স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের আত্মঘাতী গোল!

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি জরিপ প্রতিবেদন নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক যেভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাতে মনে হতে পারে ‘সুদক্ষ ও সুশীল’ এই মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম সম্পর্কে অতীতে কেউ প্রশ্ন করেননি, প্রতিবেদন দেননি। পুরোনো পত্রিকা ঘেঁটে দেখলাম, সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় নিয়ে একাধিকবার তদন্ত করেছে, প্রতিবেদন দিয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে।

দুদকের কাজ দুর্নীতি দমন করা। সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ সম্পর্কে দুর্নীতির অভিযোগ পেলে কিংবা নিজস্ব অনুসন্ধানে দুর্নীতি-অনিয়ম বেরিয়ে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে তারা। এ বিষয়ে এক চক্ষুনীতি পরিহার করলে দুর্নীতি পুরোপুরি দমন করতে না পারলেও অন্তত নিয়ন্ত্রণ করতে পারত সংস্থাটি। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে দুদক নিজ উদ্যোগে প্রতিবেদন করে না। সেই সামর্থ্যও তাদের নেই। তবে যেসব মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়, সেসব মন্ত্রণালয় নিয়ে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করতে দেখা যায়।

এর অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক খান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন তুলে দেন। এই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি দুর্নীতির উৎসের উল্লেখ আছে। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সে খবরও দেশবাসী জেনেছে। কিন্তু তারা জানতে পারেনি সেই প্রতিবেদনে চিহ্নিত দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ হয়েছে কি না। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে শুরু হয় করোনা সংক্রমণ। করোনা মোকাবিলার মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। বিশেষ করে সংক্রমণ রোধে প্রাথমিক যে প্রস্তুতি যেমন স্বাস্থ্যসেবাসামগ্রী সরবরাহ, করোনা পরীক্ষা, হাসপাতালে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা তাদেরই করার কথা। সেই কাজগুলো কি ঠিকমতো হয়েছে? বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর ওপর কি তাদের যথেষ্ট নজরদারি ছিল? ছিল বলেই সাহেদ করিম, সাবরিনা-কাণ্ড, পিপিই কেলেঙ্কারি ঘটতে থাকল। এই প্রেক্ষাপটে দুদক ২০২০ সালের জুন মাসে ফের তদন্তে নামে এবং মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর, পিসিআর মেশিন ও টেস্ট কিট সংগ্রহে গৃহীত প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে বিশদ তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে।

প্রথম দিকে করোনা সংক্রমণের সর্বশেষ তথ্য জানাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনলাইনে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং করত। সেখানে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করতেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জবাব দিতেন। অনেক সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। হঠাৎ করেই একদিন জানিয়ে দেওয়া হলো এখন থেকে আর ব্রিফিং হবে না। প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হালনাগাদ তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।

করোনা সংক্রমণের সময় বিভিন্ন হাসপাতালের বাস্তব চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকলে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়, গবেষণা, জরিপ, অন্য কোনো তথ্য বা সংবাদ সংগ্রহের জন্য তথ্য সংগ্রহকারীকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সংগৃহীত তথ্য বা সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবহিত হওয়ার পর সেটা প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। বিনা অনুমতিতে হাসপাতালের ভেতরে রোগী বা স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের কোনো স্থিরচিত্র বা ভিডিও চিত্র ধারণ করা যাবে না। সংগৃহীত তথ্য প্রকাশের আগেই বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সম্মতি গ্রহণ করতে হবে।

দেশে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন জারি করল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সাংবাদিকেরা যাতে হাসপাতালগুলোর প্রকৃত চিত্র দেশবাসীর কাছে জানাতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে। এই হলো ‘সুদক্ষ ও সুশীল’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নমুনা।

৮ জুন ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলা: কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এটি ছিল করোনাকালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত তৃতীয় প্রতিবেদন। দেশের আট বিভাগের ৪৩ জেলার ১ হাজার ৩৮৭ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে টিকা নিতে গিয়ে তাঁরা কী কী সমস্যায় পড়েছেন, তা প্রতিফলিত হয়েছে এতে। টিআইবি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরার পাশাপাশি ভালো কাজের প্রশংসাও করেছে। যেমন প্রতিবেদনে র‌্যাপিড ্যান্টিজেনে জিন এক্সপার্টসহ আরটি–পিসিআর নমুনা পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়া ও ঢাকায় এক হাজার শয্যার (দুই শতাধিক আইসিউ শয্যাসহ) ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয়ের সেদিকে চোখ পড়েনি। তাঁর চোখে পড়েছে টিআইবি কোথায় স্বাস্থ্যসেবার অনিয়মের কথা বলেছে, টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে অব্যবস্থা তুলে ধরেছে, তার প্রতি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, িআইবি মিথ্যা ও ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন দিয়েছে।

কীভাবে জানলেন তিনি? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি টিকাগ্রহীতাদের নিয়ে কোনো জরিপ করেছে? টিআইবি ১ হাজার ৩৮৭ জন টিকাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদন করেছে। টিআইবির প্রতিবেদনকে ভুল প্রমাণ করতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে টিকাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে নতুন তথ্য বের করতে হবে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে টিকা চুক্তির বিষয়ে কোনো অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন মন্ত্রী। কিন্তু প্রথম ডোজ টিকা নেওয়া ১৩-১৪ লাখ মানুষের যে দ্বিতীয় ডোজ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা কি তিনি অস্বীকার করতে পারবেন? টিকার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় বেক্সিমকোর চাপেই সরকার টিকার অন্য উৎসে যেতে পারেনি। (সূত্র: টিআইবির প্রতিবেদন)। চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা আনতে দেরি হওয়ার জন্যও তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভুলকে দায়ী করেছেন। সে ক্ষেত্রে টিআইবির প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করা উচিত ছিল তাঁর।

১২ জুন এক ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তাঁর মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। উল্টো তিনি প্রশ্ন তুলে স্বাস্থ্যে কোথায় দুর্নীতি হয়েছে, তা দেখাতে বলেছেন। তিনি অন্য খাতে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি ও বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তবে সুনির্দিষ্টভাবে সেই খাতগুলোর নাম উল্লেখ করেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। (১২ জুন ২০২১, যুগান্তর অনলাইন সংস্করণ)

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক টিআইবির প্রতিবেদনের জবাব দিতে গিয়ে অন্য খাতে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি ও বিদেশে পাচার হওয়ার কথা বলেছেন। সম্প্রতি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, কোভিড রোগীদের ব্যবহারের জন্য ৪০টি অক্সিজেন জেনারেটর কেনা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এটি কেনা হচ্ছে। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একমত। তবে স্বাস্থ্য খাত অত্যন্ত জরুরি বিষয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল এসব চাহিদার বিষয়ে যথাযথ সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেটি করেনি। করতে পারলে আরও সাশ্রয়ী হওয়া যেত। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে সাশ্রয়ী হতে বলে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বারবার যদি একই ভুল হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে এগুলো বাদ যাবে।

জাহিদ মালেকের বক্তব্য কি তারই প্রতিক্রিয়া? নিজ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ঢাকতে অন্য খাতের উদাহরণ টেনে তিনি কি আত্মঘাতী গোল দিলেন? কেননা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায় ‘অন্য খাতও’ সরকারের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সরকারের।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]