default-image

কথাটা না বলে পারলাম না। বিজ্ঞান উৎসব উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি বললাম, বরিশাল মহানগর বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে আছে। এখানে নগর পরিকল্পনায় উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রশংসা করতে হয়। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত স্কুলশিক্ষার্থীদের করতালিতে পুরো প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

কিন্তু কেন কথাটা বললাম? বললাম এ জন্য যে বরিশাল নগরের কয়েকটি জায়গায় দেখলাম হলুদ-সাদা-কালো রঙে এমন কৌশলে জেব্রা ক্রসিং আঁকা হয়েছে যে দূর থেকে দেখলে মনে হয় রাস্তায় উঁচু স্পিডব্রেকার। ফলে রিকশা-গাড়ি গতি কমিয়ে দেয়। কাছে এসে দেখে সেটা আসলে দেখতে হুবহু ত্রিমাত্রিক স্পিডব্রেকারের মতো, কিন্তু আসলে ব্রাশে আঁকা পথচারী পারাপারসংকেত চিত্র। ইংরেজিতে বলা হয় ‘থ্রিডি ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার’! আসলে রাস্তায় কোনো উঁচু ঢিবি নেই। এটা আঁকার কৌশলমাত্র। এর উপকারিতা হলো গাড়ির গতি কমে, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কমে, আবার গাড়ির চাকারও ক্ষতি হয় না বা হঠাৎ ব্রেক করে ঝাঁকুনি খেয়ে যাত্রী-চালকদের বিভ্রাটেও পড়তে হয় না। শুধু এটাই কিন্তু আমার উৎসাহের একমাত্র কারণ না; আসল কারণ হলো মাত্র কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যে স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী এই ‘থ্রিডি ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার’ তৈরি করেছে। একটি ম্যাগাজিনে এ খবর পড়ে তখনই আমার মনে হয়েছে, এ ব্যবস্থা তো সবখানে নিয়ে যাওয়া দরকার। কারণ, স্পিডব্রেকার যেমন সড়ক দুর্ঘটনা ঠেকায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণও হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওই স্কুলের সামনের সড়ক দিয়ে খুব জোরে গাড়ি চলত। তাই সেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। এক শিক্ষার্থী সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ সে জায়গায় স্পিডব্রেকার তৈরি করতে চায়। কিন্তু গাড়িচালকেরা আপত্তি করেন। তাঁদের কথা হলো, এর ফলে স্পিডব্রেকারের উঁচু ঢিবিতে হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় কয়েকজন শিক্ষার্থী বেশ কিছুদিন কাজ করে হলুদ-সাদা-কালো রঙে এমন এক ধরনের ডিজাইন তৈরি করে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হবে স্পিডব্রেকার, কিন্তু আসলে সেটা মসৃণ রাস্তার ওপরেই আঁকা ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার। এতে গাড়িচালকদের আপত্তি থাকল না। কারণ, এর ফলে গাড়ির ওপর বাড়তি ঝাঁকুনি পড়ে না।

মাত্র কয়েক মাস আগের একটি নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ বরিশালের নগর পরিকল্পনাবিদেরা নিজেদের নগরে কার্যকর করার দক্ষতা দেখিয়েছেন, এটা আমাদের উৎসাহিত করে। তার মানে আমাদের দেশের সড়ক প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা সারা বিশ্বের সর্বশেষ অর্জনগুলো সম্পর্কে অবহিত। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?

বরিশাল সদর রোডে, জিলা স্কুলের সামনের এলাকায় এ রকম তিনটি ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার নিশ্চয়ই সবাই লক্ষ করেছেন। মাস দুয়েক আগে প্রথম আলোয় এ খবর প্রকাশও হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, আমাদের দেশে এটা এই প্রথম। যদি তা-ই হয়, তাহলে তো বরিশাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১০-এ ১০! দেশের অন্য কোনো নগরে আছে কি না, এখনো জানি না। ঢাকায় চোখে পড়েনি।

বরিশালের নগর কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সেই স্কুলের খবর থেকে জেনে এই ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার তৈরি করেছেন কি না জানি না। যদি নিজেদের নিজস্ব চিন্তা থেকে এটা করে থাকেন, তাহলে তো নিশ্চয়ই বিরাট এক সাফল্য বলব। তবে এ রকম ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্য কয়েকটি শহরেও তৈরি করা হচ্ছে। ভারতের দিল্লিসহ আরও কয়েকটি নগরেও এ রকম উদ্যোগ সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বরিশালের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর ভাই মঈন আবদুল্লাহ নিজস্ব অর্থায়নে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এ ত্রিমাত্রিক ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার তৈরিতে সহায়তা করেছেন। চারুকলার শিল্পী ও আরও কয়েকজন কর্মীর মাধ্যমে ‘স্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রতিষ্ঠানটি এটা বানিয়েছে। এটা পরীক্ষামূলকভাবে করা হয়েছে। সুফল পেলে সব নগরেই করা যাবে।

বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বরিশালে বিজ্ঞান উৎসবের আয়োজন করেছিল। সেখানে স্কুলের শত শত শিক্ষার্থী বৃষ্টি উপেক্ষা করে এসেছিল তাদের বিজ্ঞান প্রজেক্ট নিয়ে। ওরা কুইজ প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছে। বিজ্ঞানের প্রতি তাদের উৎসাহ আমাদের সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিয়েছে।

মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা দেশে বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়। বিকাশ তো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে কারও কাছে টাকা পাঠানো বা টাকা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই দুইয়ে মিলে সারা দেশের তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞানসচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাজ করছে। বরিশালের তরুণেরা যেভাবে সাড়া দিয়েছেন, তা সত্যিই অভাবনীয়।

বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আমাদের বিজ্ঞান উৎসব আয়োজিত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ বললেন, তিনি বিজ্ঞানসচেতনতা সৃষ্টিতে খুবই আগ্রহী। আজ যে গুজব সৃষ্টি করে গণপিটুনিতে মানুষ মারার ঘটনা ঘটছে, তা সম্ভব হবে না যদি দেশের তরুণেরা বিজ্ঞানসচেতন হয়ে ওঠেন। তখন যেকোনো বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তাঁরা অর্জন করবেন। আজগুবি কথায় সহজে কাউকে বিভ্রান্ত করা কঠিন হবে।

বিজ্ঞানসচেতনতা যে একটি জাতিকে কত দূর এগিয়ে নিতে পারে, বরিশালের এই থ্রিডি ভার্চ্যুয়াল স্পিডব্রেকার তৈরি তার একটি চাক্ষুষ প্রমাণ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে আমাদের দেশের তরুণেরা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন নতুন অর্জন থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে আমাদের জীবন-মান উন্নয়নে কাজ করবে। বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ প্রজন্ম দেশকে এগিয়ে নেবে।

আব্দুল কাইয়ুম: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক
quayum@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন