বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্কুল–কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সন্তানদের দৈনন্দিন বাড়তি এই যাতায়াত খরচ যোগাতে কী হিমশিম খেতে হচ্ছে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে, ভাবুন তো। একটি রুটের হিসাব থেকেই বোঝা যাচ্ছে ঢাকার বাকি সব রুটের কী অবস্থা হবে। ফলে গত কয়েক দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বাসশ্রমিকদের কাছে মারধরের শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বুধবার রাতে হাফ ভাড়া নিয়ে এক ছাত্রীর সঙ্গে অশোভন আচরণের জেরে একটি বাসও ভাঙচুর করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার অনেকগুলো জায়গায় রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরে সেই বিক্ষোভে অংশ নেয়। অবরোধ তুলে নিলেও আগামী শনিবারের মধ্যে বাসে হাফ পাস চালু না হলে আবার আন্দোলনে যাবে বলে আলটিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। মহাখালী আমতলীতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা চালায়। এতে তিতুমীর কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘ছাত্র’ যুক্ত থাকলেও ছাত্রদের পেটাতে জুড়ি নেই ছাত্রলীগের। ছাত্রদের যেকোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাস্তানি করাটাই তাদের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

default-image

যদিও এদিন হাফ ভাড়া নিয়ে ছাত্রদের দাবি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এর জন্য টাস্কফোর্সও গঠন করা হবে বললেন তিনি। কথা হচ্ছে, সেটি কি আদৌ বাস্তবায়ন হবে? এর আগে ২০১৫ সালের অক্টোবরে বিআরটিসির কার্যালয়ে বাস ডিপো ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে এক বৈঠকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আমি এই মুহূর্ত থেকে নির্দেশ দিচ্ছি, রাজধানীতে চলাচলরত বিআরটিসির পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহনেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেবে। আর না নিলে দায়ী পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এরপর তো ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলনে তোলপাড় হলো গোটা দেশ। সে আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির একটি ছিল, ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সে সময়ই মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করলেও সেখানে হাফ ভাড়ার বিষয়টি ছিল না।

যে অধিকার শিক্ষার্থীরা পাকিস্তান আমলে আন্দোলন করে আদায় করেছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সেটির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, এর চেয়ে লজ্জার কী আছে। সরকারের মন্ত্রীরা নানা সময়ে বক্তব্য নিয়ে সেটিকে আরও তামাশার বিষয় বানিয়ে ফেলেছেন।

আইনগতভাবে হাফ ভাড়ার বিষয়টির কোনো ভিত্তি না থাকলেও ঢাকার গণপরিবহনে সেটি একটি চিরায়ত প্রথা। যদিও বাসমালিকেরা সেই প্রথা মানতে চান না। বাসের বাইরে বা ভেতরে লিখে রাখেন ‘হাফ পাস নেই’। পুলিশদের জন্য আবার ‘ফুল পাস’ রাখতে আপত্তি নেই তাদের। এ নিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাসশ্রমিকদের তর্কাতর্কিও নতুন নয়। সরকারের মন্ত্রীরা এ নিয়ে আওয়াজ তুললেও কোনো আইন করার পদক্ষেপ নেন না। কারণ, এতে পরিবহনমালিকেরা অসন্তুষ্ট হবেন। তাঁদের স্বার্থই যেহেতু সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ! অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ‘হাফ ভাড়া না নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে হুঁশিয়ারও দেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়। গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেও মনে হয় না, সহজে কোনো সুরাহা হবে। কারণ, গেট লক সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া আদায়ে যাত্রীদের থেকে বাধা পাচ্ছেন বলে গত বুধবার আধা বেলা বাসই নামাননি চালকেরা। তাঁদের বক্তব্য, মালিকদের কাছে সিটিং বা গেট লক সার্ভিস হিসেবেই ভাড়া বুঝিয়ে দিতে হয়। ফলে সেখানে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার প্রশ্নই আসে না।

তাহলে বলতেই হচ্ছে, পরিবহননেতা–মালিকেরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায় করতে শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রী–শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি করে দিয়েছেন। সরকারের মদদপুষ্ট এসব মালিক ‘জোর যার মুল্লক তার’ নীতিতে ঘরে বসে আরামে পা নাড়াচ্ছেন, অন্যদিকে রাস্তায় বিবাদে লিপ্ত হচ্ছেন শ্রমিক ও যাত্রী, যেটা আজকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও রাস্তা অবরোধে গিয়ে ঠেকল।

কথা হচ্ছে, আইনগত ভিত্তি না থাকলেও হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীদের অধিকার। পাকিস্তান শাসনামলে আন্দোলন করেই সেই অধিকার আদায় করেছে শিক্ষার্থীরা। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ‘১১ দফা’ নামে শিক্ষার্থীদের যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক কর্মসূচি আমরা দেখতে পাই, সেখানেই হাফ ভাড়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। ১১ দফার ১-এর (ঢ) অনুচ্ছেদে আমরা দেখতে পাই, ‘ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের “আইডেন্টিটি কার্ড” দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ “কন্সেশনে” টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও “কন্সেসন” দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মতো বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যেকোনো স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ “কন্সেশন” দিতে হইবে। ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সরকারি ও আধা সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের শতকরা ৫০ ভাগ “কন্সেশন” দিতে হইবে।’ ১১ দফার আন্দোলনেরই সফল এক সমাপ্তি হলো আইয়ুব খানের পতন। ১১ দফা ধারণ করেছিল ছয় দফাকেও, যা স্বাধীনতাসংগ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।

যে অধিকার শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আদায় করেছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সেটির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই, এর চেয়ে লজ্জার কী আছে। সরকারের মন্ত্রীরা নানা সময়ে বক্তব্য নিয়ে সেটিকে আরও তামাশার বিষয় বানিয়ে ফেলেছেন। বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি ও বেসরকারি গণপরিবহনগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। ইউরোপ–আমেরিকায় বেসরকারি বাস কোম্পানিগুলো যাত্রী টানতেও শিক্ষার্থীদের এ সুবিধা দিয়ে থাকে, চটকদার বিজ্ঞাপনেও তা প্রচার করা হয়। ১১ দফাই বলছে, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় ছিল, এখনো তেমনটি চালু আছে দেশটির অনেক প্রদেশে। ভারতে শুধু শিক্ষার্থী নয়, বয়স্ক নাগরিকদেরও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় গণপরিবহনগুলোতে। ফলে হাফ ভাড়া বিষয়ে সরকারকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেই হবে। তাদেরকে স্পষ্ট করে বলতে হবে—শিক্ষার্থীদের এ অধিকারের তাঁরা আইনগত ভিত্তি দিতে চান কি না, নাকি পরিবহনমালিক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুকূল রক্ষার রাজনীতি করবেন এবং শ্রমিক ও ছাত্রলীগের হাতে শিক্ষার্থীদের মার খাওয়া উপভোগ করবেন?

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন