বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ইরফান সেলিমের গ্রেপ্তার ও হাজি সেলিমের বাড়িতে র‍্যাবের অভিযানের ঘটনাটি সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাংসদ হাজি সেলিম অনেক বছর ধরেই পুরান ঢাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে সাধারণ মানুষ পিতা-পুত্রের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। তাঁদের ভয়ে বিএনপি দূরে থাক, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও মুখ খুলতে ভয় পেতেন।

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু মামলা হয়েছিল হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে। খুন, খুনের চেষ্টা, নির্যাতন, চুরি, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এসব মামলা হয়। ২০০৮ সালের এপ্রিলে ২৭ কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য ১৩ বছরের জেল হয় হাজি সেলিমের। আর সেই সম্পদ নিজের কাছে রাখার জন্য তিন বছরের জেল হয় তাঁর স্ত্রী গুলশান আরার। পরে আপিলে সেই রায় বাতিল হয়। ওয়ার্ড কমিশনার থাকার সময় থেকে রাজধানীর লালবাগ, চকবাজারসহ পুরান ঢাকার একটি বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন হাজি মোহাম্মদ সেলিম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল দখল করে মার্কেট নির্মাণ করেছেন তিনি। হাজি সেলিম বিএনপির সমর্থনে ওয়ার্ড কাউন্সিলর হয়েছিলেন খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং নৌকায় চড়ে সাংসদ হন। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির হরতাল ঠেকাতে তাঁর দেহরক্ষী লিটন শটগান নিয়ে প্রকাশ্যে মাস্তানি করে ধরা পড়েছিলেন।

লালবাগে হাজি সেলিমের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির নাসিরউদ্দিন আহাম্মেদ ওরফে পিন্টু। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি নাসিরউদ্দিনের কাছে হেরে যান। দণ্ডিত হওয়ার কারণে ২০০৮ সালে নির্বাচন করতে পারেননি। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। তখন আওয়ামী লীগ থেকে বলা হয়েছিল, যাঁরা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হাজি সেলিমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাঁকে সাদরে বরণ করে নেওয়া হয় এবং ২০১৮ সালে নৌকায় চড়িয়ে আবার সংসদে নিয়ে আসা হয়।

হাজি সেলিম তৃতীয়বার সাংসদ হয়ে দখলবাজি আরও বাড়িয়ে দেন। ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি মাঠ উদ্বোধন উপলক্ষে স্থানীয় কাউন্সিলর আসিবুর রহমান একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন। ব্যানারে মেয়রের পাশে সাংসদের নাম না থাকায় তুলকালাম কাণ্ড ঘটান হাজি সেলিমের সমর্থকেরা। তাঁরা কাউন্সিলরের ওপর হামলা করেন; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উচ্ছেদ করে তিনটি ছাত্রাবাস দখল করেন। ছাত্ররা এর বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেছিলেন। কিন্তু সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে তাঁরা ছাত্রাবাস ফিরে পাননি। ছাত্রাবাস হাজি সেলিমের দখলেই থেকে যায়। কেবল ছাত্রাবাস নয়, তিনি ও তাঁর পুত্র দখল করেছেন ঐতিহ্যবাহী জাহাজবাড়ি। তাঁরা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের যে ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি ইরফান সেলিম গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত মঙ্গলবার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করেছে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, লালবাগ ও চকবাজার এলাকায় এ রকম অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সরকারি জমি–বাড়ি হাজি সেলিম জবরদখল করেছেন।

হাজি সেলিমের বাড়িতে অভিযান পরিচালনাকারী র‍্যাবের ধারণা, তাঁর বাড়িটিকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানে অন্যান্য সরঞ্জামের সঙ্গে হাতকড়াও পাওয়া গেছে। একজন জনপ্রতিনিধির বাড়িতে হাতকড়া কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাতকড়া পরায় চোর-ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের ধরতে। হাজি সেলিমকে সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়ার খবর আমাদের জানা নেই। সরকার তা দিতেও পারে না। র‍্যাবের উল্লেখিত টর্চার সেলে কাদের এনে নির্যাতন করা হতো, কাদের হাতে কড়া পরানো হতো, সেটি তদন্ত করে দেখা দরকার। নারায়ণগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত একটি টর্চার সেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী নামের এক মেধাবী কিশোরকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা র‍্যাবই উদ্ঘাটন করেছিল। ফরিদপুরেও দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে এ রকম টর্চার সেল থাকার কথা শুনেছি।

আওয়ামী লীগ সরকার নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক কাজ করেছে। কিন্তু তাদের দলের নেতা হাজি সেলিম ২০১৫ সালে নারীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে পুরুষ নির্যাতন (বিরোধী) আইন করার প্রস্তাব এনেছিলেন। জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘নারীদের হাত থেকে পুরুষদের রক্ষার একটি আইন করার দাবি জানাচ্ছি।’ হাজি সেলিম আরও ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘প্রিয় সহকর্মী ভাই ও বোনেরা, হয়তো আমি দু-এক দিন সংসদে আছি। সংসদ থেকে পদত্যাগ করে আমি সিটি করপোরেশন নির্বাচন করব।’ সে সময় তিনি নিজেকে হবু মেয়র হিসেবে ঢাকা শহর পোস্টারে ভরে ফেলেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই মনোবাসনা পূরণ হয়নি। মনোনয়ন পেয়েছিলেন সাঈদ খোকন। ২০১৮ সালে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে দলের টিকিটে সাংসদ হয়েছিলেন তিনি। আর সাংসদপুত্র ইরফান সেলিম ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে হয়েছিলেন কাউন্সিলর ।

এখন দেখার বিষয় এই দাপুটে সাংসদ ও তাঁর পুত্র ইরফানের পক্ষে পুরান ঢাকার কত মানুষ আছেন।

সোহরাব হাসান:প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন