‘হরতাল’ মূলত একটি গুজরাটি শব্দ, আর ব্যাপারটার উদ্ভাবকও একজন গুজরাটি ভদ্রলোক। আমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রাণপুরুষ মহাত্মা গান্ধী, তথা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কথা বলছি। প্রসঙ্গত, মহাত্মা গান্ধীর নাম নিয়েই একটি রম্য উপাখ্যানের সৃষ্টি। গান্ধীরা পেশাগত ও সম্প্রদায়গতভাবে ‘বৈশ্য’ তথা ব্যবসায়ী; তাই ভারতীয় ঔপন্যাসিক জি ভি দেশানি নাকি একবার ‘মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী’ ইংরেজিতে তরজমা করে লিখেছিলেন ফ্যাসিনেশন-স্লেইভ অ্যাকশন-মুন গ্রোসার, বাংলায় বর্ণনা করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘মোহিনী শক্তি-দাস কর্ম-চন্দ্র মুদি’।
আর গান্ধীজিকে একবার এক নৌবন্দরে শুল্ক কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে ডিক্লারেশন দেওয়ার মতো কিছু আছে কি না জিজ্ঞেস করায় তিনি নাকি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমার পার্থিব সম্পদের মধ্যে আছে ছয়টি চরকা, একটি ছাগদুগ্ধ রাখার জগ, ছয়টি হাতে বোনা লেংটি ও একটি তোয়ালে, আর আছে আমার খ্যাতি, যেটা পরিমাপ করা যায় না।’ আমাদের বাংলাদেশের কথা না-হয় বাদই দিলাম, ভারতের আর কয়জন রাজনীতিবিদ বুকে হাত দিয়ে এভাবে বলতে পারতেন বা পারবেন?
তো গান্ধীজি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন মহাত্মা। এর সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ: তিনি ছিলেন নীতিগতভাবে ভারতবর্ষ বিভাজনের বিপক্ষে; কিন্তু এতৎসত্ত্বেও বিভাজন হয়ে গেলে পরে নেহরু-প্যাটেল প্রমুখ যখন রিজার্ভ ব্যাংক থেকে পাকিস্তানের হিস্যা ৫০০ কোটি রুপি দিতে গড়িমসি করছিলেন, তখন তিনি অনশন-ধর্মঘট শুরু করেন। এক্কেবারে খাঁটি অনশন; হালের এরশাদ সাহেব মার্কা অনশন নয়। তাঁর অনশনের ফলে ওঁরা ওই টাকা অবমুক্ত করতে বাধ্য হন।
আর স্বাধীনতার প্রাক্কালে, ছেচল্লিশের আগস্টে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার শিরোনাম অনুসারে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর পর কলকাতায় শান্তি বজায় রাখতে তিনি স্বয়ং মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় এসে বাস করতে শুরু করেছেন। সর্বোপরি, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তিনি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পর একপর্যায়ে সেটা সহিংস আন্দোলনে রূপ নিলে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। হায়! এতদ্দেশীয় রাজনীতিবিদেরা কবে গান্ধীজির জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। আর আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়, এ দেশের প্রত্যেক শিক্ষিত দেশপ্রেমিক নাগরিকের উচিত গান্ধীজির আত্মজীবনীমূলক বই মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ
পাঠ করা।
‘যাকগে, বলতে যাচ্ছিলাম হরতালের ব্যাপারটা। আমাদের সময়কার ছাত্রনেতা ও পরবর্তী সময়ে অনেকবার ডিগবাজি খাওয়া রাজনীতিবিদ শাহ্ মোয়াজ্জেম হোসেন স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রী থাকাকালে একবার বলেছিলেন, ‘হরতাল তো নয়, ওটা ভয়তাল!’ সে সময় তিনি আরেকটি অশালীন উক্তির মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলেন, দুই নারী একজোট হয়েও এরশাদের পতন ঘটাতে পারবেন না। তাঁর ওই উক্তি অশালীনতার কারণে সর্বত্র সমালোচিত হয়েছিল। যা হোক, সেবার তিনি ভুল প্রমাণিত হয়েছিলেন, দুই নেত্রীর ঐকে্যর ফলেই এরশাদীয় স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল। কিন্তু এখন তাঁদের একজনের অবস্থান উত্তর মেরুতে হলে অপরজনের অবস্থান দক্ষিণ মেরুতে।
স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হলে নাকি সর্বত্র মাছি দেখতে পাওয়া যায়। তদ্রূপ পত্রিকার পাতায় রম্য কিছু প্রকাশিত হলে রম্যলেখকের দৃষ্টি সেখানটায় অবিচ্ছেদ্যভাবে আটকায়। আত্মজপ্রতিম একজন ইদানীং ‘রস+আলো’র পাতায় লিখেছে: লাগাতার হরতাল মানে হলো লাগা তার, অর্থাৎ তার লাগা; হরতালে অনেকের মাথার তার ছিঁড়ে যায় তো, সেটা লাগানোর জন্যই লাগাতার হরতাল। ওর এই বিশ্লেষণটা আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই তৎসঙ্গে আমি যোগ করতে চাই, হরতাল মানে হচ্ছে তাল হরণ করা। বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই।
আর পত্রিকার পাতায় ‘গাধা মানুষের মতো কথা বলে’ শিরোনাম দেখতে পেয়ে জনৈক রসিক ব্যক্তি মন্তব্য করেছিলেন, ‘মানুষ যদি গাধার মতো কথা বলতে পারে, তাহলে গাধা মানুষের মতো কথা বলায় অবাক হওয়ার কী আছে?’ তো আগেকার দিনে রাজনৈতিক সংকটকালে সরকারি কর্মচারীরা দৃশ্যত নিরপেক্ষ ও নির্বাক থাকতেন; আজকাল তাঁরা রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। সরকারের এক ডানার কাজ আরেক ডানা করতে শুরু করে দিলে ফলাফল কী হয়, সেটা বোঝাতে গিয়ে অনেক আগে ঈশপের এই গল্পটা বলেছিলাম:
এক কৃষকের ছিল একটি গাধা ও একটি কুকুর। গাধার কাজ ভার বহন করা আর কুকুরের কাজ রাতে বাড়ি পাহারা দেওয়া। কৃষক তাদের ভালোমতো ভরণপোষণ করে না বিধায় অসন্তুষ্টি একেবারে চরমে। একদিন গভীর রাতে বাড়িতে নিশিকুটুম্বের আগমন ঘটল। কুকুর বলল, ‘মালিক আমাদের ভালোমতো খেতে দেয় না। চোর চুরি করে নিয়ে যাক, তাতে আমাদের কী? আমি ডেকে মালিকের ঘুম ভাঙাব না।’ কিন্তু গাধা কুকুরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলল, ‘হাজার হোক তিনি আমাদের মালিক। তুমি না ডাকলেও আমি ডেকে তাঁর ঘুম ভাঙাবই।’ সে তার হেঁড়ে গলায় চিৎকার শুরু করলে চোর পালিয়ে গেল। এদিকে মালিক মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে কিছুই দেখতে না পেয়ে অহেতুক ঘুম ভাঙানোর অপরাধে গাধাকে আচ্ছাসে পিটুনি লাগাল।
এ স্থলে সম্প্রতি সংগৃহীত আরেকটি মজাদার গল্প উপস্থাপন করতে চাই। অবশ্য পূর্বাহ্নে বলে রাখি, আমাদের এক ঢাকাইয়া ভাই যথার্থই বলেছিলেন, ‘আইজকাল রাজনীতিতে পলিটিকস ঢুইক্যা গ্যাছেগা।’ তবে সেই সঙ্গে ঘেন্না ও প্রতিহিংসা যে ঢুকে গেছে, ওটাই চিন্তার বিষয়। আর দোহাই লাগে, এই গল্পটিতে কেউ রাজনীতির গন্ধ খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করবেন না। আব্বাসীয় যুগের এক শাসক একদিন দামেস্কে জনগণের উদ্দেশে বক্তৃতাকালে বলছিলেন, ‘হে লোকসকল! আপনারা আল্লাহর শোকর গোজার করুন যে তিনি আমাকে আপনাদের শাসনকর্তা বানিয়েছেন। ইতিপূর্বে অনেকবার প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, কিন্তু আমার রাজত্বকালে একবারও প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।’
পেছন থেকে এক মুসল্লি ফোড়ন কাটলেন, ‘আল্লাহ অত্যন্ত মহান ও মেহেরবান। তিনি এতটা নির্দয় নন যে একই সঙ্গে আপনাকে ও প্লেগ ব্যাধিকে আমাদের ওপর আরোপ করবেন।’
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন