সংবাদমাধ্যমে ইদানীং এক মন্তব্য চোখে পড়ে: বিদেশিরা নাকি হরতাল ‘উপভোগ’ করে। সত্যের চেয়ে দূরবর্তী আর কিছু হতে পারে না। তবে এই মন্তব্যটি হয়তো জিব সামলেই করা হয়েছে।
টানা অবরোধ ও হরতাল খুব বিরক্তিকর, মন খারাপ করা; হতাশাজনকও বটে। বাংলাদেশে যে বিদেশিরা থাকেন, তাঁরা মূলত কাজের কারণেই থাকেন। তাঁরা কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক। তাঁরা নিরাপদে তাঁদের নৈমিত্তিক কাজ করতে পারছেন না, এটা খুবই হতাশার। তাঁরা চোখের সামনে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, মৃত্যু ও ধ্বংস দেখছেন। অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ভবিষ্যতের ক্ষতিও তাঁরা দেখছেন। তাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করার সুযোগ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশে সবচেয়ে গরিব মানুষই বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে। দিনমজুরেরা দিন আনে দিন খায়—নির্মাণশ্রমিক বা কৃষিশ্রমিক যে-ই হোক না কেন। তাঁরা শান্তির সময় যে পরিমাণ কাজ পান, সে পরিমাণ কাজ এখন পাচ্ছেন না। কৃষকেরা তাঁদের উৎপন্ন ফসল বাজারে নিতে পারছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা মাঠ থেকে ফসলও তুলছেন না। কারখানাগুলোও আগের মতো কার্যাদেশ পাচ্ছে না। কারণ, ক্রেতারা নিশ্চিত হতে পারছে না, কারখানাগুলো যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কি না।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন ভারতে অক্সফামের ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করেছি, তখন অনেক মানুষকেই শরীরের পোড়া নিয়ে আসতে দেখেছি। সে সময় আমি ছয় লাখ শরণার্থীর ত্রাণ সমন্বয় করেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পোড়ার ঘটনার কারণ হচ্ছে, পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসররা রাতের অন্ধকারে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। আজ প্রায় ৪৪ বছর পর বাংলাদেশিরা বাংলাদেশিদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে আগুন দিয়ে নিজেদের জনগণকেই তারা জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এ সময়ে বিবদমান রাজনীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। কেন এই নেতারা সন্ত্রাসকে মদদ দিয়ে আত্মধ্বংসে প্রবৃত্ত হচ্ছে?
তার পরও আমি মনে করি, বাংলাদেশের সামনে সোনালি ভবিষ্যৎ রয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসের সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিলে আমি সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখি না। সবারই উচিত, তাদের সহোদরেরা যেন উন্নতি করতে পারে, সে লক্ষ্যে একতাবদ্ধ হওয়া, যে পথ হবে কণ্টকহীন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
লেখক: মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সম্মাননায় ভূষিত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্সফামের হয়ে ভারতে শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ তৎপরতা সমন্বয় করেছেন।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন