোচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি আঞ্চলিক ব্লকে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি যদি পুনর্গঠিত করা সম্ভব না হয়, বাংলাদেশ বহু দেশের পেছনে পড়ে যাবে। শুধু দূরদর্শী নেতৃত্বই পারে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক, কিন্তু রাজনীতি হতাশাজনক। সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনীতি একটি ক্ষুদ্র বৃত্তের ভেতরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের বিকল্প তো রাজনৈতিক নেতারাই—অন্য কেউ নন। রাজনীতিবিদেরাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের কবজা থেকে উপমহাদেশকে মুক্ত করেছেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাঁরাই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর ‘গণতন্ত্র’, ‘নির্বাচন’ শব্দ দুটি অর্থহীন হয়ে পড়ল কেন? এই শব্দ দুটি এখন শুনলে জনগণ বিরক্ত হয়।

সরকারি দলের নেতাদের আত্মপ্রশংসামূলক অভিভাষণ এবং বিরোধী দলের নেতাদের সরকারের সমালোচনায় প্রাত্যহিক তোতা পাখির বোল জনগণের কানে খুবই অরুচিকর শোনায়। পরিবর্তনশীল বিশ্ববাস্তবতায় যে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতামূলক বক্তব্য মানুষ শুনতে চায়, তা পাচ্ছে না। যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করার কথা, তা না করায় জনগণ নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের অধীন একেকটি কার্যালয় হয়ে পড়ায় কোনো সমস্যা সমাধানে জনগণ কাউকে তাদের পাশে পাচ্ছে না।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যেমন একটি খুশির উপলক্ষ, তেমনি তা আত্মসমালোচনা ও আত্মসমীক্ষারও। বর্তমান উন্নয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ তৈরি করে রেখে যাওয়া জরুরি। যাতে অতীত ও বর্তমানের মানুষের চেয়ে তারা অর্থনৈতিকভাবে আরও সচ্ছল, সামাজিকভাবে আরও নিরাপদ এবং সাংস্কৃতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ থাকে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সেটাই হতে হবে আমাদের অঙ্গীকার।


সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক ও গবেষক

মন্তব্য করুন