>
default-image
উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো চৌদ্দতম নিবন্ধটি।

বাংলাদেশে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় নয়জনের মৃত্যু হয়। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করার কারণে প্রতি ঘণ্টায় মারা যায় আরও সাতজন। এসব মৃত্যুর প্রায় সবই এড়ানোর জন্য সহজ ও সস্তা সমাধান রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক স্বাস্থ্যসূচকে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু দেশটি এখনো অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেমন যক্ষ্মা ও আর্সেনিক সবচেয়ে বড় দুই ঘাতক। অন্য অনেক গুরুতর স্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাও রয়ে গেছে, যেগুলো মা ও তাঁর সন্তানদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ প্রকল্প জাতীয় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারে, সেই সঙ্গে অন্য অনেক উন্নয়নবিষয়ক সমস্যারও। প্রকল্পটি কোপেনহেগেন কনসেনসাস এবং ব্র্যাকের সহযোগিতায় বাংলাদেশের ও সারা বিশ্বের কয়েক ডজন অর্থনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়েছে দেশটির জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধানগুলো খুঁজে বের করতে। এর লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ তার উন্নয়ন প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয়িত প্রতিটি টাকায় কীভাবে সবচেয়ে বেশি কল্যাণ সাধন করতে পারে, তা উদ্ঘাটন করা।
যক্ষ্মায় প্রতিবছর ৮০ হাজার বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। এই সংখ্যা মোট মৃত্যুর ৯ শতাংশ। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিষয়ক একজন সিনিয়র লেকচারার আন্না ভ্যাসেলের নতুন গবেষণায় কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক ব্যবহার করে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসার একটি সাশ্রয়ী কৌশলের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে।
কম খরচে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসার জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত উপায় আছে। যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য মানসম্পন্ন ওষুধ এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ফলোআপের ক্ষেত্রে রোগীপ্রতি ৭ হাজার ৮৫০ টাকা খরচ পড়ে। একজন ব্যক্তির যক্ষ্মায় চিকিৎসা করার অর্থ হলো অন্যদের ওই ব্যক্তির কাছ থেকে সংক্রমিত হওয়া প্রতিহত করা, যার ফলে চিকিৎসাটি আরও ভালো বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা ২১ টাকার কল্যাণ সাধন করবে।
কিছু কিছু যক্ষ্মা থেকে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষতি ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধ প্রতিরোধী হওয়ায় প্রচলিত চিকিৎসা কার্যকর হয় না। জাতীয়ভাবে প্রতিবছর ৪ হাজার ৭০০ জন এ ধরনের যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এ দেশে ‘বাংলাদেশ রেজিমেন’ নামের একটি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, যা এই প্রকারের যক্ষ্মা চিকিৎসার সময় ২৪ মাস থেকে কমিয়ে নয় মাসে এনেছে। কিন্তু যেহেতু বহু-ওষুধপ্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসা ৪৫ গুণ বেশি ব্যয়বহুল, এ ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা মাত্র ৩ টাকার সুফল বয়ে আনবে।
যদিও বাংলাদেশিদের ৯৮ শতাংশই পাইপের পানি অথবা কুয়ার পানি পেয়ে থাকে, তার পরও ২৫ শতাংশ পরিবারের পানির উৎসে ডব্লিউএইচওর গাইডলাইনের চেয়েও বেশি মাত্রায় আর্সেনিক আছে। নতুন গবেষণায় তিনটি পানি সরবরাহব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, যেগুলো ব্যাপকভাবে আর্সেনিকের প্রভাব প্রতিরোধ করতে পারে: গভীর নলকূপ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পুকুরের পানি বালু দিয়ে বিশোধন করা। এই ব্যবস্থাগুলো করার জন্য আর্সেনিকে আক্রান্ত পরিবারপ্রতি বার্ষিক ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা খরচ হবে এবং আর্সেনিকের কারণে সব মৃত্যু এড়ানো যাবে। এতে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা ৭ টাকার কল্যাণ সাধন করবে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ২০ শতাংশ পরিবার এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আরও বেশি কল্যাণ সাধন করা যায়—ব্যয়িত প্রতিটি টাকায় প্রায় ১৭ টাকার সুফল পাওয়া যাবে।
আরেকটি বেশ উদ্বেগজনক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় হলো শিশু ও মাতৃমৃত্যু। যদিও বাংলাদেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে, কিন্তু এর অগ্রগতি এখনো অনিয়মিত। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০ শতাংশ দরিদ্রতম শিশু ও কমবয়সী ছেলেমেয়ের মধ্যে ২০ শতাংশ ধনী শিশু ও কমবয়সী ছেলেমেয়ের তুলনায় মৃত্যুহার প্রায় দ্বিগুণ।
লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিষয়ক সিনিয়র লেকচারার জাহাঙ্গীর এ এম খান এবং বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা তদন্তকারী সায়েম আহমেদের করা একটি নতুন গবেষণায় প্রাথমিকভাবে প্রসবব্যবস্থা নিরাপদ করার কথা বলা হয়েছে। আরও অনেক নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ব্যবস্থা করা গেলে মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমে আসত।
এতে প্রতি প্রসবের ক্ষেত্রে ছয় হাজার টাকা খরচ হবে। তবে সবার জন্য এটা সম্ভব নয়, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিশেষজ্ঞদের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী মোট ৮৯৪ কোটি টাকা খরচ করলে বর্তমানে চিকিৎসা সহযোগী ছাড়া প্রসবের ৮০ শতাংশকে চিকিৎসা-সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। এটি আনুমানিক ৩ হাজার ২৬০ জন মায়ের মৃত্যু এবং ৩৪ হাজার ৪৬৭ জন নবজাতকের মৃত্যু এড়াতে পারবে। সামগ্রিকভাবে এ ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা ৮ টাকার কল্যাণ সাধন করবে।
এমনকি আরও কার্যকর একটি বিকল্প হলো কমিউনিটির স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রসবের আগে ও পরে নবজাতকের মাকে বাড়িতে গিয়ে দেখে আসা। এই বিকল্পটি খুবই সস্তা—গর্ভাবস্থার পুরো সময়ে মাত্র ৮৫০ টাকা। প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারীর ক্ষেত্রে এটি পরিচালনা করা যেতে পারে এবং এতে প্রায় ৯ হাজার নবজাতকের জীবন বাঁচানো যাবে। ব্যয়িত প্রতিটি টাকা ২৭ টাকার উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞরা টিকার দিকে নজর দিয়েছেন। যদিও ১২-১৩ মাস বয়সী ৮৫ শতাংশ শিশুকে সব কটি টিকা দেওয়া হয়, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা মাত্র ৫১ শতাংশ এবং শহুরে বস্তিতে মাত্র ৪৩ শতাংশ। টিকাদানে প্রতি শিশুর পেছনে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা খরচ হয় এবং এর ফলে প্রতিবছর ৪ হাজার ১০০ এরও বেশি জীবন বাঁচতে পারে। শিশুদের টিকাদানের পেছনে ব্যয়িত প্রতিটি টাকা ১০ টাকার কল্যাণ সাধন করবে।
ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0