স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তি কি ঝুঁকিমুক্ত

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির বেশির ভাগই স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়েছে। তাদের বড় পরিসরের ডেটা অ্যানালিটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে।

চিকিৎসকেরা রোগ বিশ্লেষণ করে যেভাবে ব্যবস্থাপত্র দেন, সেভাবে রোগীর আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এই প্রযুক্তি আমাদের অনেক দিক থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এতে কী কী অসুবিধা হতে পারে?

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উইপনস অব ম্যাথ ডেস্ট্রাকশন-এর ডেটা সায়েন্টিস্ট ক্যাথি ও’নিল একটি তালিকা করে ধরে ধরে দেখিয়েছেন, অ্যালগরিদম ও ডেটা কীভাবে আমাদের চিকিৎসাক্ষেত্রে অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যে ডেটা ফিডব্যাক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে বেসবল খেলার ফল বিশ্লেষণ সহজ করা সম্ভব, সেই একই ডেটা ফিডব্যাক অ্যালগরিদম অর্থনীতি, বিমা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শিক্ষায় ব্যবহার করলে সব ধসে পড়বে। চিকিৎসা খাতও আলাদা নয়; বরং এটি আরও অনেক বেশি স্পর্শকাতর বিষয়।

আলাদা আলাদা রোগীর চিকিৎসার ধরন সব সময়ই ভিন্ন ধরনের হবে। একটি সফটওয়্যার দিয়ে আলাদা আলাদা ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরও স্বাস্থ্য খাতে এই প্রযুক্তি এমনভাবে বিক্রি হচ্ছে, যেন এর সমস্যা সমাধানের সীমাবদ্ধতা নেই। আতঙ্কের কথা হলো, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এখন এই প্রযুক্তি প্রসারে বিজ্ঞাপনদাতার মতো ভূমিকা নিচ্ছেন।

কেউ হয়তো যুক্তি দিতে পারেন, নতুন কোনো উপায় যতক্ষণ কিছু সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে, ততক্ষণ সেগুলো মূল্যবান বলেই বিবেচিত হবে। কিন্তু এই ডেটা অ্যানালিটিকস বা এআই চিকিৎসায় এমন কোনো সমাধান আনতে পারেনি, যার ওপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায়। অ্যালগরিদমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও সিদ্ধান্ত দেওয়ার মডেল মাঝে মাঝে এমন সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে, যা চিকিৎসকেরা ধরতে পারেন না। আবার এই প্রযুক্তির দেওয়া এমন অনেক অবাস্তব সিদ্ধান্ত ঠেলে ফেলে নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়া স্বাস্থ্যের নীতিনির্ধারকদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

প্রজেক্ট নাইটিঙ্গেল একটি ডেটা শেয়ারিং ব্যবস্থা। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বেসরকারি চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাসেনশন এবং গুগল হেলথের মধ্যে ডেটা শেয়ারিংয়ের কাজ করে। গত নভেম্বরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম যখন এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কের কথা ফাঁস করে, তখন অ্যাসেনশন থেকে সেবা নেওয়া সব লোক তটস্থ হয়ে পড়েন। প্রতিষ্ঠানটির কাছে থাকা তাঁদের তথ্য–উপাত্ত প্রতিষ্ঠানটি গুগলের হাতে দিয়ে দিতে পারেন ভেবে তাঁরা ভয় পেয়ে যান। এর চেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, এই প্রতিবেদন প্রকাশের দুই মাস পরে অ্যাসেনশনের কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করেন এবং বলেন, ‘আমরা কী করছিলাম, আসলে আমরা তা জানতাম না।’

সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে আসা এই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর হাতে রোগীর একান্ত ব্যক্তিগত উপাত্ত চলে যাচ্ছে। তার একান্ত নিভৃতির অধিকার অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।

অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানই এই প্রযুক্তিকে ভালো উদ্দেশ্য থেকে ব্যবহার করছে। তবে এটি মৌলিক নীতির দিক থেকে ঠিক নয়। স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তির সহায়তায় উন্নত হবে—এ বিষয়ে কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার নির্বাহীদের তাড়াহুড়া করে অংশীদারি সম্পর্ক গড়ে তোলা ঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কোম্পানির লোকদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিশদ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা উচিত। পরীক্ষামূলকভাবে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাসপাতাল, ক্লিনিক বা অন্য স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হতে পারে। এর বাইরে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য–উপাত্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে তার অসদ্ব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তাও একটি বড় বিষয়।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
লিজা ওসিপেনকো: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের স্বাস্থ্যনীতি বিভাগের প্রভাষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন